ইয়ে করার টাইম নাই – মার্ক ম্যানসনের বেস্ট সেলার বইয়ের সারাংশের অনুবাদ

এই প্রবন্ধটা ‘The Subtle Art of NOT Giving a F*ck: A Counterintuitive Approach to Living a Good Life’ বইয়ের সারাংশ। প্রথমেই বলে নিই বইটা আমি পড়িনি। Blink নামে একটা এ্যাপ রয়েছে যেটাতে বিভিন্ন বিখ্যাত বইয়ের সারাংশ পাওয়া যায়। আমি ব্লিংকের সারাংশের বাংলা অনুবাদ করেছি মাত্র।

‘The Subtle Art of NOT Giving a F*ck’ বইটি Mark Manson-এর লেখা দ্বিতীয় বই। বইটি বেস্ট সেলার খেতাব পেয়েছিল। ব্যক্তিগতভাবে আমি মোটিভেশনাল স্পিচ অপছন্দ করি। তারপরও কেন এই বইটার সারাংশ অনুবাদ করতে গেলাম? এর কারণ এটাকে আমার মনে হয়েছে মোটিভেশনাল স্পিচের বিপরীত স্পিচ।

প্রবন্ধটির অডিও শুনুন এখানে

১.

আমরা এক অবারিত বিকল্পের যুগে বাস করছি, সে জীবিকার কিংবা জীবনসঙ্গী বাছাই করার কথাই ধরুন, আর সর্বোত্তম সংবাদ মাধ্যমের কথাই ধরুন, আমাদের সামনে রয়েছে গাদা গাদা বিকল্প।

এমনটাই যদি সত্যি হয়, তাহলে আমরা আমাদের জীবনকে কেন আশীর্বাদ মনে করছি না? কেন আমাদের অনেকের কাছেই জীবন ক্লান্তিকর, বিমর্ষ ও পীড়ণে ভরা? কেন অনেকের কাছেই জীবন অসম্পূর্ণ?

এর কারণ আমরা সবকিছু করতে চাই। আমাদের চারপাশে এত বেশি বিকল্প যে আমরা এর যে কোন একটা বা অল্প কিছু বিষয়ে মনোযোগী না হয়ে একসাথে সবকিছুতেই মনোবিষ্ট হতে চাই। এক কথায়, সবকিছু পেতে চাই এবং আমরা এক ডাল থেকে আরেক ডালে ঘুরে ঘুরে শক্তি ক্ষয় করি এবং ক্লান্ত হই।

অবধারিতভাবেই প্রশ্ন আসে আমাদের আসলে কী করা উচিত? এর উত্তর হলো, বিকল্পের মধ্য থেকে আমাদেরকে বেছে বের করা উচিত কোনগুলো আমাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ এবং সেগুলোতে মনোনিবেশ করা।

জীবন আসলেই সংগ্রাম। আমরা যা কিছুই করতে চাই, তার পিছনে আমাদেরকে শ্রম ব্যয় করতে হয়। সুতরাং যেখানে শ্রমের ব্যয় অর্থহীন হবে, সেখানে এর ব্যয় না করাটাই শ্রেয় নয় কি?

সমস্যা হলো, আপনি কী চান বা আপনার জীবনের লক্ষ্য কী, এই প্রশ্নের উত্তর এত সহজ নয়। অনেকেই এই প্রশ্নের উত্তরে বলবেন, আমি সুখ চাই, একটা ভালাবাসায় পূর্ণ পরিবার চাই, একটা ভাল চাকুরি চাই। কিন্তু এই চাওয়াগুলো আসলে খুবই অস্পষ্ট। অস্পষ্ট লক্ষ্য আপনাকে সংগ্রামের শক্তি যোগাবে না।

ধরে নিলাম, আপনার স্পষ্ট লক্ষ্য আছে এবং সেটা একটা কোম্পানির সিইও হওয়া। একজন সিইওর ক্ষমতা ও বেতন আপনাকে আকৃষ্ট করে। কিন্তু সেই সাথে তার দায়িত্বের কথাও ভাবুন। সিইওকে সপ্তাহে কমপক্ষে ষাট ঘণ্টা কাজ করতে হয়, কঠিন কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে হয়, যখন তখন যাকে তাকে চাকুরি থেকে বরখাস্ত করতে হয়। এগুলো এত সহজ কাজ নয়। সিইওর দায়িত্ব ও কর্তব্যের কথা ভাবলে সেটা মোটেও উপভোগ্য বলে মনে হবে না, বরং যন্ত্রণাময় মনে হবে। আপনি কি এগুলো উপভোগ করেন? যদি না করেন, তাহলে আপনার একজন সিইও হওয়ার সম্ভাবনা খুবই ক্ষীণ।

আপনি যা কিছুই করতে চান, যেহেতু তার জন্য আপনাকে পরিশ্রম করতে হবে, তাই এমন কিছুর পিছনে সেটা ব্যয় করা উচিত, যার সত্যিকারের মূল্য রয়েছে আপনার কাছে। আপনাকে খুঁজে বের করতে হবে আপনি কী উপভোগ করেন। আপনার অপছন্দের কিছু করতে গেলে আপনি সারাক্ষণ নিজের সাথে নিজে যুদ্ধ করবেন। পছন্দের কিছুতে ঠিক তার উল্টোটা হবে, আপনি আপনার কাজকে ক্রমাগত ভালবাসতে শুরু করবেন।

এই বইয়ের লেখকের কথাই ধরুন। তিনি ডেটিং বিষয়ে লেখা উপভোগ করতেন। সুতরাং তিনি সবকিছু ছেড়েছুড়ে ডেটিং উপদেশমূলক একটা ব্লগ খুলেন এবং এ বিষয়ে লেখা শুরু করেন। যেহেতু তিনি এটা পছন্দ করতেন, তাই শত প্রতিকূলতাকে অতিক্রম করতে পেরেছেন। ক্রমে তার ব্লগ জনপ্রিয় হতে শুরু করে এবং লাখ লাখ মানুষ তার ব্লগ অনুসরণ করতে শুরু করে। দেখা গেল, তিনি এর আগে ফুলটাইম চাকুরিতে যা আয় করতেন, ব্লগ থেকে তার চেয়ে বেশি আয় করতে শুরু করলেন।

দুনিয়াতে সহজলভ্য বলে কিছু নেই, প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে সংগ্রাম করেই আমাদের সবাইকে আগাতে হয়। এসকল প্রতিকূলতাকে অতিক্রম করা তখনই সহজ হয় যখন নিজের কাছে প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে সংগ্রামের একটা মানে থাকে। আপনার নিজের কাছে যার কোন মূল্য নেই, সেগুলোকে না বলতে পারাটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এ ব্যাপারে নিষ্ঠুরতার প্রয়োজন হলে নিষ্ঠুরই হোন এবং যা অপছন্দ করেন সেটার পিছু নেয়া বন্ধ করুন। শুধু যে অল্প কয়েকটি বিষয় আপনি ভালবাসেন, তার বাইরের সবকিছুকে বলুন, ‘ইয়ে করার টাইম নাই – I don’t give a fuck.’

২.

পরিশ্রম সফলতা আনে, এটা সত্য। কিন্তু নিজের সফলতাকে অন্য কারো সাথে তুলনা করে মানসিক অশান্তিতে ভোগার কোন মানে নেই।

বিখ্যাত গিটারিস্ট ডেভ মুস্টেইনের উদাহরণ তুলে ধরা যাক। মুস্টেইনকে যখন তার ব্যান্ড থেকে ছেটে ফেলা হলো, তখন তাঁর ব্যান্ড খ্যাতির শিখরে। তিনি দৃঢ়প্রতিজ্ঞ হলেন যে তিনি তার প্রাক্তন ব্যান্ড সদস্যদের দেখিয়ে দিবেন যে তাদের সিদ্ধান্ত ভুল ছিল। তিনি অনেক পরিশ্রম করে একটা নতুন ব্যান্ড গড়ে তুললেন যার নাম মেগাডেথ। মেটাল ব্যান্ড জগতে মেগাডেথ খুবই বিখ্যাত হলো। ২৫ মিলিয়নের বেশি রেকর্ড বিক্রি হলো তাদের। মেগাডেথের এতটা সাফল্যের পরেও মুস্টেইন সুখী হতে পারলেন না, কারণ তার প্রাক্তন ব্যান্ডটার নাম মেটালিকা, যেটি পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ট কয়েকটা ব্যান্ডের একটা। মেগাডেথের সাফল্যকে মেটালিকার সাফল্যের সাথে তুলনা করে তিনি নিজেকে ব্যর্থই মনে করলেন।

সংগীত জগতে এরকম আরেকটি উদাহরণ পিট বেস্ট। ডেভ মুস্টেইনের মত বেস্টকে যে ব্যান্ডটি থেকে ছুড়ে ফেলা হয়েছিল সেটার নাম বিটলস, পৃথিবীর সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ ব্যান্ড। বিটলসের সাফল্য দেখে বেস্ট বিষণ্ণতায় ডুবে গেলেন, তিনি অবসাদগ্রস্ত হয়ে পড়লেন । তারপর একদিন তার মনে হলো, তিনি আসলে যা চেয়েছিলেন তা ব্যান্ড নয়, একটা সুখী সংসার। অবশ্যই তিনি সংগীতের সাথে থাকতে চান, তবে ওরকম সাফল্যের চূড়ায় ওঠার চেষ্টাকে অর্থহীন মনে হলো তার কাছে। এটা তাকে সুখী করলো। সংগীতেই তিনি থাকলেন, একই সাথে পারিবারিক জীবনকেও উপভোগ করলেন।

আমরা যার পিছনে ছুটছি, সেটা অধরা হলে লক্ষ্য পরিবর্তন জরুরী। এতে সুখী হওয়া সম্ভব।

৩.

কেউ কেউ প্রমোদেই পরিতৃপ্তি লাভ করেন। তারা মনে করেন আনন্দলাভই জীবনের উদ্দেশ্য। আনন্দ রূপান্তরিত হয় আসক্তিতে। ফলে একসময় তারা মাদকাসক্তে কিংবা ব্যাভিচারীতে পরিণত হন। কেউ কেউ হন খাদ্যাসক্ত এবং তার ফলস্বরূপ স্থুল। তারপর যখন এর থেকে উত্তোরণের চেষ্টা করেন, তখন মানসিক অবসাদে (depression) ভোগেন।

মানুষের আরেকটা খুব খারাপ অভ্যাস হলো অন্যের বস্তুগত সাফল্যে ঈর্ষা বোধ করে সেসব অর্জনের প্রচেষ্টা। প্রতিবেশী বা বন্ধু-আত্মীয়ের বাড়ি-গাড়ি-ঘড়ি দেখে তাদেরকে সুখী মনে করে আপনি নিজেও সম্ভবত এর পিছনের ছোটার কথা ভেবেছেন। গবেষণায় দেখা গেছে, মানুষের মৌলিক চাহিদাগুলো মিটে যাবার পরে অতিরিক্ত সম্পদ মানুষকে সুখী করে না, বরং পরিবারকে গুরুত্বহীন মনে করে কিংবা সততাকে বিসর্জন দিয়ে সম্পদের পিছু নেয়া তাকে আরো অসুখী করে তোলে।

এখন প্রশ্ন হলো, আমরা কিভাবে এসব অহেতুক বিষয়ের পিছু নেয়াকে এড়িয়ে চলতে পারি? এর উত্তর হলো, আপনি অহেতুক বিষয়ের পিছনে ছুটছেন কারণ আপনি নিজেকে চিনতে পারছে না।

কোনকিছুকে জীবনের পাথেয় হিসেবে বেছে নেয়ার জন্য যে তিনটি বিষয়ে আপনি নজর দিতে পারেনঃ

– এটা বাস্তবতা বিবর্জিত নয়

– এটা সমাজের জন্য ক্ষতিকর নয়

– এটার প্রত্যক্ষ প্রভাব রয়েছে এবং যেটা নিয়ন্ত্রণযোগ্য

সততার কথাই ধরুন। জীবনের পাথেয় হিসেবে সততা একটি মহান পছন্দ, কারণ এটার নিয়ন্ত্রণ আপনার হাতে – একমাত্র আপনিই সিদ্ধান্ত নিতে পারেন আপনি সৎ থাকবেন কি থাকবেন না। সততা বাস্তবতা বিবর্জিত নয় এবং মানুষ তথা সমাজে এর প্রত্যক্ষ ও ইতিবাচক প্রভাব রয়েছে। সততা ছাড়া আর যেগুলোতে ওপরোল্লিখিত তিনটি বিষয় অন্তর্ভুক্ত রয়েছে এবং জীবনের পাথেয় হিসেবে বেছে নেয়া যায়, সেগুলো হলো সৃজনশীলতা, উদারতা ও নম্রতা।

৪.

অনেক সময় আমাদের এমন মনে হতে পারে যে, আমরা পরিস্থিতির শিকার। কিন্তু সত্যটা হলো, নিজের কর্তব্যের পূর্ণ দায় নেয়ার মাধ্যমেই কেবল আপনার ইতিবাচক পরিবর্তন হতে পারে।

প্রতিবছর হাজার হাজার সৌখিন দৌড়বিদ ম্যারাথনে অংশগ্রহণ করেন। তাদের বেশিরভাগই অংশগ্রহণ করেন এটা মাথায় রেখে যে, তাঁদের অংশগ্রহণ কোন ভাল কাজে অর্থসংগ্রহে সাহায্য করবে। যদিও এঁদের বড় একটা অংশই দৌড় শেষ করতে পারেন না, তবুও তাঁদের অংশগ্রহণ নিয়ে তারা গর্বিত হন।

এবার ভাবুন, আপনিও এরকম একটি ম্যারাথনে অংশগ্রহণ করেছেন, কিন্তু আপনি সেটা সেচ্ছায় করছেন না, কেউ একজন আপনাকে বাধ্য করেছে। আপনি যতই ভাল দৌড়ান, এটার সম্ভাবনা খুব বেশি যে আপনি পুরো বিষয়টাকেই (দৌড়, অর্থসংগ্রহ) উপভোগ না করে বরং ঘৃণা করবেন।

এই উদাহরণটার মর্মার্থ হলো, কাজের উদ্দেশ্য যত মহৎই হোক, বাধ্যবাধকতাবোধ আনন্দকে মাটি করে দেয়।

দুঃখজনক হলো, আমাদের অনেকেই আমাদের জীবনাভিজ্ঞতাকে আমাদের ওপর আরোপিত মনে করি। সেটা হোক কোন চাকুরিতে ব্যর্থ হওয়া, ভালবাসায় ব্যর্থ হওয়া, এমনকি একটা বাস ধরতে ব্যর্থ হওয়া পর্যন্ত।

আমরা নিজেদেরকে পরিস্থিতির শিকার মনে করি অসুখী হই।

আমেরিকান মনোবিজ্ঞানের পথিকৃৎ উইলিয়াম জেমসের উদাহরণটা দেখা যাক।উনবিংশ শতাব্দীর আমেরিকাতে একটি সম্পদশালী তথা বিশেষ সুবিধাপ্রাপ্ত (privileged) পরিবারে জন্মগ্রহণ করেছিলেন জেমস। শৈশব থেকেই ক্ষীণ স্বাস্থ্যের অধিকারী জেমসের বমি ও খিচুনী রোগ ছিল। তাঁর স্বপ্ন ছিল একজন চিত্রকর হবেন। কিন্তু তিনি এমন কিছু করতে পারেননি যা তাঁকে অন্যান্য চিত্রকরদের মাঝে বিশেষরূপে চিহ্নিত হবে। এজন্য তাঁর বাবার কাছে তিনি নিয়মিত ভর্ৎসনার শিকার হতেন। বাবা বলতেন জেমসের কোন প্রতিভা নেই। চিত্রকর হিসেবে ব্যর্থ হয়ে ওষুধ পেশার পিছু নিলেন জেমস। এবার তিনি স্কুলই শেষ করতে পারলেন না। অসুস্থ ও অসুখী জেমস চিন্তা করলেন তিনি আত্মহত্যা করবেন।

ঠিক এসময়েই চালর্স পিয়ার্স নামক এক দার্শনিকের একটা লেখা চোখে পড়লো তাঁর। পিয়ার্সের লেখার মূল বার্তা ছিল – প্রত্যেক ব্যক্তির নিজের জীবনের সকল কিছুর একশতভাগ দায়িত্ব তার নিজের ওপরই বর্তানো উচিত। এটি জেমসকে নাড়া দিলো। তিনি বুঝতে পারলেন তাঁর দুর্দশার কারণ আসলে এটাই যে, তিনি এতদিন ধরে নিজেকে পরিস্থিতির শিকার মনে করে এসেছেন। নিজের অসফলতার পেছেনে তিনি অসুস্থতা ও পিতার ক্রমাগত সমালোচনাকে দায়ী মনে করেছেন, যেগুলোর ওপর আসলে তাঁর নিজের নিয়ন্ত্রণই ছিল না। এই নিয়ন্ত্রণহীনতা তাঁকে ক্ষমতাহীন ভাবতে বাধ্য করেছিল।

জেসম বুঝতে পারলেন তাঁর নিজের জীবনের দায় কেবল তাঁর নিজেরই; তাঁর বর্তমান অবস্থার জন্য, তাঁর ব্যর্থতার জন্য একমাত্র তিনি নিজেই দায়ী। এই ভাবনা থেকেই তিনি নতুন করে শুরু করলেন এবং দীর্ঘদিনের পরিশ্রমে আমেরিকান মনোবিজ্ঞানের পথপ্রদর্শক রূপে আবির্ভূত হলেন।

নিজেকে কখনো পরিস্থিতির শিকার মনে হলে উইলিয়াম জেমসকে মনে করুন এবং নিজের কাজের দায় নিজে নেয়ার চেষ্টা করুন।

জীবনসঙ্গী দ্বারা প্রত্যাখাত হলে প্রাক্তনকে নিষ্ঠুর, অসহনশীল, ইত্যাদি বলে দোষারোপ করা সহজ, কিন্তু এর চেয়ে ভাল হবে যদি আপনি এটা মনে করেন যে আপনাদের সম্পর্কটি কার্যকর না হওয়ার পিছনে আপনিই দায়ী। হতে পারে আপনার ঘরের কাজ যতটুকু করা উচিত ছিল তা আপনি করেননি। হতে পারে আপনার সঙ্গীটির উচ্চাভিলাষকে পিছু নেয়ার ক্ষেত্রে আপনার সমর্থন আশানরূপ ছিল না। নিজের ভুলগুলো অনুধাবন করে এবং সেগুলোর সংশোধনের চেষ্টা করলেই ভবিষ্যতে এরকম ফলাফল হবার সম্ভাবনাকে এড়াতে পারবেন, এবং তখনই আপনি সুখী হতে পারবেন।

৫.

আমাদের আত্মপরিচয় যখন হুমকির সম্মুখীন হয়, তখন আমরা পালাতে চাই। এ ব্যাপারে বুদ্ধের শিক্ষা কাজে লাগতে পারে।

মনে করুন, আপনি একটা নামী প্রতিষ্ঠানের জেষ্ঠ্য ব্যবস্থাপক (সিনিয়র ম্যানেজার)। আপনি আপনার চাকুরী ও বেতনাদি পছন্দ করেন। আপনার একটা সুন্দর গাড়ি আছে, ভাল পোষাকাদি পরেন এবং আপনার সহকর্মীরা আপনাকে সম্মান করে। বর্তমানে আপনার সামনে প্রতিষ্ঠানের প্রধান হওয়ার একটা সুযোগ এসেছে। সমস্যা হলো, ঐ পদটাতে ঝুঁকি রয়েছে – আপনি যদি সবকিছু ঠিকঠাক না করতে পারেন তাহলে চাকুরি হারাবেন, সেই সাথে হারাবেন গাড়ি, সম্মান এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, আপনার পরিচয়।

আপনি কি এই সুযোগটা লুফে নিবেন? বেশিরভাগ মানুষই এটা নিবে না। লেখক এটাকে বলেছেন Manson’s Law of Avoidance – মানুষের পরিচয় হুমকির মুখে পড়লে পালানোর প্রবণতা।

যদিও ওপরে যে ঝুঁকির কথা বলা হলো, সেটা এড়িয়ে চলা যৌক্তিক, তারপরও পরিচয় রক্ষার তাগিদে বেপরোয়া হওয়া বেশিরভাগ সময়ই সাহায্যের চেয়ে ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়ায়। উদাহরণস্বরূপ সৌখিন শিল্পী ও লেখকদের তাঁদের কাজকে প্রকাশ ও প্রচার থেকে বিরত থাকার বিষয়টি তুলে ধরা যাক। তাঁরা ভয় করেন তাদের কাজ প্রকাশ করলে মানুষ তা পছন্দ করবে না। বরং চেষ্টা করেও ব্যর্থ হওয়া তাদের বর্তমানে যে ‘উঠতি শিল্পী বা লেখক’ পরিচয়টা আছে, সেটা বিনষ্ট করবে। ফলে তাঁদের কাজ অপ্রকাশিতই থেকে যায়।

বুদ্ধের শিক্ষা ঠিক এখানেই কাজে লাগে। বৌদ্ধমতে মানুষের পরিচয় আসলে একটি ভ্রম। নিজেকে আপনি গরীব, ধনী, সুখী, দুঃখী, সফল, ব্যর্থ যে পরিচয়ই দিন, এটা কেবলই একটি মনস্তাত্ত্বিক নির্মান। এগুলোর কোনটাই বাস্তব নয়, সুতরাং এসকল পরিচয় দিয়ে আমাদের জীবনকে পরিচালিত হতে দেয়া উচিত নয়।

আপনি যদি এই মিথ্যা পরিচয়টাকে ত্যাগ করতে পারেন, তাহলে আপনি এক বিস্ময়কর অভিজ্ঞতা লাভ করবেন, যা আপনি আগে চিন্তাও করেননি।

আপনি হয়তো নিজেকে একজন নিবেদেতিপ্রাণ কর্মী (career-minded person) হিসেবে চিহ্নিত করে আসছেন – যখন পেশা কিংবা কাজের কথা আসে, আপনি কাজকেই প্রথম অবস্থানে রাখেন, পরিবার কিংব শখকে রাখেন দ্বিতীয় অবস্থানে। নিজের তৈরি এই ভাবমূর্তি থেকে নিজেকে মুক্ত করে দেখুন, যা কিছু আপনাকে খুশী করে তাই আপনি করতে পারবেন, সেটা হতে পারে আপনার সন্তানদের সাথে আরো বেশি সময় কাটানো কিংবা ছবি তোলা বা মডেল উড়োজাহাজ তৈরি।

৬.

ইতিবাচক পরিবর্তনের জন্য আপনাকে নিজের ভুল স্বীকার করতে জানতে হবে।

যেসব লোক মনে করে একমাত্র সে নিজেই সঠিক, তাদের প্রতি কি আপনি বিতৃষ্ণা পোষণ করেন না? আপনি যদি তাদের ভুল ধরিয়েও দেন, তারপরও এসব আত্মতুষ্ট সবজান্তা শমসেররা স্বীকার করবে না যে সে যা বলছে বা করছে, তা ভুল।  তারা কারো কথায়ই কান দিবে না।

আপনি নিশ্চয়ই নিজেকে তাদের দলে ফেলেন না। দুর্ভাগ্যজনক সত্যটা হলো, আপনি নিজেও তাদেরই একজন। আমরা প্রত্যেকেই কখনো না কখনো এই বিভ্রমে ভুগি – আমরা মনে করি আমি যেটা বলছি সেটাই সঠিক, যদিও তা সত্য নয়।

লেখকের জীবন থেকে নেয়া একটা উদাহরণ দেখা যাক। তাঁর এক বন্ধু বিয়ে করতে যাচ্ছিলেন। বন্ধুটিকে সবাই ভদ্র ও সজ্জন ব্যক্তি হিসেবেই চেনে। একমাত্র ব্যতিক্রম হলো তাঁর বাগদত্তার ভাই। সে তার বোনের পছন্দের সমালোচনা করে যাচ্ছিল এবং বলে যাচ্ছিল যে তার বোন একদিন স্বামী কর্তৃক প্রতারিত হবে, কষ্ট পাবে। অনেকে ভাইটিকে বুঝানোর চেষ্টা করেছে, কিন্তু তাকে কোনভাবেই তার বিভ্রম থেকে সরানো যায়নি।

আমরা যদি উক্ত ভাইটির মত আচরণ থেকে নিজেদের বিরত রাখতে চাই, তাহলে এরকম পরিস্থিতিতে নিজেকে বারবার প্রশ্ন করতে হবে আমি আসলে ভুল কিনা। একমাত্র তাহলেই হয় তো বুঝবে পারবো আমি ভুল কি সঠিক।

এটাকে যতটা সহজ মনে হচ্ছে ঠিক ততটা সহজ নয়। আমরা যখন আত্মবিশ্বাসহীনতায় ভুগি, তখন প্রায়শই কিছু মিথ্যা বিশ্বাসকে আঁকড়ে ধরতে চাই। আমরা আমাদেরকে প্রশ্ন করতে চাই না, কারণ এতে নিজের সম্পর্কে যে সত্যটা বেরিয়ে আসতে পারে, তাতে আমরা অস্বচ্ছন্দ বোধ করতে পারি।

কনের ভাইয়ের ঐ উদহারণটাতেই ফেরা যাক। ভাইটি তার বোনের হবু বরকে যে অপছন্দ করছিল, এর মধ্যে রয়েছে আত্মবিশ্বাসহীনতা। হতে পারে সে ঈর্ষা বোধ করছিল যে, তার বোন তার জীবনের ভালবাসাকে খুঁজে পেয়েছে কিন্তু সে এখনও পায়নি। তার ঈর্ষার কারণ এটাও হতে পারে যে তার বোন হবু স্বামীর প্রতি অনেক বেশি মনোযোগ দিচ্ছে। ফলে বোনটি আগে তার প্রতি যতটা মনোযোগ দিতো, এখন আর সেটা দিচ্ছে না বা দিতে পারছে না। এ কারণে শুধু ঈর্ষা নয়, তার রাগও হতে পারে। কারণ যেটাই হোক, ভাইটির পক্ষে নিজের আত্মবিশ্বাসহীনতার মোকাবিলার চেয়ে অন্ধভাবে অনর্থক অনুমান করা সহজ ছিল।

নিজের বিশ্বাসকে প্রশ্ন করে করে আপনার আত্মবিশ্বাসহীনতাকে মোকাবিলা করতে পারলে আপনাকে এই ফাঁদে পড়তে হবে না, এবং আপনি সহজ, সুন্দর ও সুখী জীবনযাপন করতে পারবেন।

৭.

আবেগকে নিয়ন্ত্রণ করতে না পারলে ভালবাসাও ধ্বংসাত্মক হতে পারে।

রোমিও জুলিয়েট সম্ভবত পৃথিবীর সবথেকে বিখ্যাত ভালবাসার গল্প। কিন্তু এটা মোটেই কোন সুখকর গল্প নয়। বরং তার উল্টো – এক বিশৃঙ্খল গল্প যাতে রয়েছে খুন, নির্বাসন, জ্ঞাতিবৈরিতা, এবং শেষ পর্যন্ত এটার সমাপ্তি ঘটেছে প্রেমিক-প্রেমিকার আত্মহত্যার মধ্য দিয়ে।

মর্মান্তিক এই গল্পটি আমাদের দেখিয়ে দেয় কল্পনামদির ভালবাসার কতটা ধ্বংসাত্মক ক্ষমতা রয়েছে। গবেষণায় দেখা গেছে মানুষের মস্তিস্কে রোমান্টিক ও কামুক সম্পর্কের প্রভাব কোকেইনের মত। কামাক্রান্ত মানুষ প্রমত্তবোধ (feeling of an intense high) অনুভব করে, এবং এর অনুপস্থিতি বোধ বা হারাবার ভয় (আত্মবিশ্বাসহীনতা) তাকে ধ্বংসাত্মক চরিত্রে রূপান্তরিত করতে পারে।

শেক্সপিয়রের সময়ে রোমান্টিক ভালবাসার বিপদজনক পরিণতি একটি সাধারণ সর্বজনবিদিত ঘটনা ছিল। উনিশ শতক পর্যন্ত বেশিরভাগ সম্পর্ক ও বিয়ের ক্ষেত্রে ভালবাসার চেয়ে প্রাধান্য পেতো দুই পক্ষের দক্ষতা, ক্ষমতা, ইত্যাদির ভারসাম্য। শেক্সপিয়র হয় তো রোমিও ও জুলিয়েট নাটকের মাধ্যমে আবেগপূর্ণ ভালবাসার ধ্বংসাত্মক ক্ষমতাকে তুলে ধরে এর সমালোচনা করেছেন। অবশ্যই এখন আর সেই যুগ নেই। বর্তমানে বরং রোমান্টিক ভালবাসাকেই আদর্শ ধরা হয়, কিন্তু এটা মাথায় রাখা উচিত যে এটি মর্মপীড়ার কারণও হতে পারে।

তাহলে আমাদের কী করা উচিত? আমাদেরকে কি রোমান্টিক প্রেম পরিত্যাগ করতে হবে? অবশ্যই না।

রোমান্টিক সম্পর্কটি অস্বাস্থ্যকর কি স্বাস্থ্যকর হবে, তা নির্ভর করে এটাকে কী উদ্দেশে ব্যবহার করা হচ্ছে তার ওপর। যদি কেউ ভালবাসাকে তার নিজের সমস্যা থেকে পালানোর জন্য ব্যবহার করে, তবে সেই সম্পর্কটি কিছুতেই স্বাস্থ্যকর হবে না। হতে পারে তারা জীবন নিয়ে সুখী নয়, তাই একে অপরের প্রতি কামবোধকে চিত্তবিক্ষেপক (distraction) হিসেবে ব্যবহার করছে। দুর্ভাগ্যজনক সত্য হলো, নিজের সমস্যার দরজাকে আপাতত বন্ধ করা গেলেও সেটাকে চিরতরে বন্ধ করে দেয়ার উপায় নেই। ফলে সম্পর্কটি একদিন তিক্ততায় পর্যবসিত হবেই।

ভালবাসার সম্পর্কটি তখনই সুস্থ হতে পারে যখন দুজন সঙ্গীই সম্পর্কটিতে পুরোপুরি নিবিষ্ট হতে পারে। কামকে চিত্তবিক্ষেপক হিসেবে ব্যবহার না করে যখন একে অপরের প্রতি মনোযোগী হয়। নিজের আবেগকে প্রাধান্য না দিয়ে যখন একে অপরকে সমর্থন যোগায়। সম্পর্কের সীমা লঙ্ঘন করে একজন আরেকজনকে নিয়ন্ত্রণ করতে চাইলে, নিজেই সকল সমস্যার সমাধান করতে চাইলে, নতুন সমস্যারই কেবল সৃষ্টি হয়। একে অপরের ওপর কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার চেষ্টা স্পষ্ট অসুস্থ সম্পর্ককে নির্দেশ করে।

৮.

মানুষ মৃত্যুকে ভয় পায়। মৃত্যুর পরও বেঁচে থাকার বাসনা পোষণ করে।

আমরা মৃত্যুকে যেভাবেই দেখি না কেন, একদিন সবাইকেই মরতে হবে। বাস্তবতা হলো, মৃত্যুকে দেখার দৃষ্টিভঙ্গি আমাদের জীবনকে ভিন্ন ভিন্ন পথে পরিচালিত করে।

আর্নেস্ট বেকার নামক একজন ডাক্তার ও নৃতত্ত্ববিদ The Denial of Death শিরোনামে একটা বই লিখেছিলেন। সেটাতে তিনি দুটো বিষয়ের উল্লেখ করে দেখিয়েছেন কিভাবে মৃত্যুভাবনা মানুষের জীবনকে নিয়ন্ত্রণ করে।

যেসব বিষয় মানুষের জ্ঞানের আওতায় নেই, সেসব বিষয় নিয়ে মানুষ তার কল্পনায় অনেক কিছু ভাবতে পারে। আমরা অনেক হাইপোথেটিকাল অবস্থা নিয়ে চিন্তা করতে পারি। যেমন, আমি যদি ডাক্তার না হয়ে প্রকৌশলী হতাম বা আমি ইতিহাস না পড়ে যদি সাহিত্য পড়তাম, ইত্যাদি। এসব হাইপোথেটিকাল ভাবনা মানুষকে অশান্ত করে।

একইভাবে আমরা আমাদের মৃত্যুর পরে কী হবে, এটাও কল্পনা করতে পারি বা চাই। যেহেতু মৃত্যু অবধারিত, তাই আমরা বেঁচে থাকাকালীন এমন কিছু করতে চাই যা মৃত্যুর পরেও আমাদের অস্তিত্বকে টিকিয়ে রাখতে সাহায্য করবে। অন্য কথায়, আমরা অমরত্বের প্রকল্পের পিছনে ছুটি, যেগুলো মৃত্যুর পরেও আমাদের লেগাসি হিসেবে টিকে থাকবে। এর জন্য কেউ বেছে নেয় যশ, খ্যাতি, এমনকি কুখ্যাতি, কেউ আশ্রয় নেয় ধর্মের, কেউ ছোটে রাজনীতির পিছনে, কেউ ব্যবসায় অঢেল অর্থ কামাইয়ের চিন্তায়, ইত্যাদি।

পৃথিবীতে যত যুদ্ধ বিগ্রহ ঘটেছে, তার বেশিরভাগই ঘটেছে কিছু ব্যক্তির এমনসব অমরত্ব প্রকল্পের পিছু নিতে গিয়ে। তাঁরা মনে করেছেন তাদের পৃথিবী কিংবা সমাজ পরিবর্তনের ক্ষমতা রয়েছে। হ্যাঁ, এটা ঠিক যে তাঁদের অনেকেই সেটা করতে সক্ষমও হয়েছেন, কিন্তু ব্যক্তি মানুষের জন্য এটা মোটেও সুখকর বা স্বাস্থ্যকর নয়। কিছু একটা রেখে যাওয়ার মরিয়া প্রচেষ্টা মানুষকে মানসিক ও শারীরিকভাবে অসুস্থ করে তোলে।

এসব থেকে নিজেকে মুক্ত রাখার একটাই উপায় আছে – আমাদেরকে অমরত্বের পিছনে ছোটা বন্ধ করতে হবে। ক্ষমতা ও খ্যাতির পিছনে না ছুটে আমাদেরকে মনোযোগ দিতে হবে এই মুহূর্তে আমাদের যা আছে তার ওপর। মৃত্যু ভাবনায় ভীত না হয়ে জীবনের মাঝেই জীবনের অর্থ খুঁজে নিতে পারলেই কেবল সুখী হওয়া সম্ভব।

এক কথায় এই বইয়ের সারমর্ম হলো, আমরা একসাথে অনেক কিছু করতে চাই, অনেক কিছু হতে চাই, যা আমাদের জীবনকে কেবল অসুখের দিকেই ঠেলে দেয়। আমাদেরকে জানতে হবে হবে আমরা কী চাই, কিসে আমরা সুখানুভব করি, তারপর বাকিগুলোকে ‘ইয়ে করার সময় নাই’ বলে উপেক্ষা করতে শিখতে হবে।

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s