মেদ-ভুঁড়ি কী করিঃ ওজন কমানোর ডিজিটাল উপায়

প্রথমেই যেটা বলে রাখা গুরুত্বপূর্ণ – এই পোস্ট আমার নিজস্ব অভিজ্ঞতার আলোকে লেখা, সাথে কিছু টুকরো টুকরো জ্ঞান নেয়া হয়েছে বিভিন্ন ইংরেজি ব্লগ থেকে। কেউ কেউ আমার অভিজ্ঞতা লিখতে বলেছিলেন বলেই এই পোস্টের অবতারণা। এই পোস্ট কোন বিশেষজ্ঞ পোস্ট নয়। বিশেষজ্ঞ আলোচনার জন্য পত্র-পত্রিকা, টেলিভিশন, ইত্যাদি রয়েছে।

আমরা এখন ডিজিটাল যুগে বাস করছি। আমাদের যে কোন কাজে সাহায্য করার জন্য এখন অনেক ডিজিটাল মাধ্যম রয়েছে। সেগুলোর ব্যবহার কী করে ওজন কমাতে সাহায্য করতে পারে, অভিজ্ঞতার আলোকে তা তুলে ধরা হয়েছে এই পোস্টে।

যেহেতু আপনি ওজন কমানোর চিন্তা করছেন, তাই অবশ্যই আপনার একটা ওজন মাপার যন্ত্র আছে বলে ধরে নিচ্ছি। না থাকেল একটা কিনে ফেলুন। সাথে আর যে যন্ত্রটি লাগবে, সেটি একটি মোবাইল। এই পোস্ট যেহেতু পড়ছেন, তার মানে সেটি আপনার ইতোমধ্যেই আছে।

ওজন কমানোর গণিতঃ
ওজন কমানোর আসলে একটাই উপায় – খাদ্যের মাধ্যমে আপনার শরীরে যে পরিমান ক্যালোরি গ্রহণ করছেন, তার চেয়ে বেশি ব্যয় (বার্ন) করা। সোজা কথা, শরীরে ক্যালরি ঘাটতি তৈরি করা। সেটা কিভাবে সম্ভব তা নিয়েই এই পোস্টের আলোচনা।

শরীরে ক্যালরি ঘাটতি তৈরি সম্ভব দুই ভাবে। এক, ডায়েটিং মানে খাদ্য কম গ্রহণ করা। দুই, খাদ্য গ্রহণ ঠিক রেখে কায়িক শ্রম ও ব্যায়ামের মাধ্যমে শরীর থেকে মেদ কমানো। আমার কাছে মনে হয়েছে দুটো একসাথে করাটাই সবচেয়ে যুক্তিসংগত।

সম্ভবত এইটুকু পড়েই আপনার মাথা ঘুরছে। আমি বুঝবো কী করে যে আমি কত ক্যালরি খাদ্য গ্রহণ করছি এবং কতটা বার্ন করছি, বা আমার কত ক্যালরি খাদ্যের প্রয়োজন। কিংবা ওজন কমাতে হলে আমাকে কত ক্যালরি খাদ্যের প্রয়োজন হবে বা কত ক্যালরি কমাতে হবে। এ বিষয়গুলো নিয়ে অবশ্যই বলবো।

BMI বা বডি মাস ইনডেক্সঃ
প্রথমেই জানা দরকার আপনার শরীর থেকে কতটুকু ওজন কমাতে হবে বা আদৌ ওজন কমাতে হবে কিনা। এজন্য আপনার জানা দরকার আপনার শরীরের BMI বা বডি মাস ইনডেক্স। বিএমআই হলো আপনার উচ্চতা ও বয়স অনুযায়ী ওজনের হার। সোজা কথায় আপনার শরীরে চর্বির পরিমান। লিঙ্গভেদে এটা ভিন্ন হয়। এটা জানার জন্য ইন্টারনেটে বিএমআই ক্যালকুলেটর ব্যবহার করতে পারেন বা আপনার মোবাইলের হেলথ/ফিটনেস বিষয়ক এ্যাপ ব্যবহার করতে পারেন।

আপনার বিএমআই যদি ১৮.৫ থেকে ২৫-এর মধ্যে হয়, তাহলে আপনার ওজন কমানোর চিন্তা না করলেও চলবে। ২৫-৩০ হলে আপনি ওভারওয়েট এবং এর বেশি হলে আপনি স্থুল। আমি যখন ওজন কমানোর চিন্তা করি, তখন আমার বিএমআই ছিল ২৮.৫। বর্তমানে আট কেজি ওজন কমানোয় তা ২৫.৬-এর নেমে এসেছে।

এখানে একটা বিষয় জানা ভালো, বিএমআই ২৫-এ নেমে এলেই যে আপনি স্বাস্থ্যবান হবেন এমন নয়। খেলোয়াড়, বডি বিল্ডাররা ২৫-এর অনেক বেশি বিএমআই নিয়েও স্বাস্থ্যবান, কারণ তাদের শরীরে পেশী অনেক বেশি। আবার ভারতীয় উপমহাদেশে ২৫-এর নিচে বিএমআই থাকলেও মানুষ বিভিন্ন প্রকার ওজনজনিত স্বাস্থ্য সমস্যায় ভোগে। আপনি সম্ভবত খেলোয়াড় বা বডি বিল্ডার কোনটাই নন। সুতরাং এখান থেকে আপনার আদর্শ ওজন নির্ধারণ করে নিন।

কতটুকু খাবেন?
প্রত্যেক মানুষের শরীরের ওজন ও এ্যাক্টিভিটি অনুযায়ী খাদ্যের চাহিদা নির্ভর করে। আপনার কতটুকু খাদ্যের প্রয়োজন, তা যে কোন ক্যালরি ক্যালকুলেটর ব্যবহার করে বের করতে পারেন। আমি এখানে আমার ক্যালরি চাহিদার স্ক্রিনশট দিলাম।

এই স্ক্রিনশটের ডানে ফিটনেস ও হেলথ সংক্রান্ত আরো কিছু ক্যালকুলেটর আছে। এগুলোও আপনার কাজে লাগবে।

ওপরের স্ক্রিনশটে যে ইনপুট দিয়েছিলাম, তার হিসাব এসেছে নিচের স্ক্রিনশটে। উল্লেখ্য আমি এ্যাক্টিভিটিতে লাইট এক্সারসাইজ দিয়েছি, তবে আমি সাধারণত এর থেকে একটু বেশিই সক্রিয়। আপনি যদি একদমই সক্রিয় না হোন, সেটাও ওখানে ইনপুট দিতে পারবেন।

পূর্বের স্ক্রিনশটে আমার শারীরিক বৈশিষ্ট্যের যে ইনপুট দিয়েছিলাম, সে অনুযায়ী আমার দৈনন্দিন খাদ্যের চাহিদা।

এখানে যে বিষয়টা লক্ষণীয় তা হলো, আপনি সাপ্তাহিক কতটুকু ওজন কমাতে চান। যদি আপনি খুবই কম সক্রিয় হোন তাহলে ২ এবং মডারেট সক্রিয় হলে ৩ নম্বরের কথা চিন্তা করতে পারেন, মানে সপ্তাহে ২৫০ গ্রাম বা আধ কেজি।

এবার আসি কিভাবে আপনি কত ক্যালরি খাদ্য গ্রহণ করছেন, তার হিসাব রাখতে পারবেন। এটাই সম্ভবত সবচেয়ে কঠিন কাজ বলে মনে হচ্ছে আপনার কাছে। এর জন্য আপনাকে সাহায্য করবে আপনার মোবাইল। ক্যালরি হিসাব করার জন্য এখন বিভিন্ন এ্যাপ রয়েছে। আমার কাছে সবচেয়ে ভাল মনে হয়েছে Myfitnesspal. এই কাজে ব্যবহৃত এটা পৃথিবীর সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত মোবাইল এ্যাপ। প্লেস্টোর বা এ্যাপল স্টোর থেকে এ্যাপটা ডাউনলোড করে আপনার প্রোফাইল তৈরি করে নিন।

মাইফিটনেসপাল প্রোফাইলে আপনাকে যা যা এন্ট্রি দিতে হবে। বয়স, উচ্চতা, ওজন, এ্যাকটিভিটি লেভেল, কাঙ্খিত ওজন, সাপ্তাহিক ওজন কমানোর লক্ষ্যমাত্রা। এগুলো দিলে এ্যাপটি আপনার দৈনিক প্রয়োজনীয় ক্যালরির একটা হিসাব দিবে এবং যখন আপনি খাদ্য ইনপুট দিবেন, তখন সেটা দৈনিক ভিত্তিতে হিসাব রাখবে।

মাইফিটনেসপালের সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো এখানে খাদ্যের প্যাকেটের কোড স্ক্যান করে খাদ্য এন্ট্রি দেয়া যায়। নিচের স্ক্রিনশটটি দেখুন। সপ্তাহে আমার লক্ষ্য আধ কেজি ওজন কমানো। সেই হিসেবে এ্যাপটি আমার খাদ্য চাহিদা ধরেছে ১৫০০ ক্যালরি (ওপরের ক্যালকুলেটর অবশ্য হিসাব করেছে ১৬৬৭ ক্যালরি), আমি খাদ্য গ্রহণ করেছি ১৮৩৭ ক্যালরি। সাথে ব্যায়ামে বার্ন করেছি ৮৪৫ ক্যালরি। আমি ঐ দিনে আরো ৫০০ ক্যালরি খাদ্য খেলেও তা ঐ সাপ্তাহিক আধ কেজি ওজন হারানোর লক্ষ্যের মধ্যে থাকবে।

এই এ্যাপের ডায়েরিতে গিয়ে ব্রেকফাস্ট, লাঞ্চ, ডিনার ইত্যাদিতে পৃথক পৃথকভাবে খাদ্যের এন্ট্রি দিতে পারবেন। খাদ্যের নাম লিখে সার্চ দিলেই নাম আসবে। সেখান থেকে আপনার খাদ্যের এন্ট্রি দিন। না থাকলে খাদ্যের প্যাকেট থেকে কোড স্ক্যান করে আপনার পরিমাণটা মোটামুটি আন্দাজ করে বসিয়ে দিন। এখানে যে চারটা খাদ্য দেখছেন, তার তিনটাই প্যাকেটের গা থেকে কোড স্ক্যান করে এন্ট্রি দেয়া।

এটাতে আরো যেটা দেখা যাচ্ছে তা হলো এক্সারসাইজ। এটা কিন্তু আমি এন্ট্রি দিইনি, অন্য একটা এ্যাপ থেকে এসেছে। আমি সহায়ক এ্যাপ হিসেবে ব্যবহার করি গুগল ফিট (Fit)। ফিট এ্যাপটি আপনার একটিভিটিকে অটোমেটিক ট্রেস করবে এবং আপনি Myfitness এ্যাপকে Fit-এ্যাপের সাথে সংযোগ করে দিলে ওখান থেকে আপনার এ্যাকটিভিটি সরাসরি এই এ্যাপে যোগ হয়ে যাবে। আপনি স্যামসাং হেলথ এ্যাপের সাথে সংযোগ করেও এটি পেতে পারেন। পেতে পারেন বিভিন্ন ফিটনেস ডিভাইসকেও (যেমন স্মার্ট ঘড়ি) Myfitnesspal-এর সাথে সংযুক্ত করে। তবে Huawei-এর হেলথ এ্যাপকে বা Huawei-এর স্মার্ট ঘড়িকে মাইফিটনেসপাল-এর সাথে সংযুক্ত করা যায় না। আমার মত যারা Huawei বা অন্য চাইনিজ মোবাইল ব্যবহার করেন, তাদের জন্য গুগল ফিটই ভরসা।

যেভাবে Myfitnesspal-কে Samsung Health বা অন্য এ্যাপ/ডিভাইসের সাথে সংযুক্ত করবেনঃ মাইফিটনেসপালের সেটিংসে গিয়ে Apps & Devices-এর ডিভাইসে যাবেন। সেখানে বিবিধ এ্যাপ/ডিভাইসের নাম পাবেন এবং সহজেই যোগ করে দিতে পারবেন।

এই স্ক্রিনশটে দেখা যাচ্ছে লুচি, মুগ ডাল পর্যন্ত ওখানে এন্ট্রি আছে। আমি আমড়া পর্যন্ত পেয়েছি। তবে কিছু খাদ্য আপনি পাবেন না। যেমন ধরুন, কুমড়া শাক। আপনার সব খাদ্যই যে এন্ট্রি দিতে হবে এমন না, এই এ্যাপটা হলো আপনার খাদ্যের মোটামুটি একটা হিসাব রাখার জন্য যাতে আপনি ধারণা করতে পারেন আপনার শরীরের জন্য কতটা খাদ্য প্রয়োজন এবং আপনি কতটা খাচ্ছেন। বেশি হয়ে গেলে যাতে নিয়ন্ত্রণ করা যায় বা এ্যাকটিভিটির মাধ্যমে বার্ন করা যায়।

কী খাবেন?
এখানে একটা বিষয় বলা ভালো, আপনি একেবারে শুয়ে বসেও কেবল খাদ্যগ্রহণ কমিয়ে শরীরের ওজন কমাতে পারেন। কিছুদিন আগে ভিন্ন প্রসঙ্গে একটা পডকাস্ট শুনতে গিয়ে এ বিষয়ে একটা বইয়ের নাম শুনেছিলাম। বইয়ের লেখক বলেছেন যখন আপনি ওজন কমাবেন তখন একদমই ব্যায়াম করবেন না। যিনি সেই বইটা বিষয়ে বলছিলেন, তিনি ওটা প্রয়োগ করে ১০ কেজি ওজন কমিয়েছেন। তবে তিনি যেভাবে সকল ধরণের রসনাকে বাতিল করে দিয়েছেন, তা আমার আপনার পক্ষে সম্ভব বলে মনে হয় না।

আমি খাদ্যরসিক, তাই খাবারের লোভ সামলে ওজন কমানোর পক্ষপাতী নই। তবে ওজন কমাতে হলে খাদ্যে কিছু নিয়ন্ত্রণ বা পরিবর্তন আনতেই হবে। যেমন, আপনার যদি আমার মত সকালে ঘুম থেকে উঠেই নাস্তা প্রয়োজন হয়, তাহলে সকালের নাস্তায় আমিষ বাড়াতে হবে। এজন্য আমার মতো ডিম ও দুধকে সকালের নাস্তার নিত্যসঙ্গী করে নিন।

আমিষ জাতীয় খাদ্য ভাঙতে সময় বেশি লাগে। ফলে সেটা অনেক সময় স্থায়ী হয়। শর্করা জাতীয় খাদ্য খুব দ্রুত হজম হয় বলে খাওয়ার কিছু সময় পরেই ক্ষুধা অনুভূত হয়। আপনি একই পরিমান ক্যালরি ইনপুট দিয়েও আমিষ জাতীয় খাদ্য বেশি খেলে খিদে লাগতে দেরি হবে। তাছাড়া আরেকটা বিষয় হলো, অনেক সময় খাওয়ার ঘণ্টা দুয়েক পরেই আমাদের একটা খিদে অনুভূত হয়। এটা ঠিক খিদে নয়। আপনি খাওয়ার সময়ে খুব একটা জল খান না। ফলে শর্করা হজমের জন্য যে পরিমান জল দরকার, তাতে ঘাটতি পড়ে। তখন আপনি জলের চাহিদা বোধ না করে খাদ্যের চাহিদা বোধ করেন। এটাকে বলা হয় নকল খিদে। এ সময়ে এক গ্লাস জল খেলেই খিদেটা মরে যায়।

ওজন কমানোর জন্য একটা জায়গায় আপনাকে খাদ্য নিয়ন্ত্রণ করতেই হবে। সেটা হলো রাত নটার পরে পারতপক্ষে কিছু খাওয়া যাবে না। বাংলাদেশে এটা একটা বড় সমস্যা। ডিনার করতে রাত দশ/এগারটা বেজে যায়। ডিনার শেষেই ঘুম দেয়া হয়। ফলে ঐ খাদ্যের বেশিরভাগই মেদ হিসেবে জমা হয়। ওজন কমাতে চাইলে ডিনারকে এগিয়ে আনতে হবে। এবং ডিনারের পরে অনেক রাত জাগা হলে কেবল এক গ্লাস দুধ বা একটা ফল বা এ জাতীয় কোন খাদ্যের বেশি কিছু খাওয়া যাবে না বা উচিত হবে না।

ওজন কমানো বিষয়ে বলতে গেলেই সবাই শর্করা জাতীয় খাবার কমানোর কথা বলে, বিশেষ করে চিনি একদম কেটে ফেলার নির্দেশনা দেয়। আমাদের শরীরের জন্য সবকিছুরই দরকার আছে। চিনিরও দরকার আছে। আমি বলবো আপনি সবই খান কোন সমস্যা নেই। যেহেতু আপনার কাছে সব খাবারেরই হিসাব রয়েছে, তাই কোন কিছু বেশি হয়ে গেলে মাইফিটনেসপাল এ্যাপ আপনাকে বলে দিবে। পরবর্তীতে এ বিষয়ে নজর দিবেন।

এখানে আরেকটা কথা, আপনাকে সকল খাবারই এ্যাপে ইনপুট দিতে হবে (চিনি ছাড়া চা/কফি বাদে), এটা আপনার কাছে ক্লান্তিকর মনে হতে পারে। এটাতে আসলে খুব বেশি সময় নেয় না। আপনি খাওয়া শেষ হতেই দুই মিনিট সময় ব্যয় করে ইনপুট দিয়ে ফেলুন। মোবাইলটা নিশ্চয়ই সবসময় আপনার হাতেই থাকে। ফেসবুকে দুই মিনিট সময় কমই না হয় থাকলেন, তাতে এমন কিছু হারাবে না। আপনি যে কাজটা করছেন, তাতে আপনার লাভই হবে।

কিভাবে খাবেন?
আমার মতামত হলো, আপনার যখন খিদে লাগবে তখনই খাবেন। সাধারণভাবে একজন মানুষের দিনে পাঁচ থেকে ছবার খাওয়া আবশ্যক। রাতে ঘুমানো ব্যতিত দুই খাবারের মাঝে ৪/৫ ঘণ্টার বেশি বিরতি দেয়া ঠিক না। দুই মূল খাবারের মাঝখানে একটা ফল খেতে পারেন। আর প্যাকেটজাত যে কোন খাবার কিনলে খাওয়ার পূর্বে তার ক্যালরি চেক করে নিন। আর যেগুলোতে ওভাবে চেক করার উপায় নেই, সেটা চেক করতে পারবেন মাইফিটনেসপাল এ্যাপে।

ব্যায়াম বা ফিজিক্যাল এক্টিভিটিঃ
ওজন কমাতে আপনাকে শরীরে ক্যালরি ঘাটতি তৈরি করতে হবে যাতে শরীর তার কার্যক্রম ঠিক রাখতে ইতোমধ্যে শরীরে মজুদ খাদ্য তথা চর্বি পুড়ে সেটা পুষিয়ে নেয়। ডায়েটিং করে এটা যেমন করা যায়, তেমনি করা যায় খাদ্য ঠিক রেখে শারীরিক ব্যায়াম বাড়িয়ে।

নিয়মিত শারীরিক ব্যায়াম একটা খুবই দুঃসাধ্য কাজ। অভ্যাস গড়ে না তুলতে পারলে এটা একেবারেই অসম্ভব। সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো ঘর থেকে বের হওয়া। আমি যখন প্রথমে হাঁটতে শুরু করি, তখন কিছুতেই ইচ্ছে করতো না কম্পিউটারের সামনে থেকে উঠে বাইরে যাই। এক্ষেত্রেও আপনাকে সাহায্য করবে মোবাইল।

মোবাইলে আপনার হেলথ এ্যাপে একটা দৈনিক লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করুন। অন্য সকল এ্যাপ দৈনিক লক্ষ্যমাত্রা হিসেবে কেবল স্টেপকে ধরলেও গুগল ফিট এ্যাপে হার্ট পয়েন্ট নামক আরেকটি বিষয় আছে। দৈনিক স্টেপ লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করুন ৭০০০ থেকে ১০০০০ এবং যে কোনভাবে এটা অর্জন করার চেষ্টা করুন। আমি গুগল ফিট ব্যবহার করার পক্ষপাতী কারণ, এটাতে হার্ট পয়েন্ট হিসাব করে আপনার হাঁটাহাঁটি বা অন্যান্য শারীরিক ব্যায়ামের ইন্টেসিটির ওপরে। দৈনিক ৫০-৭০ হার্ট পয়েন্ট টার্গেট দিয়ে নিন এবং সেটা অর্জন করার চেষ্টা করুন। প্রতিদিনই যে এটা অর্জন করতে পারবেন তা নয়। আবহাওয়া খারাপ হতে পারে বা আপনি অন্য জরুরী কাজে ব্যস্ত থাকতে পারেন। তবে যেদিন পারবেন সেদিন নিজের কাছেই একটা ভাল-লাগা অনুভব হবে।

শারীরিক ব্যায়ামের ক্ষেত্রে যে বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ তা হলো, আপনি যদি নতুন শুরু করেন, তাহলে প্রথমেই দৌড়ানো বা এরকম কঠিন কিছু শুরু না করাই ভাল। আমি শুরু করেছিলাম হাঁটা দিয়ে। প্রথমে চার/পাঁচ কিলোমিটার হাঁটতাম। পরে আস্তে আস্তে জগিং শুরু করেছি। এক্ষেত্রে আমাকে সাহায্য করেছে Huawei হেলথ এ্যাপের ইন্টারভ্যাল রান। ইন্টারভ্যাল রানে হাঁটা এবং জগিং-এর মিশ্রনে একটা রানিং প্রোগ্রাম রয়েছে। নিচে স্ক্রিনশট দেয়া হলো।

এখানে প্রথম ৫ মিনিট হাঁটা, পরে ৩ মিনিটি জগিং পরের দুই মিনিট আবার হাঁটা। এভাবে জগিং ও হাঁটা মিলে মোট ৩০ মিনিটের কোর্স।

যখন আপনি এভাবে ক্রমে জগিংয়ে নিজের শরীরকে দৃঢ় করতে পারবেন, তখন আরো একটু কঠিন কোর্সে যেতে পারবেন। বর্তমানে আমি হুয়াওয়েই হেলথ এ্যাপের ‘ফ্যাট বার্নিং রান’ কোর্স করছি। এটার দুটো ভার্সন আছে। একটা ৩৬ মিনিটের ও আরেকটা ৪৬ মিনিটের (নিচে স্ক্রিনশট দেয়া হলো)। তবে এর জন্য হার্ট রেট মাপার প্রয়োজন হয়, ফলে অন্য আরেকটা ডিভাইস লাগে। আমি স্মার্ট ঘড়ি ব্যবহার করি। হার্ট রেট মাপা জরুরী কারণ এই কোর্সে দীর্ঘ মেয়াদে জগিং করা হয়। যাতে শরীরের ওপর বেশি চাপ না পড়ে যায়, তাই হার্ট রেট অনুযায়ী ডিরেকশন দেয়া হয়।

হাঁটা বা দৌড়ানো ছাড়াও যে কোন ব্যায়ামের মাধ্যমেই আপনি ক্যালরি বার্ন করতে পারেন। আমি নিজে এক্সারসাইজ বাইক ব্যবহার করি মাঝে মাঝে। এসব ব্যায়াম আপনি মাইফিটনেসপাল এ্যাপে ম্যানুয়ালি এন্ট্রি দিতে পারবেন। ফলে আপনার ক্যালরির হিসাব রাখা সহজ হবে।

ব্যায়ামের ক্ষেত্রে একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো বিশ্রাম। ওপরে যে ফ্যাট বার্নিং রানের স্ক্রিনশট দিলাম, এরকম একটা ব্যায়ামের পরে শরীরকে কমপক্ষে ২৮/৩০ ঘণ্টার বিশ্রাম দিতে হয়। এই সময়ে আপনি সাধারণ হাঁটাহাঁটি করতে পারেন। শরীরকে প্রয়োজনীয় বিশ্রাম না দিলে পেশী মজবুত না হয়ে উল্টো ক্ষতি হতে পারে।

আরেকটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো ব্যায়ামে ঘাম ও দ্রুত নিশ্বাসের মাধ্যমে আপনার শরীর থেকে প্রচুর পরিমান লবন ও জল বের হয়ে যাবে। ব্যায়াম শেষেই সেটা পূরণ করা প্রয়োজন, বিশেষ করে জলের ঘাটতিটা। সবচেয়ে ভাল হয় ওয়ার্ক আউটের অব্যবহিত আগে এবং পরে ওজন মেপে জলের ঘাটতি মেপে সেটা পূরণ করা।

অনুপ্রেরণাঃ
ওজন কমাবো, এই কথা বললেই আপনি ওজন কমাতে পারবেন না। আপনার ভিতর থেকে এ বিষয়ে একটা প্রেরণা আসতে হবে। এই প্রেরণাই আপনাকে সামনে এগিয়ে নিবে। আমার ক্ষেত্রে যেটা কাজ করেছিল, সেটা বলে এই লেখা শেষ করি।

গত বছরের শেষ দিকে আমাদের কন্যা তনুশ্রীর নামে এখানকার স্বাস্থ্য বিভাগ থেকে একটা চিঠি এলো। তার জন্য ওভারওয়েট ক্লিনিকে একটা এ্যাপয়েন্টমেন্ট ঠিক করা হয়েছে। জানুয়ারিতে ওখানে গেলাম। কিভাবে ওর ওজন কমানো যায়, সে ব্যাপারে ডাক্তার অনেক নির্দেশনা দিলেন। তার মধ্যে একটা হলো, তনুশ্রীকে আরেকটু সক্রিয় হতে হবে। এই লক্ষ্যেই ফেব্রুয়ারিতে ওকে বাস্কেট বল খেলায় অন্তর্ভুক্তির ব্যবস্থা করলাম।

ফেব্রুয়ারিতে এখানে বিকাল চারটার দিকেই রাত নেমে আসে। তাছাড়া প্রথম দিন বলে ওকে বাস্কেট বল খেলায় নিয়ে গেলাম আমি। এরপরে প্রায় দেড় ঘণ্টা বসে থেকে ওকে নিয়ে আসতে হবে। তখন ভাবলাম, আসলে আমাদের ঘরে ওভারওয়েটা তো কেবল আমাদের কন্যাই নয়, আমি নিজেও ওভারওয়েট। সেই দিনই সিদ্ধান্ত নিলাম আমার নিজের ওজন কমাতে হবে। আমার ১৩ বছরের কন্যার কাছে আমিই হব অনুপ্রেরণা।

প্রথম মাসে আমি ওজন কমালাম তিন কেজি এবং আমাদের কন্যার কমলো দুই কেজি। পরে করোনাভাইরাস এসে সব এলোমেলো করে দিয়েছিল। যদিও স্বাস্থ্য বিভাগ থেকে টেলিভিশন/পত্রিকায় বলা হয়েছিল যে এই সময়ে শারীরিক ব্যায়াম, বিশেষ করে কার্ডিওভাসকুলার ব্যায়ামের প্রয়োজন সবচেয়ে বেশি, তারপরও প্রথম দুই মাস ভয়েই বাইরে বের হইনি। তখন আবার দেড় কেজি ওজন বেড়ে গিয়েছিল। তবে মে মাস থেকে আবার শুরু করেছি এবং এ পর্যন্ত মোট আট কেজি ওজন কমাতে পেরেছি।

আমি আশা করছি আপনার কাছেও এরকম কোন প্রেরণা রয়েছে। সবচেয়ে বড় প্রেরণাটা আপনি নিতে পারেন আপনার নিজের কাছ থেকেই। ভেবে দেখুন, আপনি সুস্থভাবে, অন্তত স্থুলতাজনিত রোগের ঝুঁকি কমিয়ে, সন্তানাদি-আত্মীয়স্বজনের সাথে কাটাতে পারবেন। এই প্রেরণাটাই বা কম কিসে?

বিঃদ্রঃ এই পোস্টে ক্যালরি শব্দটি দিয়ে কিলোক্যালরি (Kcal) বুঝানো হয়েছে। সাধারণভাবে আমরা সবাই এটাকে ক্যালরিই বলে থাকি।

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s