মানুষের সভ্যতা বিকাশের সাথে সাথে গড়ে ওঠে নানান রকম কল্প কাহিনী। এই কল্পকাহিনীগুলোর বড় একটা অংশ ক্রমে কালের গর্ভে হারিয়ে গেলেও কিছু টিকে থাকে হাজার বছর ধরে। হাজার বছর ধরে টিকে থাকা সে-সকল কল্প কাহিনীকেই পৌরাণিক কাহিনী হিসেবে ধরা হয়। প্রতিটি সভ্যতার সাথেই জড়িয়ে আছে নানান রকমের পৌরাণিক গল্প। পৌরাণিক গল্পগুলো সাধারণত মুখে মুখেই টিকে থাকে। আবার কোন কোন পৌরাণিক গল্পের লিখিত রূপও পাওয়া যায়। লক্ষ্যণীয় বিষয় হচ্ছে, বেশিরভাগ পৌরাণিক গল্পই ধর্মের সাথে জড়িত। তবে ধর্ম থেকেই পৌরাণিক গল্পের উত্থান হয়েছে, কি গল্পগুলোই কাল ক্রমে বিশ্বাসে পরিণত হয়ে ধর্ম হিসেবে প্রতিষ্ঠা পেয়েছে, বিষয়টি অমীমাংসিত।
 
পৌরাণিক/পৌরাণিক সাহিত্য (Mythology):
সাধারণত প্রাচীন কাল থেকে পুরাষানুক্রমে প্রবহমান কাহিনী, বিশেষত কোন জাতির আদি ইতিহাস সম্পৃক্ত বিশ্বাস ধারণা ও নৈসর্গিক ঘটনাবলির ব্যাখ্যা বা বর্ণনা সম্বলিত গ্রন্থকে পুরাণ বলে। লক্ষ্যনীয় যে পুরাণে সাধারণত রাজা, প্রসিদ্ধ অথবা কুখ্যাত ব্যক্তি, সমাজ, ধর্ম, রাজনীতি, প্রভৃতি নিয়ে আলোচনা হয়। সাধারণ মানুষ অথবা আধুনিক সাহিত্যের অন্যতম অনুষঙ্গ মানুষের মনোজগৎ নিয়ে এখানে আলোকপাত করা হয় না। আভিধানিক ভাবে পুরাণ শব্দের অন্য একটি মানে “অতিকথন”। অর্থাৎ এই ধরণের সাহিত্যে অবাস্তব উপাদান অনেক বেশি পরিমানে থাকে। এজন্য পুরাণ কখনোই ইতিহাস বা রেফারেন্স বই বলে বিবেচিত হতে পারে না। পুরাণের বিষয়বস্তু নিয়ে রচিত বা সংকলিত গ্রন্থকে পৌরাণিক বলে। পৌরাণিক এর ইংরেজি প্রতিশব্দ Mythology (a collection of myths, especially one belonging to a particular religious or cultural tradition)। ইংরেজিতে Mythology কে বলা হয়েছে a collection of myths। এখানে myth অর্থ a traditional story, especially one concerning the early history of a people or explaining some natural or social phenomenon, and typically involving supernatural beings or events.
 
বাংলা ও ইংরেজি উভয় ক্ষেত্রে পৌরাণিক শব্দের আভিধানিক মানে বিশ্লেষণ করলে পুরাণ বা পৌরাণিক গল্পের কয়েকটি বৈশিষ্ট্য আমাদের সামনে এসে দাঁড়ায়ঃ
১। পৌরাণিক গল্পগুলো প্রাচীন কাল থেকে প্রচারিত হয়ে আসছে।
২। কোন জাতি বা অঞ্চলের সংস্কৃতির উপর নির্ভর করে এগুলো রচিত।
৩। পৌরাণিক গল্পে শুধুমাত্র রাজা-মহারাজা,প্রসিদ্ধ অথবা কুখ্যাত ব্যক্তি, যুদ্ধ, রাজনীতি , সামাজিক প্রেক্ষাপট, ধর্ম, দেব-দেবী নিয়ে আলোচনা হয়।
৪। সাধারণত সমাজের নিম্ন শ্রেণীর মানুষ অথবা মানুষের মনোজগৎ নিয়ে এখানে আলোচনা হয় না।
৫। পৌরাণিক গল্প এর সত্য মিথ্যা যাচাই করা যায় না।
৬। পৌরাণিক গল্পে বাস্তবতার তুলনায় অতিপ্রাকৃতিক ঘটনার প্রাধান্য বেশি থাকে ।
 
সুতরাং, আমরা এক কথায় বলতে পারি পুরাণ বা পৌরাণিক কাহিনী হল এমন সাহিত্য যা প্রাচীন কালের দেশ-সমাজ-ধর্ম বা বিখ্যাত ব্যক্তি-দেব-দেবী বা রাজনীতি নিয়ে রচিত, যার সাথে প্রামাণ্য ইতিহাস অথবা সত্যতার তেমন কোন সম্পর্ক নেই। তবে যেহেতু বাস্তব অবস্থায় বসে এই ধরণের গল্প রচিত হয়, সেহেতু পুরাণ বা পৌরাণিক গল্পের উপরে ভিত্তি করে তৎকালীন সমজা ব্যবস্থা সম্বন্ধে অনুমান করা যায়।
 
ভারতীয় পৌরাণিক ও হিন্দু ধর্মঃ
প্রতিটা প্রাচীন সভ্যতাকে কেন্দ্র করে নানান রকমের পৌরাণিক গল্প রচিত ও প্রচারিত হয়েছে। সভ্যতার বিনাশের সাথে সাথে অনেক গল্প হারিয়ে গেছে। আবার নতুন ধর্ম ও শাসন ব্যবস্থা চালু হলে পুরানো ধর্ম ও রাজনীতিকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা পৌরাণিক গল্পগুলো হারিয়ে গেছে। চর্চার অভাবে বা ভাষাজ্ঞান স্বল্পতার কারণেও অনেক পৌরাণিক গল্প আলোর মুখ দেখেনি। বর্তমানে পৃথিবীতে সবচেয়ে বেশি চর্চিত পৌরাণিক এর নাম গ্রীক পৌরাণিক। প্রাচীন গ্রীক সভ্যতাকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা গ্রীক পৌরাণিক এখনো বেশ আগ্রহের সাথে চর্চিত হয়। এর পাশাপাশি ভারতীয় পৌরাণিকও বেশ ভালোভাবেই টিকে আছে ।
 
মজার ব্যাপার হলো, গ্রীক পৌরাণিক প্রাচীন সাহিত্য হিসেবে চর্চিত হলেও ভারতীয় পৌরাণিককে এখনও হিন্দুরা তাদের ধর্মগ্রন্থ হিসেবে বিবেচনা করে। বর্তমানে বিশ্বের প্রায় ১০০ কোটি মানুষ হিন্দু ধর্ম পালন করে, যাদের অধিকাংশই ভারতীয় পৌরাণিক উপাখ্যানগুলোকে ধর্মগ্রন্থ মনে করে থাকে।
 
আগেই উল্লেখ করেছি মিথোলজির উৎপত্তি সমন্ধে কোন প্রামাণ্য দলিল পাওয়া যায় না। তাই ভারতীয় মিথোলজি কিভাবে সৃষ্টি হয়েছিলো, সে ব্যাপারেও কিছু জানা যায় না। তবে ধারণা করা যায়, প্রাচীন ভারতে মুনি ঋষিদের আশ্রমভিত্তিক যে জ্ঞান চর্চাকেন্দ্র গড়ে উঠেছিলো, সেখানেই প্রাতিষ্ঠানিকভাবে সাহিত্য চর্চার শুরু হয়। যেহেতু তখন যে কোন সাহিত্যের লিখিত রূপ তৈরি প্রায় অসম্ভব ছিলো, সেহেতু জনপ্রিয় সাহিত্যগুলো মুখে মুখে প্রচারিত হতো। আর এ কারণে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্নভাবে এই সাহিত্য পরিবর্তিত ও পরিবর্ধিত হত। এই সাহিত্যই কালক্রমে কিংবদন্তি ও কিংবদন্তী থেকেই হিন্দু ধর্মের উদ্ভব (ব্যক্তি অভিমত ও তর্কের অবকাশ রাখে)।
gurukula
গুরুকূলঃ প্রাচীন ভারতীয় আশ্রমভিত্তিক শিক্ষাব্যবস্থা
পৌরাণিকের লিখিত রূপ প্রকাশিত হওয়ার পরেও এর পরিবর্তন ও পরিবর্ধন বন্ধ হয়নি। বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন জন একই কাহিনীকে বিভিন্নভাবে উপস্থাপন করেছেন, চরিত্র ও ঘটনার যোজন-বিয়োজন করেছেন। ভারতীয় উপমহাদেশের পৌরাণিক সাহিত্যের ক্ষেত্রে একটা মজার ব্যাপার হলো, বর্তমানে যেখানে সারা পৃথিবীতে কুম্ভিলকবৃত্তি (plagiarism) মানে লেখা-চুরির মহড়া দেখা যায়, সেখানে ভারতীয় পূরাণের লেখকরা করতেন উল্টোটা। তারা তাদের লেখা প্রসিদ্ধ কোন ব্যক্তির নামে চালিয়ে দিতেন। এর ফলে দেখা যায় এক ব্যাসদেবের নামে এতো বেশি গ্রন্থ পাওয়া যায় যে, একজন মানুষ সারা জীবন খাওয়া-নাওয়া রেখে কেবল লিখতে থাকলেও বোধ হয় এত বেশি লেখা সম্ভব নয়। সবচেয়ে বিস্ময়কর তথ্য হলো, তাঁর নামে প্রচলিত গ্রন্থের অনেক লিখিত হয়েছে তাঁর জন্মের পূর্বে এবং অনেক তাঁর মৃত্যুর পরে।
 
পৌরাণিক গল্প কাহিনীর অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য হল সময়ের সাথে সাথে পরিবর্তন হওয়া। ফলে গল্পের পরিবর্তনের সাথে সাথে হিন্দু ধর্মও পরিবর্তিত হয়েছে। সময়ের সাথে হিন্দু ধর্ম যেমন বদলে গেছে, একই ভাবে হিন্দু ধর্মে প্রচলিত দেব-দেবী ও পূজিত ঈশ্বরেও পরিবর্তন এসেছে। হিন্দু ধর্ম বেদভিত্তিক থাকা অবস্থায় ইন্দ্র, বরুণ, উষা, সুর্য, চন্দ্র প্রভৃতি প্রকৃতি নির্ভর দেব-দেবী বেশি পূজিত হত। কিন্তু বেদ যুগ ও উপনিষদ যুগ শেষ হওয়ার সাথে সাথে এইসব দেব-দেবীরাও গুরুত্ব হারিয়েছে এবং সে স্থান দখল করেছে রাম, শিব, জগদ্ধাত্রী, হনুমান প্রভৃতি দেব-দেবী ও ঈশ্বর।
 
মধ্যযুগ থেকে হিন্দু ধর্মের বৈচিত্র‍্য আরো বাড়তে থাকে। বিভিন্ন পৌরাণিক গল্প ও চরিত্রকে কেন্দ্র করে ভিন্ন ভিন্ন অঞ্চলে দেব-দেবী ও হিন্দু ধর্মীয় আচরণে পরিবর্তন দেখা যায়। বর্তমানে লক্ষ্য করলে দেখা যাবে ইন্দোনেশীয় হিন্দুদের ধর্মীয় আচার ও ঈশ্বরের সাথে উত্তর ভারতীয় হিন্দু ধর্ম ও আচরে কোন মিল নেই। এমনকি উত্তর ভারতীয় হিন্দুর সাথে দক্ষিণ ভারতীয় হিন্দুর আচার ব্যবহারে মিল পাওয়া দুষ্কর হয়ে পড়ে। সবচেয়ে অবাক করা বিষয় একই জাতি ও প্রায় একইরকম ভাষা সংস্কৃতির হয়েও পশ্চিমবঙ্গীয় ও বাংলাদেশী হিন্দুদের মধ্যে ধর্মীয় আচরণগত পার্থক্য ব্যাপক। আবার বর্ণগত বিভাজনের কারণে ভিন্ন ভিন্ন বর্ণে ধর্মীয় আচরণ ভিন্ন ভিন্ন হয়।
 
এত পার্থক্য থাকা সত্বেও হিন্দু ধর্মের কিছু মূল্যবোধ, সামাজিক আচার ও ঈশ্বর সবখানে একই রকম। যেমন রক্তের সম্পর্ক আছে, এমন আত্মীয়দের মধ্যে বিয়ে সব অঞ্চলের হিন্দুরাই নিষিদ্ধ হিসাবে মেনে নিয়েছে। হিন্দু ধর্মের ছোট কয়েকটি লোক শাখা ব্যাতিত বর্ণবিভাজন সব অঞ্চলের হিন্দুদের মধ্যে বিদ্যমান। আবার শিব, কৃষ্ণ ও কালী সব অঞ্চলের হিন্দুদের দ্বারাই পুজিত হয়। তবে শিব ও কৃষ্ণকে কেন্দ্র করেও হিন্দুদের মাঝে দুইটি শাখা গড়ে উঠেছে। যারা শুধুমাত্র শিবের উপসনা করে তাদের শৈব ও যারা শুধুমাত্র কৃষ্ণের উপসনা করে তাদের বৈষ্ণব বলা হয় (উল্লেখ থাকে যে বাউলদের মত বৈষ্ণবদের একটি শাখা আছে। এরাই প্রধানতম শাখা। তবে গৃহী হিন্দু যারা কৃষ্ণের উপসনা করে, তারা গৌড়ীয় বৈষ্ণব মত অনুযায়ী চলে। বর্তমানে এদের সংখ্যাই সর্বাধিক)। বর্তমানে বাঙালী হিন্দুদের মধ্যে সর্বাধিক পূজিত ভগবানের নাম কৃষ্ণ। বাঙালী হিন্দুদের মধ্যে যারা শৈব বা শাক্ত তারাও কৃষ্ণকে ভগবান হিসাবে মেনে নিয়েছে। আবার বৈষ্ণব হিন্দুরাও শৈব বা শাক্তদের বিধর্মী আখ্যা দেয় না।
 
পৌরাণিক সাহিত্যের আলোকে কৃষ্ণঃ
হিন্দু ধর্মীয় শাস্ত্র বিবরণ অনুযায়ী, কৃষ্ণ দ্বাপর যুগে ভাদ্র মাসের কৃষ্ণপক্ষের অষ্টম তিথিতে যদু বংশে জন্মগ্রহন করেন। তিনি যদু রাজবংশের রাজধানী মথুরার রাজপরিবারের সন্তান, বাসুদেব ও দেবকীর অষ্টম পুত্র। তাঁর জন্ম হয়েছিল মথুরায়, তবে তিনি বেড়ে ওঠেন গোকুলে।
 
হিন্দুদের সর্বাপেক্ষা প্রাচীন গ্রন্থ বেদ বা উপনিষদে কৃষ্ণের অস্তিত্বের কোন প্রমাণ পাওয়া যায় না। কৃষ্ণের প্রথম উল্লেখ পাওয়া যায় ‘মহাভারত’ কাব্যে। সেখানে তাকে বর্ণনা করা হয় একজন রাজা ও পান্ডবদের প্রধানতম কূটনৈতিক হিসেবে। কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধে কৃষ্ণ সরাসরি অস্ত্র ধারণ না করে পাণ্ডব সেনাপতি অর্জুনের রথের চালক হিসেবে যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন। কৃষ্ণ অস্ত্র ধারণ না করলেও কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধে বলতে গেলে পাণ্ডবদের পক্ষে পুরোটাই তিনি নিয়ন্ত্রণ করেছেন। যুদ্ধের ময়দানে অর্জুনকে বিশ্বরূপ দেখানোর মাধ্যমেই প্রথম শ্রীকৃষ্ণের ঈশ্বর রূপ প্রকাশ পায়।
Krishna_Reveals_His_Vishwaroop_To_Arjuna_57888ba7-f6c8-4ce8-ae71-d784ac429b43
কুরুক্ষেত্রের ময়দানে অর্জুনকে বিশ্বরূপ প্রদর্শনের মাধ্যমে কৃষ্ণের প্রথম ঈশ্বররূপের পরিচিতি পাওয়া যায়
মহাভারতের ষষ্ঠ পর্বের (ভীষ্ম পর্ব) আঠারোটি অধ্যায় ভগবদ্গীতা নামে পৃথক ধর্মগ্রন্থের মর্যাদা পেয়েছে। কুরুক্ষেত্র যুদ্ধক্ষেত্রে অর্জুনকে প্রদত্ত কৃষ্ণের উপদেশাবলির সংকলনই হল ভগবদ্গীতা, যা বর্তমানে হিন্দুদের প্রধানতম ধর্মগ্রন্থ হিসাবে বিবেচিত হয়। মহাভারতে শ্রীকৃষ্ণকে একজন প্রাপ্ত বয়স্ক পুরুষ হিসাবে দেখানো হয়েছে, যদিও কোথাও কোথাও তাঁর বাল্যলীলারও আভাস দেওয়া হয়েছে। মহাভারতের পরবর্তীকালীন পরিশিষ্ট হরিবংশ গ্রন্থে কৃষ্ণের বাল্য ও কৈশোরের বিস্তারিত বর্ণনা রয়েছে।
 
মহাভারত কাব্যের পরে রচিত ‘বিষ্ণুপুরাণ’ ও ‘ভগবত পুরাণ’ গ্রন্থদ্বয়ে কৃষ্ণের বিস্তারিত বর্ণনা পাওয়া যায়। এই গ্রন্থদ্বয়ে কৃষ্ণের জন্ম, শৈশব, যৌবন, প্রেম, যুদ্ধ, বিয়ে, ইত্যাদি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়েছে। তবে মহাভারতে কৃষ্ণের অবস্থান বা অবদান সম্বন্ধে এই দুই গ্রন্থে কোন তথ্য নেই। তেমনি মহাভারতে কৃষ্ণের যৌবনের কিছু ঘটনার উল্লেখ থাকলেও শৈশব ও ব্যক্তিজীবন নিয়ে তেমন কোন তথ্য নেই। বেদব্যাস প্রণীত মহাভারত কাব্যের একটি মাত্র ঘটনাকে (বিশ্বরূপ প্রকাশ) কেন্দ্র করেই হয়ত ‘বিষ্ণুপুরাণ’ ও ‘ভগবত পুরাণ’ গ্রন্থদ্বয়ে কৃষ্ণকে ঈশ্বর হিসাবে প্রকাশ করা হয়েছে। এবং ‘বিষ্ণুপুরাণ’ ও ‘ভগবত পুরাণ’ রচিত হওয়ার বহু পরে গৌড়ীয় বৈষ্ণব সমাজ কৃষ্ণকে ঈশ্বর হিসেবে হিন্দুদের মধ্যে জনপ্রিয় করেছে। হিন্দু ধর্ম শুধুমাত্র পৌরাণিক গল্প নির্ভর ধর্ম হওয়ায় এমনটা সম্ভব হয়েছে।
 
রাধা কে? তিনি কি সত্যিই কৃষ্ণের মামী ছিলেন?
‘কংস মামা’ বাগধারাটির প্রয়োগ ‘নির্মম আত্মীয়’ অর্থে। বাগধারাটির বুৎপত্তি ঘটেছে শ্রীকৃষ্ণের প্রতি তাঁর কাকাতো মামা রাজা কংস এর মনোভাব থেকে। অত্যাচারী রাজা কংস দৈববাণীতে জানতে পারেন যে, কাকাতো বোন দেবকীর গর্ভজাত পুত্র সন্তানের হাতে তাঁর মৃত্যু হবে। এটা জেনে তিনি দেবকীর পুত্র কৃষ্ণকে ছলে বলে কৌশলে হত্যা করতে চাইতেন। সেখান থেকে  ‘আত্মীয় তবে ক্ষতিকারক আত্মীয়’ এরকমটা বুঝাতে আমরা ‘কংস মামা’ বাগধারাটি ব্যবহার করে থাকি। তবে মজার বিষয় হলো, কৃষ্ণের দিক থেকে কংস যতটা ‘কংস মামা’, কংসের দিক থেকে কৃষ্ণ ততটাই ‘কৃষ্ণ ভাগ্নে’, কারণ কৃষ্ণের হাতেই কংসের প্রাণ সংহার হয়েছিল। যেহেতু ইতিহাস সবসময় বিজয়ীর পক্ষে কথা বলে, তাই বাগধারাটি ‘কৃষ্ণ ভাগ্নে’ না হয়ে ‘কংস মামা’ হয়েছে।
 
কৃষ্ণের মামা কংস রাজা ছিলেন, মানে কংস ক্ষত্রীয় বর্ণজাত ছিলেন। যদি তাই হয়, তাহলে আয়ান ঘোষ এর স্ত্রী রাধা, মানে কৃষ্ণের প্রেমিকা, কিভাবে কৃষ্ণের মামী হন? আয়ান ঘোষ ছিলেন গোপ, মানে গোয়ালা। আর অন্যদিকে শ্রীমতি রাধিকা জমিদার কন্যা হলেও ছিলেন গোপ বংশজাত, মানে গোপিনী। এই সমস্যার সমধান করতে হলে আমাদের কৃষ্ণের জন্ম ও শৈশব সম্বন্ধে জানতে হবে।
 
কৃষ্ণের জন্মদাতা পিতার নাম বসুদেব, যিনি গোষ্ঠপতি (সামন্ত প্রভু) ছিলেন। শ্রী কৃষ্ণের মাতার নাম দেবকী, যিনি কিনা রাজা কংসের কাকাতো বোন ছিলেন। কিন্তু কংসের হাত থেকে কৃষ্ণকে বাঁচাতে পিতা-মাতা মিলে শিশু কৃষ্ণকে নন্দ ঘোষ ও তার স্ত্রী যশোদার নিকট রেখে আসেন। সেই হিসেবে নন্দ ঘোষ ও তাঁর স্ত্রী যশোদা কৃষ্ণের পালক বাবা-মা। আয়ান ঘোষ ছিলেন যশোদার ভাই এবং এই সূত্রেই রাধা কৃষ্ণের মামী। এখানে এটা স্পষ্ট যে, রাধা কোনভাবেই কৃষ্ণের আপন মামী নন। অন্যদিকে বড়ূ চন্ডীদাস বা অন্য কোন কবি বা কোন কৃষ্ণ গবেষক এটা পরিষ্কার করে বলেননি যে, নন্দ ঘোষ যশোদার কেমন ভাই ছিলেন।
 
রাধার সাথে কৃষ্ণের প্রথম দেখা হয় পরিণত বয়সে, ‘কালিয়া বধ’ এর পরে। তখন কৃষ্ণ রাধাকে মামী হিসেবে চিনতে পারেননি। আর সেকারণেই তিনি তার বন্ধু সুবলকে জিজ্ঞেস করেছিলেন, “ওই নারীটি কে?” তার মানে এটা নিশ্চিত যে, আয়ান ঘোষ যশোদা মাঈয়ের খুব একটা কাছের সম্পর্কের কোন ভাই নন। যদি আপন এমনকি কাজিনও হতেন, তাহলে তাদের দুই পরিবারের মধ্যে যাওয়া-আসা থাকত, আর সেটা থাকলে রাধাকে চিনতে কৃষ্ণের কোন কষ্ট হত না। তবে এটা হতে পারে যে, আয়ান ঘোষ সম্পর্কে যশোদার পাড়াত ভাই, মানে একই এলাকায় বসবাস বা একই গোত্রভুক্ত হওয়ার কারণে তিনি যশোদাকে দিদি বলে ডাকতেন, যেরকমটা আমরা এখনও দেখতে পাই। তবে রাধা অবশ্যই আয়ান ঘোষের বিবাহিত স্ত্রী ছিলেন, এটা অস্বীকার করার উপায় নেই।
 
রাধা-কৃষ্ণের প্রেমঃ
ব্রহ্মবৈবর্ত পুরাণ, ‘বিষ্ণুপুরাণ’ ও ‘ভগবত পুরাণ’ এই তিন গ্রন্থে আমরা কৃষ্ণের জীবনে ঘটে যাওয়া অনেক বাস্তব ও অবাস্তব ঘটনার বর্ণনা পাই। কৃষ্ণের উল্লেখ পাওয়া প্রথম গ্রন্থ মহাভারতে যার সামান্যতম ইঙ্গিত নেই। এই তিন গ্রন্থেই কৃষ্ণের প্রেমিকা হিসেবে রাধার উপস্থিতি পাওয়া যায়। কৃষ্ণ লীলার অনেকটা অংশ জুড়ে আছে রাধা চরিত্রটি। বর্তমানে সব জায়গাতেই কৃষ্ণের সাথে সাথে রাধাও পূজিত হন, যদিও রাধা-কৃষ্ণের সম্পর্কটি ছিলো সামাজিক ও ধর্মীয় রীতিতে সম্পুর্ন অবৈধ। কিন্তু তারপরেও গোড়া ও এখনো পুরোমাত্রায় কুসংস্কারাচ্ছন্ন হিন্দু সমাজ কেন ও কিভাবে এই সম্পর্কটিকে মর্যাদা দিয়েছে সেটা গবেষণার দাবী রাখে।
 
মহাভারতে রাধা চরিত্রটির কোন উল্লেখ নেই। তবে লোকমুখে বা হিন্দুদের মধ্যে কৃষ্ণকে জনপ্রিয় করতে রাধা চরিত্রের ভূমিকা সবচেয়ে বেশি। রাধাকে প্রেম নিবেদন, তাতে ব্যর্থ হয়ে উত্যক্ত করা, রাধা রাজি হলে তার সাথে উদ্যাম প্রেম, রাধার সারল্যের সুযোগ নিয়ে যত্রতত্র ব্যবহার, শেষে বহুগামিতা ও মথুরায় ফিরে যাওয়ার পরে রাধার বিরহ, সবই হিন্দুরা পবিত্রতার চোখে দেখে। যদিও সমাজ প্রেক্ষাপট বিচারে রাধা ও কৃষ্ণ এর সম্পর্ক কে অবৈধ কামলীলা ছাড়া আর কিছুই বলা যায় না, এবং রাধা-কৃষ্ণ সম্পর্কের আলোকে যদি কৃষ্ণ চরিত্রটি ব্যাখ্যা করা হয়, তবে কৃষ্ণকে এক কথায় লম্পট চরিত্রহীন বখাটে বলা যায় ।
radha
আহা! কী প্রেম!
রাধা-কৃষ্ণের সম্পর্কটিকে বিভিন্ন জন বিভিন্নভাবে ব্যখ্যা করেছেন। কারো মতে রাধা-কৃষ্ণর সম্পর্কটি মূলত সৃষ্টি ও স্রষ্টার সম্পর্ক। হিন্দু ধর্ম অনুযায়ী প্রতিটি সৃষ্টির মূখ্য উদ্দেশ্য পরম সত্ত্বা অর্থাৎ স্রষ্টার সাথে বিলীন হয়ে যাওয়া। সৃষ্টি যেমন স্রষ্টার সাথে এক হতে চায়, তেমনি স্রষ্টাও সৃষ্টির সাথে এক হতে চায়। কিন্তু নানান বাঁধার কারণে তা সম্ভব হয়ে ওঠে না, বা সম্ভব হলেও তা খুবই দুষ্কর। এই অবস্থা বোঝাতেই রাধা ও কৃষ্ণের মধ্যে সম্পর্ককে রূপক অর্থে বোঝানো হয়েছে।
 .
বৈষ্ণবরা রাধা-কৃষ্ণের প্রেমের মধ্যে পবিত্রতা আনতে প্রেমের সম্পর্কটিকে নিষ্কাম বলে ব্যাখ্যা দিয়েছেন। তাঁদের মত অনুযায়ী ‘আত্মইন্দ্রিয় প্রীতি ইচ্ছা তারে কয় কাম/কৃষ্ণেন্দীয় প্রীতি ইচ্ছা ধরে প্রেম নাম’। অর্থাৎ কৃষ্ণের প্রতি রাধার যে ভালোবাসা বা টান ছিলো তা প্রেম। এর মধ্যে কামের কোন প্রভাব নেই। বৈষ্ণব মতে ঈশ্বর বা কৃষ্ণই একমাত্র পুরুষ। বাকি সব প্রকৃতি। মরমী সাধক লালন সাই যেমন সারা জীবন মনের মানুষ অর্থাৎ নিজেকে জানার বা আত্মোপলব্ধির চেষ্টা করেছেন, তেমনি প্রকৃতির লক্ষ্য পুরুষের সাথে বিলীন হয়ে যাওয়া। কোন কোন দার্শনিক রাধা ও কৃষ্ণের এই সম্পর্ককে দর্শনের সবচেয়ে পুরানো ধারণা নিজেকে জানা বা আত্মোপলব্ধির সাথে ব্যাখ্যা করেছেন।
17629922_270725980050268_1215535579194096643_n
কবিরা রাধা-কৃষ্ণ চরিত্রকে এঁকেছেন মনের মাধুরী মিশিয়ে। এঁকেছেন একালে চিত্রকররাও।
ধর্ম মেনে বিভিন্নজন বিভিন্নভাবে রাধা-কৃষ্ণের সম্পর্ককে মহিমান্বিত করেছেন, তবে বাংলা সাহিত্যের দৃষ্টিতে দেখলে রাধা-কৃষ্ণ চরিত্র দুটি মধ্যযুগীয় সাহিত্যের প্রধানতম চরিত্র। আর রাধা-কৃষ্ণকে ঘরে ঘরে পৌঁছে দিয়েছিল মধ্যযুগীয় বিভিন্ন কবিয়াল ও সাহিত্যিকেরা। তারা রাধা-কৃষ্ণকে ঈশ্বর মেনে সাহিত্য রচনা করেছিলেন, নাকি দুটি স্বাভাবিক চরিত্র হিসেবে নিয়েছিলেন তা নিয়েও প্রশ্ন উপস্থাপন করা যায়। মধ্যযুগীয় অন্যতম কবি জয়দেব গীতগোবিন্দ গ্রন্থে রাধা-কৃষ্ণ সম্পর্কিত বহু গান রচনা করেছেন। সেখানে রাধা-কৃষ্ণের সম্পর্কের যে বর্ণনা দেওয়া হয়েছে, তার পুরোটাই অশ্লীলতা ও কামক্রীড়ায় ভরপুর ।
 
আরেকটি বিষয়, বড়ু চন্ডীদাসের শ্রীকৃষ্ণ কীর্তন বা ভাগবত ও ব্রহ্মবৈবর্ত পুরাণে বলা হয়েছে, আয়ান ঘোষ বৃহন্নলা অর্থাৎ হিজড়া ছিলেন। ফলে আয়ান তাঁর যুবতী স্ত্রীর স্বাভাবিক জৈবিক চাহিদা পুরণে অক্ষম ছিলেন, যা রাধাকে বিবাহবহির্ভুত আরেকটি সম্পর্ক স্থাপনে প্রলোভিত করেছে। এই ব্যাপারটি নিয়েও ধোঁয়াশা আছে। কারণ আমাদের বর্তমান সমাজেও হিজড়ারা সামাজিক জীবন যাপন করে না। তারা স্বাভাবিক সমাজের বাইরে সম্পুর্ন আলাদা পদ্ধতিতে বেঁচে থাকে। হিন্দু ধর্মমতে হিজড়ারা ঈশ্বরের সন্তান এবং ধর্মীয় বিধান অনুযায়ী  তারা স্বাভাবিক সমাজের বাইরে বসবাস করে। তাহলে প্রশ্ন জাগে, আয়ান ঘোষ বৃহন্নলা হয়েও আর দশটা স্বাভাবিক মানুষের মত কেন সমাজেই বাস করতেন। এটা কি মধ্য বা প্রাচীন যুগে সম্ভব ছিল?
 
রাধা কোনভাবেই কৃষ্ণের মামী নন। কিন্তু এই বিষয়টি অনেকে না জেনেই ফুলিয়ে ফাপিয়ে লেখেন, ট্রল করেন। এটা হতেই পারে। আমরাও পড়ে মজা পাই। রাধা-কৃষ্ণ পৌরাণিক চরিত্র। আর তাই জনপ্রিয় পৌরাণিক চরিত্র নিয়ে হাজার হাজার গুজব বা মূল গল্পের বাইরেও ভ্রান্ত গল্প প্রচারিত হবে এটা স্বাভাবিক। কিন্তু কিছু লোক আছে, যারা সত্যিটা না জেনেই নাক সিটকান, আমাদের স্থানীয় সংস্কৃতি ও সাহিত্যকে খাটো করে দেখানোর জন্য রাধা-কৃষ্ণের সম্পর্কটিকে অশ্লীল তকমা দেন। তাদের উদ্দেশ্য বলতে চাই, রাধা-কৃষ্ণের কাহিনী যখন লিখিত হয়েছে, প্রায় একই সময়ে গ্রিক নাট্যকার সফোক্লেস ‘রাজা ওডিপাস’ নামে একটা ট্রাজেডি লেখেন, যাতে সরাসরি আজাচার দেখানো হয়েছে। প্রসঙ্গত, ‘ওডিপাস কমপ্লেক্স’ টার্মটি নেয়া হয়েছে ঐ নাটক থেকেই।
 
পরিশেষঃ
রাধা ও কৃষ্ণ আমার খুবই পছন্দের দুটি চরিত্র। মনে মনে নিজে কৃষ্ণ হওয়ার চেষ্টা না করলেও, আমি আমার প্রেমিকাদের সব সময়ে রাধা হিসাবেই কল্পনা করেছি। হিন্দু ধর্ম রাধা ও কৃষ্ণকে কিভাবে দেখে বা পূজা করে, তা আমার কাছে গুরুত্বপুর্ন নয়। রাধা ও কৃষ্ণের নাম শুনলেই আমার মানসপটে শ্বাশত প্রেমিক প্রেমিকার মুর্তি ভেসে ওঠে। রাধা ও কৃষ্ণের মধ্যকার যে বিরহ, তা এই আধুনিক যুগে এসেও সমানভাবে প্রাসঙ্গিক। এটা নিশ্চিত বলা যায় যে, বাংলা সাহিত্যে রাধা ও কৃষ্ণ চরিত্রকে নিয়ে যত সাহিত্য রচিত হয়েছে, অন্য কোন চরিত্রকে কেন্দ্র করে ততটা রচিত হয়নি। বাংলা সাহিত্যে এই দুটি চরিত্রের প্রভাব এতটাই যে, রাধা-কৃষ্ণ সৃষ্টি না হলে হয়ত বাংলা সাহিত্য বর্তমানের পরিপক্কতা পেতো না।
 
পরিশেষে বলতে চাই, ধর্মীয় আঙ্গিক বাদ দিয়েও রাধা-কৃষ্ণ চরিত্র দুটি বাংলা সাহিত্যে খুবই গুরুত্বপুর্ন দুটি চরিত্র, তাই ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ উপেক্ষা করে এই চরিত্র দুটি নিয়ে আরও ব্যপক গবেষণার সময় এসেছে এখন।
…….
[এই প্রবন্ধটি লিখেছেন বায়রনিক শুভ্র। এডিটিংয়ে সন্ন্যাসী রতন। প্রবন্ধটি সাপ্তাহিক পাঠচক্র ‘খাপছাড়া আড্ডায়’ পাঠ করা হয়েছিল ২৭.০৪.১৮ তারিখে।]।
Advertisements

2 comments

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s