পুনর্পাঠঃ ধর্মনিরপেক্ষতার ভবিষ্যৎ – অধ্যাপক আলী আনোয়ার

অধ্যাপক আলী আনোয়ার (১৯৩৫ – ২০১৪)

প্রবন্ধটি সম্পর্কেঃ [১৯৭২ সালের ১৯, ২০ ও ২১ আগস্ট তারিখে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় সাহিত্য সংসদের উদ্যোগে শেরে বাংলা ফজলুল হক হল মিলনায়তনে ধর্মনিরপেক্ষতার উপর তিন দিনব্যাপী এক আলোচনা চক্রের আয়োজন করা হয়। অধ্যাপক আলী আনোয়ার ‘ধর্ম নিরপেক্ষতার ভবিষ্যৎ’ শিরোনামে আলোচ্য প্রবন্ধটি পাঠ করেন। পরবর্তীতে তাঁর সম্পাদনায়  ‘ধর্মনিরপেক্ষতা’ বইয়ে প্রবন্ধটিকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়।]

আমরা আজকে ধর্মনিরপেক্ষতার কথা বলছি ইউরোপে যার নিষ্পত্তি হয়ে গেছে তিনশ বছর আগে। ক্যাথলিক আর লুথেরানদের মধ্যে ১৫৫৫ খৃষ্টাব্দের সন্ধি ধরলে চারশ বছর। ফ্রান্সে হিউজেনট ও ক্যাথলিক জনসমষ্টির মধ্যে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষের পর ধর্মীয় সহনশীলতাকে আইনের মাধ্যমে বাধ্যতামূলক করতে হয় Edict of Nantes-এর ঘোষণায় ১৫৯৮ খৃষ্টাব্দে। বেলজিয়ামে প্রটেষ্টান্ট ও ক্যাথলিকদের মধ্যে সন্ধির ঘোষণাপত্র ১৬০১ সনে। বিলেতে পিউরিট্যানরা গণবিপ্লবের মাধ্যমে ক্ষমতা দখল করে ১৬৪৭ খৃষ্টাব্দে ক্রমওয়েলের শাসনতন্ত্রে নিজেদের প্রতিরক্ষার ব্যবস্থা করে নেয়–যদিও ক্যাথলিকদের রাজনৈতিক ও সামাজিক মর্যাদা প্রকৃতভাবে ফিরে এসেছে দ্বিতীয় চার্লসের ঔদার্যের ঘোষণায় ১৬৭২ খৃষ্টাব্দে, যাকে বলি Declaration of Indulgence। ইউরোপ থেকে ধর্মীয় অসহিষ্ণুতার নির্যাতনজনিত কারণে বিতাড়িত অসংখ্য প্রটেস্টান্ট উপদলীয় জনসমষ্টি যারা আমেরিকাতে চলে গিয়েছিলেন রাষ্ট্রীয় পত্তনের গোড়া থেকেই তারা ধর্মীয় সহনশীলতা ও নিরপেক্ষতাকে সমাজনীতি হিসেবে গ্রহণ করেছিলেন। ইউরোপে ধর্মীয় নির্যাতনের তিক্ত অভিজ্ঞতা তাদেরকে এই সহশীলতায় উদ্বুদ্ধ করেছিল।

ধর্মীয় নিরপেক্ষতার ইতিহাস পর্যালোচনা করা আমার উদ্দেশ্য নয়। আমি যে তথ্যটির প্রতি মনোযোগ আকর্ষণ করতে চাই তা হল এই যে, ধর্মনিরপেক্ষতার একটি ঐতিহাসিক পটভূমি আছে। বিশেষ সামাজিক প্রয়োজনেই ধর্মনিরপেক্ষতার উদ্ভব। কোন ব্যক্তিবিশেষের নাস্তিক্যবাদী প্ররোচনা বা সমাজের গুটিকয় বুদ্ধিজীবীর ধর্মহীনতার প্রলোভন থেকে সেক্যুলরিজমের উদ্ভব হয়নি। বাংলাদেশেও ধৰ্মনিরপেক্ষতা একটি রাজনৈতিক প্রয়োজন থেকেই উদ্ভূত এবং রাষ্ট্রনীতির মূলসূত্র হিসেবে অধিষ্ঠান। সমাজে মুসলমান, খৃষ্টান, হিন্দু, বৌদ্ধ প্রভৃতি নানা ধর্মাবলী লোক থাকতে পারে, একই ধর্মের বিভিন্ন উপদল থাকতে পারে, বিভিন্ন মতাদর্শ থাকতে পারে—এই বিচিত্র জনসমষ্টিকে তাদের গোষ্ঠীপরিচয়কে বিঘ্নিত না করে একটি সাধারণ রাজনৈতিক ও সামাজিক লক্ষ্যে নিয়োজিত করার প্রয়োজন থেকেই ধর্মনিরপেক্ষতার উদ্ভব।

কিন্তু সেক্যুলারিজম শুধু ধর্মনিরপেক্ষতাতেই সীমাবদ্ধ থাকে না। ধর্মীয় আদর্শ ছাড়াও সমাজে নানা মতাদর্শ থাকতে পারে। সকল আদর্শই বিশেষ ধরনের জ্ঞানের ওপর সংস্থিত। তাই ধর্মনিরপেক্ষতা ধর্মীয় সহনশীলতা অতিক্রম করে যায় এবং জ্ঞানের জগতেও এই নিরপেক্ষতা প্রসারিত হয়। জ্ঞানকেও ধর্মীয় অনুশাসন থেকে মুক্তি দিতে হয়। হল্যাণ্ডে হিউ গ্রোটিয়াস যখন ১৬১৪ খৃষ্টাব্দে আইন সংক্রান্ত চিন্তায় আত্মনিয়োগ করেন তখন ধর্মনিরপেক্ষ জ্ঞানের এই আদর্শই তাঁকে উদ্বোধিত করে। এবং সেক্যুলারিজমের ধারণা পরিপূর্ণতা পায়।

সেক্যুলারিজমের লক্ষ্য তা হলে শুধুমাত্র ধর্মীয় নিরপেক্ষতাতেই অর্জিত হয় না, বুদ্ধি ও বিবেকের মুক্তি এবং ব্যক্তির স্বাধীনতা, তথা Non conformist ব্যক্তির মুক্তিকেও দাবী করে। সামাজিক পরিবেশ এই সেক্যুলারিজমের সাফল্যের জন্য যেমন প্রয়োজন তেমনি তার অন্যতম পরিপুরক বিদ্যালয় বা জ্ঞানপীঠগুলিতে খোলা হাওয়া। সামাজিক পরিচালনা (সোস্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং) ও ব্যক্তির চিন্তা পদ্ধতি সেকুরিজমের দুই প্রস্থানভূমি বা পীঠস্থান। ব্যক্তিকে তো তার চিন্তার বা অনুভবের স্বাধীনতা দিয়ে ছেড়ে দেয়া যায়। নিজের শুভাশুভ নির্ধারণ করার ক্ষমতা তার আছে। কিন্তু সমাজের শুভাশুভকে নির্ধারণ করবে কে এবং কি উপায়ে ? এই সোস্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং-এর প্রশ্নেই আমরা নিরপেক্ষতা-কেন্দ্রিক অত্যন্ত স্পর্শকাতর ও দাহ্য বিতর্কে প্রবেশ করছি।  

কোন একটি ধর্মীয় অনুশাসন কি এই দায়িত্ব পালন করতে পারে না? গলদ কি কোন কোন ধর্মের সত্যাসত্যে? কোন একটি ধর্মকে চুড়ান্ত বা মহত্তম সত্য বলে মেনে নিয়ে কি সোস্যাল ইঞ্জনিয়ারিং-এর নির্দেশাবলী পাওয়া যাবে না?

পৃথিবীতে বিভিন্ন ধর্মমত যে অবস্থায় আছে এবং আড়াইশো কোটি জনসমষ্টি যেভাবে বিভিন্ন প্রধান ও অপ্রধান, সংখ্যাগত বিচারে বৃহৎ ও ক্ষুদ্র ধর্মে বিভক্ত হয়ে আছে কখনো তাদেরকে কোন একটি ধর্মমতে ধর্মান্তরিত করা যাবে কিনা সে সমস্ত সমস্যার ব্যবহারিক (Practical) দিক নিয়ে আমি আপনাদের সময় নষ্ট করতে চাই না। আমি তত্ত্বগত সমস্যাবলীর দিকে সাময়িকভাবে আপনাদের মনোযোগ আকর্ষণ করতে চাই।

উপরোক্ত প্রশ্নের জবাব দিতে হলে সমাজে ধর্মের ভূমিকা কি তা দেখতে হয়। আমি যতটুকু বুঝি সমাজে ধর্মের ভূমিকা দ্বিবিধ ; এক, জীবনের অর্থ উম্মোচন করা ; দুই, সামাজিক জীবনের জন্য নির্দেশাবলী চয়ন করা। অর্থ উম্মোচন দ্বারা আমি ব্যক্তিগত সুখ-দুঃখ আনন্দ-বেদনার অভিজ্ঞতাকে শৃঙ্খলাবদ্ধ করা, তাৎপর্য আরোপ করা; সৃষ্টি ও স্রষ্টা, মৃত্যু ও অমরত্ব প্রভৃতি দুর্জ্ঞেয় আবেগসঞ্জাত প্রশ্নের নিষ্পত্তি করা প্রভৃতিকে বোঝাচ্ছি। ধর্মের এই দিকটি ব্যক্তিমানুষ ও তার চেতনাকে কেন্দ্র করে দানা বাঁধে। ধর্মের দ্বিতীয় দিকটি তার সামাজিক ও রাজনৈতিক দিক। ধর্মের নৈতিক নির্দেশাবলী এই দুটি দিকের মধ্যে Mediate করে বা সংযোগের কাজ করে। এক স্তরে জ্ঞান বা অনুভব অন্যস্থরে নৈতিক নির্দেশাবলীতে রূপান্তরিত হয়।

দ্বিতীয় দিকটি নিয়ে প্রথমে আলোচনা করা যাক। পৃথিবীর প্রত্যেকটি ধর্মই কোন না কোন সামাজিক পরিবেশের মধ্যে সৃষ্ট বা প্রাপ্ত হয়! প্রত্যেকটি ধর্মের সামাজিক অনুশাসন বিশ্লেষণ করলে আমরা ঐ ধর্মের উৎপত্তির সামাজিক পরিবেশটিকে সনাক্ত করতে পারি। কোন ধর্মে বহুবিবাহের প্রশ্রয় যেমন সমাজে বহুবিবাহের প্রথা চালু থাকলেই হতে পারে। সুদ গ্রহণ করা বা না করা সংক্রান্ত অনুশাসন সমাজে সুদ গ্রহণ করার সুফল বা কুফল জনিত অভিজ্ঞতা থেকেই আসতে পারে। তাই Tribal, Feudal, বা Nomadic পরিবেশে যে সমস্ত ধর্মের উদয় হয়েছে তাদের মধ্যে বিভিন্নতা ঐ সমস্ত ধর্মের সামাজিক অনুশাসনের মধ্যেই প্রতিফলিত হয়েছে। কিন্তু সমাজ এক জায়গায় দাড়িয়ে নেই; সামাজিক কাঠামো বদলে গিয়েছে। পুরনো সমস্যা হয়ত নেই, নতুন সমস্যা এসেছে তার জায়গায়। আবার কোন কোন ক্ষেত্রে নতুন সমস্যা তো হয়েছেই, আবার পুরনো সমস্যাও থেকে গেছে। কাজেই পুরনো সামাজিক অনুশাসনগুলি কালচিহ্নিত ও অচল হয়ে পড়তে পারে। চোর চুরি করলেই হাত কেটে দেই না আমরা। পর্দাশাসিত মুসলিম সমাজের আধুনিক যুব সম্প্রদায় রোমান্টিক প্রেমের জন্য কি উন্মুখ নন? যদিও ছবি তোলা নিষেধ কিন্তু গোপনে রক্ষিত তার প্রিয়তমার ছবিটি Star Studio তে তোলা। ধর্মীয় অনুমতি মোতাবেক Polygamy তে বিশ্বাস করেন শুনলে কিন্তু প্রিয়তমার সঙ্গে সম্পর্কচ্যুতি ঘটতে পারে। এটা ধরেই নেয়া যায়। আবার অনেক অনুশাসন অর্থনৈতিক বা সামাজিক কারণে কার্যকর হয় না –সামাজিক প্রবণতা বা প্রয়োজনের অসম্পূর্ণ জ্ঞানের জন্য।

সুদ গ্রহণ সংক্রান্ত অনুশাসন ধরা যাক । ইসলাম ও খৃষ্টান দুই ধর্মেই সুদ গ্রহণকে নিষিদ্ধ করা হয়েছিল—কুসীদজীবীদের উৎপীড়ন থেকে দরিদ্র জনসাধারণকে রক্ষা করার জন্য এমনকি খৃষ্টধর্ম প্রচারের প্রায় সাড়ে তিনশ বছর আগে অর্থাৎ ইসলাম প্রচারেরও এক হাজার বছর আগে গ্রীক আইন Lex Genucia তে সুদ গ্রহণকে নিষিদ্ধ করা হয়েছিল। এরিস্টটল সুদ গ্রহণকে অন্যায় এবং প্রাকৃতিক আইনের (Natural Law) বিরোধী বলে যুক্তি স্থাপন করেছিলেন। কিন্তু সুদ গ্রহণ বন্ধ করা যায়নি। পাঠানরা তাদের ধর্মপ্রাণতার জন্য প্রসিদ্ধ; কিন্তু মুসলিম ধর্মপ্রাণ পাঠানরাই এই মহাদেশে কুসীদজীবী হিসেবেও বিখ্যাত–তাদের বৃত্তি তাদের ধর্মবিশ্বাসে বিরোধ সৃষ্টি করেনি। সমস্ত মধ্যযুগ ধরে চার্চের পূলপিট বা মেহরাব থেকে সুদ গ্রহণের বিরুদ্ধে প্রচার করা হয়েছে। ফলে সুদের ব্যবসায় ইউরোপে খৃষ্টানদের হাত থেকে ইহুদিদের হাতে চলে গিয়েছিল। যদিচ মোজইক কোডে (হজরত মুসার আইনে) ইহুদিদেরকেও সুদ নিতে নিষেধ করা হয়েছিল ( Levit cus XXV. 36 ও Deuteronomy XXIV. 20.), অথচ যুদ্ধ বিগ্রহ বা অন্যান্য প্রয়োজনে যখন চার্চ বা রাজন্যবর্গের টাকা ধার নেয়ার প্রয়োজন হল তখনকার Poena Conventionalis, Damoum Emergens, Lucrum Cessans, Montes Pietatis প্রভৃতি আইনের রন্ধ্র পথে সুদকে পরোক্ষ প্রশ্রয় দিতে হয়েছে। পুঁজিবাদী  বিকাশের প্রয়োজনে যখন প্রচণ্ড পরিমাণ লগ্নির প্রয়োজন হল তখন বেন্থামের মতো দার্শনিককে ১৭৮৭ সনে লিখতে হল Defence of Usury। ১৮৫৪ সনে বিলেতে সুদ গ্রহণের ওপর আইনগত নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার করা হল। হল্যাণ্ড, বেলজিয়াম, প্রুশিয়া প্রভৃতি দেশেও নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহৃত হল দুদশ বৎসরের মধ্যেই। ধর্মীয় অনুশাসন আবদ্ধ হয়ে রইল শাস্ত্রের পাতার মধ্যে। ‘If your brother becomes poor, you are responsible to help him… don’t charge him interest on the money you lend him.’ ইত্যাদি।

অনেক ধর্মীয় অনুশাসন আশ্চর্যজনকভাবে আধুনিক বা সাম্প্রতিক মনে হয়। মনে হয় হয়ত সেই সমস্ত অনুশাসন থেকে ভবিষ্যতের নির্দেশ পাওয়া যাবে। যথা যিশুখৃষ্ট বলেছেন, ‘The poor shall inherit the earth’। যিশুখৃষ্টের বাণী তৎকালীন দরিদ্র ও নিপীড়িত জনগণের মধ্যে আশার বাণী এনেছিল। তারা দলে দলে খৃষ্টান ধর্ম গ্রহণ করেছিল অর্থনৈতিক মুক্তির স্বপ্নে। মনে পড়ে বৌদ্ধ ধর্মেও হিন্দু বর্ণ প্রথার অত্যাচারের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ঘোষণা করা হয়েছিল এবং সামাজিক ও অর্থনৈতিকভাবে ক্লিষ্ট জনসাধারণকে সমতার আশ্বাস দেয়া হয়েছিল। অথচ হিন্দু ধর্মেও ত দরিদ্রকে নারায়ণ বা ভগবানতুল্য মনে করে সেবার নির্দেশ দেয়া হয়েছিল। আজকাল অনেকেই ইসলামিক সমাজতন্ত্রের কথা বলছেন এবং ইসলামিক সমাজতন্ত্রই একমাত্র খাটি সমাজতন্ত্র এরকমও আমরা শুনতে পাচ্ছি। মওদুদি যদিও দুবছর আগে –অর্থাৎ নির্বাচনের আগে, বলেছিলেন ইসলাম ও স্যোসালিজমে কোন মিল নেই বরং বিরোধ আছে। খৃষ্টানধর্মের সমাজতান্ত্রিক প্রবণতাকে প্রাধান্য দিয়ে আলবিগেনসিস, লোলার্ড, লেভেলার, কাথারী, এ্যানাব্যাপটিস্ট প্রভৃতি বিভিন্ন সম্প্রদায় সামাজিক স্বপ্ন দেখে গেছে এবং সামাজিক আন্দোলন করে গেছে। জার্মানীর মুলহাউসেন ও মুনস্টারে ১৫২৫ ও ১৫৩৫ খৃষ্টাব্দে এ্যানাব্যাপটিস্টরা বামপন্থী কমুনিষ্ট স্টাইলে গণঅভ্যুত্থানের নেতৃত্ব দিয়েছে। ১৬৪৯ খৃষ্টাব্দে বিলেতে ডিগাররা (Diggers: চাষ করে যারা) উইন স্টানলীর নেতৃত্বে সারে অঞ্চলে জমি দখল করে নিয়ে সমাজতান্ত্রিক জনপদের পত্তন করেছিলেন। প্যারাগুয়েতে যেস্যুইট সম্প্রদায়ের খৃষ্টানরা ১৬০২ থেকে ১৭৬৭ পর্যন্ত দীর্ঘ দেড়শ বৎসরাধিক কাল সমাজতান্ত্রিক পদ্ধতিতে তাদের জনপদ চালানোর চেষ্টা করেছে। খৃষ্টীয় সাম্যবাদের স্বপ্নে উদ্বুদ্ধ ইংরেজ কবি উইলিয়াম ব্লেক লণ্ডনের রাস্তায় অষ্টাদশ শতকের শেষে শ্রমিক মিছিলের নেতৃত্ব দিয়েছেন, বাস্টিল অবরোধের স্টাইলে আক্রমণ করেছেন নিউগেট কারাগার। বাস্টিল অবরোধে এরই পুনরাবৃত্তি দেখি ন বছর পরে। ইত্যাকার অজস্র উদাহরণ দেয়া যায়। সাম্প্রতিক কালে ইসরায়েলে ইহুদিদের ‘কিব্যুতজ’ চৈনিক কম্যুনের ইহুদী রূপান্তর মাত্র। অথচ ইহুদী রাবাই, রোমান ক্যাথলিক পোপ বা ক্যান্টারবেরীর আর্চবিশপ প্রত্যেকেই মওদুদীর মত বলবেন না-কি যে তাদের ধর্মের সঙ্গে সোস্যালিজমের বিরোধ অত্যন্ত মৌলিক ? শুধু বিভিন্ন ধর্মের মধ্যেই নয় একই ধর্মের বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মধ্যে সামাজিক নির্দেশ ও লক্ষ্য নিয়ে নানা বিরোধী সিদ্ধান্তের মুখোমুখি হয়ে পড়ি আমরা। নির্দেশ গ্রহণ করবো তা হলে কার হাত থেকে? এবং কোন নির্দেশ ? বস্তুতপক্ষে এ সমস্ত নির্দেশ তাই এখন আমরা গ্রহণ করি অর্থনীতি শাস্ত্র থেকে বা সমাজতত্ত্ব থেকে বা রাজনীতিতত্ত্ব থেকে এবং সেটা সামাজিক প্রয়োজনের তাগিদে। সমাজতন্ত্রকে যখন রাষ্ট্রীয় লক্ষ্য বলে চিহ্নিত করি তখন ধর্মীয় বিতর্কের মধ্যে পথ না হারিয়ে ফেলার জন্য ধর্মনিরপেক্ষ- তাকেই গ্রহণ করতে হয়। রাষ্ট্র কারোরই ধর্মবিশ্বাসে আঘাত হানতে চায় না।

ধর্ম থেকে কি তবে সামাজিক অনুশাসনটুকু বাদ দিয়ে নেয়া যায় না? সত্যিই কি যায়? কে বাদ দেবে–আপনি, আমি না মৌলানা বা পুরোহিতরা? আপনি বাদ দিতে চাইলেই কি সেটা আমি মেনে নিতে বাধ্য ? আসলে ধর্মের সামাজিক অনুশাসনের দিকটা তার জ্ঞানের দিক বা পরমার্থের দিক বা ব্যক্তিচৈতন্যের দিক থেকে বোধহয় আলাদা করা যায় না। দুটো পরস্পর নির্ভরশীল। ধর্মের অর্ধেক অনুশাসন পালন করে আমি দাবী করতে পারি কি আমি সৎ বা সাচ্চা মুসলমান বা খৃষ্টান ? অথচ এটাও ত সত্য যে কোন ধর্মের অর্ধেকটা ভুল হলে পুরোটা সত্য হতে পারে না। এইভাবে সত্য এবং সম্প্রদায়ের মধ্যে বিরোধ দেখা দেয়।

সামূহিক মতবাদের (Total ideology) এটাই হচ্ছে বিপদ-Package deal এর মত। প্রায় সমস্ত ধর্মই এই Total ideology; মার্কসবাদ এ জাতীয় একটি Total ideology। এর অংশ বিশেষের ভুল তাই এত বিপজ্জনক কারণ অংশ বিশেষের ভুল সমগ্র সমাজে সঞ্চারিত হয়ে দূরপ্রসারী অবাঞ্ছিত অবস্থার জন্ম দিতে পারে। অথচ অংশ বিশেষকে ছাঁটাই করে সমগ্রের আবেদনও টিকিয়ে রাখা যায় না।

আবার শুধু ব্যক্তিগত পরমার্থের কথাই ভাবুন। এত সহস্র ধর্মের মধ্যে কোন জাতীয় আত্মিক মুক্তি (Salvation) বা উৎকর্ষে বা বোধিতে আপনাকে আহ্বান করব? আমাদের সমাজের প্রত্যন্ত  প্রদেশে অবহেলিত প্রায় অজ্ঞাত উপজাতীয় আদিবাসীরা আছেন। তাঁরা একেবারে ধর্ম বিরহিত নন, তাঁদের নিজস্ব ধর্ম আছে—পূজা আচ্চা, পালপার্বণ আছে। খৃষ্টান পাদরীরা তাদের ধর্মান্তরিত করে ফেলছে এরকম খবর নিয়ে মাঝে মাঝে খবরের কাগজে উত্তেজনার সঞ্চার হয়। খৃষ্টান ধর্ম কি আত্যন্তিক ভাবে তাদের নিজস্ব ধর্মের চেয়ে শ্রেষ্ঠ ? কে এই শ্রেষ্ঠতা নিরূপণ করল, কি দিয়ে শ্রেষ্ঠতা নিরূপিত হয়? তবে কি তাদেরকে ইসলাম ধর্মে দীক্ষিত করা যেত না? অথবা বৌদ্ধ ধর্মে? আম্বেদকরের সহস্রাধিক হরিজন শিষ্য ভারতে হিন্দু ধর্ম পরিত্যাগ করে বৌদ্ধ ধর্মে দীক্ষা নিয়েছেন বছর বিশেক আগে। সত্যতা বা উৎকর্ষ কি এই জাতীয় ধর্মান্তরকরণের প্রেরণা? কিন্তু তার চেয়ে বিব্রতকর প্রশ্ন হল কোন বৌদ্ধধর্মে এদের ধর্মান্তর হল—হীনযান অথবা মহাযানে, কোন তস্য উপদলে। একমাত্র ইন্দোনেশিয়াতেই আটত্রিশটি বৌদ্ধ উপদল বা সেক্ট আছে। খৃষ্টান ধর্মের কোন উপ-সম্প্রদায়ের পরমার্থের আকর্ষণ এদের সামনে দেয়া হবে? রোমান ক্যাথলিক, প্রটেষ্টান্ট, ক্যালভিনিস্ট, গ্রীক অর্থডক্স, প্রেসবিটে, রীয়ান, সেভেন্থ ডে এ্যাডভেন্টিস্ট, মোরমন, কোয়েকার ইত্যাকার আরো কয়েকশ উপসম্প্রদায়ের মধ্য থেকে কোন সম্প্রদায়ের আত্মিক মুক্তির আদর্শ এদের সামনে তুলে ধরবেন ? ইসলামেও ত দল উপদলের শেষ নেই। শিয়া ও সুন্নি দুটি সম্প্রদায় চিরকালই মারামারি করে এসেছে পরস্পরের সঙ্গে। সুন্নিদের মধ্যে চারটে মজহব-হানাফি, শাফি, মালিকী ও হাম্বলী। শুধু আত্মিক মুক্তির পথ নির্দেশেই নয় সামাজিক অনুশাসনেও এরা ভিন্ন পথের দিশারী। সুন্নিদের মধ্যে এই চারটে ভাগের বাইরে রইলেন আহলে উবরাই উয়াল কিয়াস, গায়ের মুকাল্লিদ আহলে হাদিস, ও ওহাবীরা। শিয়া সম্প্রদায়ের মধ্যে আছেন জাইদীয়, কাইসিনীয়, ইসনা আশারীয় এবং ইসমাইলীয়রা। ইসনা অশিারীয়দের মধ্যে উসুলী সম্প্রদায় যুক্তিতে বিশ্বাসী এবং Transcendentalist। আকবরীরা পুরোহিত ও পীর শ্রেণীর মধ্যস্থতায়ই একমাত্র মুক্তি সম্ভব বলে মনে করেন। ইসমাইলীয়দের মধ্যে আছেন এরিস্টটলপন্থী আবদুল্লাহ বিন মাইমুনের অনুসারীবৃন্দ, হামাদান সম্প্রদায় যারা জন্মান্তরে বিশ্বাস করেন, হাসিমিন সম্প্রদায় এবং কারমেথীয়ানরা। এ ছাড়াও আছেন কাদেরীয়রা, বাতেন সম্প্রদায়, মুতাজিলীয় এবং শিয়া দলভুক্ত জায়েদ বিন জয়নালের মত মুক্তবুদ্ধির অনুসারীরা। আরো আছেন ক্যালভিনিস্টদের সঙ্গে তুলনীয় জার পন্থী সম্প্রদায়ের জফম বিন সাফওয়ানের অনুসারীরা। এ ছাড়া সুফী সম্প্রদায়ত আছেনই যাদের প্রত্যেকেই এক একটি সম্প্রদায় এবং যাদেরকে আল মাতরাদি, আল তাহাউই, আল বাকিল্লানী ও আল গাজ্জালী প্রভৃতি গোড়া সনাতনপন্থীরা সব সময়েই সন্দেহ এবং সতর্কতার চোখে দেখেছেন। এ সমস্ত সম্প্রদায় কি সব সময় শান্তিপূর্ণ সহ অবস্থান করেছেন? ইসলামের ইতিহাস এর উল্টো কথাই বলে। মুক্তির পথ বেছে নেয়ার উপায় কি? এমন কি ব্যক্তিগত মুক্তির ?

ধর্মীয় পরিমণ্ডলে কি মুক্তবুদ্ধির চর্চা হয় না? সমস্ত ধর্মেই ঐতিহ্য, যুক্তিবিদ্যা, বিবেক, প্রথা, লোকন্যায় প্রভৃতি নিয়ে আলোচনা হয়েছে। ইসলামেও ইসতিহ সান (opinion, জনমত) ইসতিসলাই (public expediency), ইজতিহাদ (Legal Conclusion),  ইজমা (Consensus), আকল (যুক্তি বা মুক্তবুদ্ধি ), নজল (Revelation) প্রভৃতি নিয়ে তর্ক হয়েছে। মুক্তবুদ্ধির অনুসারী মুতাজিলীয়রা নিজেদেরকে ‘আহলুত তওয়াহীদ ওয়াল আদল,’ অর্থাৎ ‘ঐক্য এবং ন্যায়ের অনুসারী’ বলে ঘোষণা করেছিলেন। বাতেনীয়রা কোরানকে রূপক হিসেবে ব্যাখ্যা করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু সবধর্মেই শেষে গোড়া সনাতনপন্থী একজন গাজ্জালী বা টমাস একোয়াইনাস বা শঙ্করাচার্যের আবির্ভাব হয়। এবং আমরা শুরুতে ফিরে আসি। ওয়াহাবী –আজারি কাদের হাজ্জাজ বিন ইউসুফ দেশছাড়া করেন, মনসুর হাল্লাজ বা জায়েদ বিন জয়নাল ধর্মদ্রোহী বলে আখ্যাত হন, মুতাজিলাদের সমস্ত গ্রন্থ পুড়িয়ে ফেলা হয় এবং তাদের শূলে দেয়া হয়। ইবনে সিনা কারারুদ্ধ হন ও পরে দেশ ত্যাগ করে তাকে প্রাণ রক্ষা করতে হয়। ইবনে রুশদ প্রবীণ বয়সে চাকরী ছেড়ে ছুড়ে প্রাণ রক্ষা করেন। ইসমাইলীয়রা ভারতে আশ্রয় গ্রহণ করেন। আলামূত থেকে পালিয়ে আধুনিক আহলে হাদিস আন্দোলনের একজন প্রধান প্রবক্তা পণ্ডিত মীর আবদুল্লাহ গজনভী তাঁর মাতৃভূমি আফগানিস্থান থেকে বিতাড়িত হয়ে “ধর্মনিরপেক্ষ’ বৃটিশ ভারতে আশ্রয় পান। এ দিকে ভারতীয় মুসলমান আলেমরা পর্যায়ক্রমে স্যার সৈয়দ আহমদকে তার যুক্তি প্রবণ ইসলাম ব্যাখ্যার জন্য ‘নেচার’ বা প্রকৃতিবাদী, ধর্মীয় পুনর্গঠনের প্রবক্তা ইকবাল, সাম্যবাদী নজরুল, যুক্তিবাদী আবুল হাসেম প্রভৃতি প্রতিভাবানকে ধর্মদ্রোহী কাফের আখ্যা দিয়ে চলেন। ধর্মীয় আলোচনা সনাতনত্বে প্রত্যাবর্তন করে। সব ধর্মসংস্কার আন্দোলন সম্বন্ধেই একথা বলা চলে। ১৮৬২ সনে পোপ ষোড়শ গ্রেগরী ঘোষণা করেন বিবেকের স্বাধীনতা দেওয়ার মানে হল ভ্রান্তিতে নিপতিত হওয়ার স্বাধীনতা দেয়া। সামাজিক পরিবেশ আবার অত্যন্ত বেখাপ্পা হয়ে উঠলে ধর্মের মধ্যে পরিবর্তন ও পরিমার্জনার দাবী এখানে সেখানে উচ্চারিত হতে থাকে। ধর্মের দোলক রক্ষণশীল বিন্দু থেকে নতুন ব্যাখ্যার দিকে দোল খেতে থাকে। কিন্তু দোলক আবার ফিরেও আসে। আরো কিছু সম্প্রদায় সৃষ্টি হয়। নতুন ধর্মও কিছু চালু হয়: আহলল হক বা বাহাই ধর্ম যেমন। মত পার্থক্য তখন মত সংঘর্ষের রূপ নেয়;– কখনো কখনো প্রভুত রক্তপাত ঘটে। প্যারিসে ‘St. Bartholomew’s massacre’-এর মত। উনিশশ আটচল্লিশ সনে লাহোরে মওদুদী সমর্থকদের হাতে তিন হাজার কাদিয়ানী নিহত হন। বিচারে মওদুদীর প্রাণদণ্ড হয়। শেষকালে গভর্ণর জেনারেল তার প্রাণ ভিক্ষা দেন। আধুনিক মিশরে মুসলিম ধর্ম চিন্তার অগ্রনায়ক তাহা হোসেন ধর্মবিরোধী বলে আখ্যাত হন। করাচীর ইসলামিক একাডেমীর ডিরেক্টর ফজলুর রহমান ক্রুদ্ধ সনাতনপন্থীদের দ্বারা প্রহৃত হন এবং চাকরী ছেড়ে, দেশত্যাগ করেন। তার গ্রন্থ নিষিদ্ধ ঘোষিত হয়। এটা ধর্ম নির্বিশেষে সত্য। মধ্যযুগের ইউরোপেই শুধু ধর্মীয় কারণে হাজার হাজার লোক মরেনি, আজো মরছে।

ধর্মীয় পুনর্গঠনের প্রশ্নটি সেই জন্যেই অত্যন্ত বিপদজনক হয়ে পড়ে। কারণ ধর্ম মাত্রেই সামূহিক structure of meaning। শুভবুদ্ধি প্রণোদিত পুনর্গঠনের নামে সেই কাঠামোকে ঢেলে সাজাতে গেলে ধর্মপ্রাণ লোক মাত্রেই ঐ সনাতন বিশ্বাস আশ্রিত নিরাপত্তা থেকে বিচ্যুত হবার সম্ভাবনায় আতঙ্কিত হয়ে পড়ে। ধর্মনিরপেক্ষতাকেও একই কারণে সে সন্দেহের চোখে দেখতে থাকে।

কিংকর্তব্য! ধর্মকে তাহলে তার আপন মনে থাকতে দিয়ে পাশ কাটিয়ে যাওয়া ছাড়া উপায় কি? সামাজিক সংহতি, গোষ্ঠিচেতনা ও আত্মপরিচয়ের যে দায়িত্ব আবহমান কাল ধরে ধর্ম পালন করেছে তা এখন ক্রমান্বয়ে রাজনৈতিক দল, সাংস্কৃতিক আচার অনুষ্ঠান, ফুটবল ক্লাব, গ্রাম সংস্থা, যুব পরিষদ, ছাত্র সংগঠন, মহিলা প্রতিষ্ঠান, নগর কর্পোরেশন আন্তর্জাতিক মৈত্রী সংঘ প্রভৃতি নিজেদের মধ্যে ভাগ করে নিয়েছে।

ধর্মও এখন এই সমস্ত প্রতিষ্ঠানের মতই আরো একটি প্রতিষ্ঠান মাত্র, তবে অনেক বেশী বড় এবং অত্যন্ত প্রাচীন। কিন্তু নবীন প্রতিষ্ঠান সমূহের প্রতিও আমাদের অনুরাগ কম নয় এবং ঐ সমস্ত রাজনৈতিক দল বা সাংস্কৃতিক রীতিনীতিতে আমাদের আবেগ কম গ্রথিত নয়। আমাদের আত্মপরিচয়ে এখন এরাও উৎসাহী অংশ নিচ্ছে। এই বিবর্তন ইউরোপে তিনশ বছর ধরে ঘটেছে, আমাদের এখানে ঘটছে হয়তো পঞ্চাশ বছর কি একশ বছর ধরে।

ধর্ম তার সামূহিক চরিত্র ছাড়েনি। কিন্তু কার্যত তার সামাজিক দিক এবং আত্মিক দিকের মধ্যে ব্যবধান ক্রমেই বাড়ছে। ইউরোপের চার্চ এবং রাষ্ট্রের পৃথকীকরণের মধ্য দিয়ে এটা সূচিত হয়েছিল। বিভিন্ন বিভাগে জ্ঞানের প্রসার বাকীটা সম্পাদন করেছে। অর্থনীতি বা রাজনৈতিক ক্ষেত্রের কর্মকাণ্ড এখন আর ধর্মীয় অনুশাসনের মানদণ্ডে বিচার করা হয় না, তার নিজেরই নানা আইনকানুন ও তত্ত্বের ভিত্তিতে তার মূল্যায়ন হয়। সোস্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং এর উদ্দেশ্যে সমাজতত্ত্ব, মনস্তত্ত্ব, পরিবেশ বিজ্ঞান (Ecology), নগর বিজ্ঞান, স্থাপত্য, অর্থনীতি, রাজনীতি শাস্ত্রের তত্ত্বাবলীকে উৎকৃষ্ট থেকে উৎকৃষ্টতর করা হচ্ছে। সবচেয়ে বড় কথা এ সমস্তের মধ্যে সামূহিকতার ভয় নেই। অংশের মধ্যে গলদ দেখা দিলে তত্ত্ব ও প্রয়োগ দুয়েকেই পাল্টে নেয়ার সুযোগ আছে সমূহকে ধ্বংস না করেও। এ সমস্ত নব্য প্রয়োগের কোন কোন দিক হয়ত ক্রাইস্ট বা কনফুসিয়াস, বেদ বা বুদ্ধে আগেই সংকেতিত হয়েছিল। কিন্তু পার্থক্য এইখানে যে সমস্ত তত্ত্ব কোন ঐশী সমর্থন পুষ্টতার জন্য গৃহীত হয়নি। সামাজিক উপযোগিতা ও কর্মদক্ষতার ভিত্তিতেই এ সমস্ত তত্ত্বের প্রয়োগ চলেছে। যত বড় ধুরন্ধর প্রতিভাই হন না কেন মার্কস বা ম্যাকলুহান, লাস্কি বা লুকাচ, পিঁয়াজে বা পেরেটো এই সামাজিক প্রয়োগমানতা ও সাফল্যের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হতে হবে।

কিন্তু ধর্ম সম্বন্ধে যারা আবেগপ্রবণ তারা প্রশ্ন তোলেন, কিন্তু এমন কি পাশ্চাত্যেও জ্ঞানের এই ধর্মনিরপেক্ষ প্রয়োগেই কি লোকের তৃপ্তি হচ্ছে? সামাজিক বা রাজনৈতিক বা সাংস্কৃতিক পরিচয়টুকুই অনেকের জন্য অস্তিত্বের সমস্ত তাৎপর্য বহন করে না। ধর্মের ক্ষুধা কি সব সময়েই নেই ?

এই ক্ষুধা দ্বারা যদি আবেগগত প্রয়োজনের কথা বা আবেগগত আশ্রয়ের কথা বোঝানো হয়ে থাকে তবে বলব যে, হ্যাঁ আছে! কিন্তু এটা বোঝা দরকার। এই আবেগগত আশ্রয়ের সন্ধান আসলে অর্থের ক্ষুধা, মানুষের সর্বগ্রাসী Hunger for meaning। পণ্ডিত প্রবর ফ্রাঙ্কেলের মতে জৈবিক ক্ষুধার মত অর্থের ক্ষুধাও মানুষকে তাড়িত করে নিয়ে চলে। সমস্ত বিশ্বচরাচরকে একটি সামগ্রিক অর্থের শৃঙ্খলে বেঁধে ফেলার আকাঙ্ক্ষাই সমস্ত ধর্মের মধ্যে প্রতিফলিত হয়েছে। ধর্ম দীর্ঘকাল ধরে মানুষের এই অর্থের ক্ষুধা বা আবেগ নিবৃত্ত করে এসেছে। ধর্মের ইতিহাসে যে এত বিবর্তন, এত বিভিন্ন ধর্মের উদ্ভব বা একই ধর্মের মধ্যে ক্রমান্বয়ে এত উপদলের সৃষ্টি তারও পেছনে এই অর্থের ক্ষুধা সক্রিয়। পরিবর্তিত সামাজিক অবস্থা বা জ্ঞানের জগতে পরিবর্তনের কারণে যখন প্রাচীন কোন তত্ত্ববিশ্বাস লোককে আর তৃপ্ত করতে পারে না, যখন ঐ ধর্ম বা কোন বিশেষ ধর্মীয় তত্ত্ব আর পরিবর্তিত পরিস্থিতির সঙ্গে মেলে না তখনই নতুন ধর্ম পত্তনের প্রয়োজন দেখা দেয় এবং একজন ধর্ম প্রবর্তক আবির্ভূত হন। নতুন অর্থের বিন্যাসে বিশ্বচরাচরের ব্যাখ্যা রচিত হয়; মানুষ আশ্বস্ত হয়। নতুন ধর্ম বা উপধর্ম মানুষের আবেগের আনুগত্য লাভ করে। প্লেটো প্রোটাগোরাস থেকে মানুষের সমস্ত দর্শন চিন্তা, সাহিত্য বা বিজ্ঞানে অভিনিবেশও একই hunger for meaning দ্বারা প্ররোচিত। একই অন্বেষার বিভিন্নমুখী প্রবাহ। তবে জ্ঞানের এই বিচিত্র অন্বেষা ও প্রয়োগ সকল মানুষের আবেগকে তৃপ্ত করে না। ধর্ম যে সামাজিক অর্থ বিন্যাসের কারণে ব্যাপক আবেগগত আশ্রয়ের আশ্বাস রচনা করে; বিভিন্ন বিষয়ে খণ্ডিত বিশেষজ্ঞের জ্ঞান সে অর্থে সাধারণ লোকের অনায়ত্তই থাকে এবং তাদের মনে কোন বিকল্প আশ্রয়ের নিরাপত্তা আনে না। ফলে আশ্রয় চ্যুত হওয়ার ভয় এমনকি বিশেষজ্ঞকেও বিচলিত করে। আগেই বলেছি আমাদের দেশে ধর্মীয় নিরাশ্রয়তার সম্ভাবনা কি ভাবে আমাদেরকে ধর্মনিরপেক্ষতা সম্বন্ধে আতঙ্কিত করে তোলে। অথচ আমাদের দেশেও জ্ঞানের জগতে আজ বাস্তব অবস্থাটা এই রকম। আমরা কি প্রাচ্যে কি পাশ্চাত্তে ধর্মনিরপেক্ষ জ্ঞানের অস্তিত্ব স্বীকার করে নিয়েছি। অর্থনীতি, দর্শন, পদার্থবিদ্যা, প্রাণীবিদ্যা, প্রভৃতি নানা পর্যায়ের জ্ঞান আমাদের চেতনায় ধর্ম বিশ্বাসের সঙ্গে সহাবস্থান করে। কিন্তু অধিকাংশ ক্ষেত্রে কোন বৃহৎ ঐক্যের আদলে তা সমগ্রতা পায় না। ধর্মবিশ্বাসও এই সমস্ত sophisticated জ্ঞানের মধ্যে কোন ঐক্য আনতে পারে না। তাই অধুনাতম পদার্থতত্বের সঙ্গে হয়ত ভৌতিক বিশ্বাস পাশাপাশি ঠাসাঠাসি করে থাকে, যুক্তি পারস্পৃর্যে তা গ্রথিত হয় না। নানা বিরোধী অনুভব, বিশ্বাস ও যুক্তিগত সিদ্ধান্তের এক অস্বস্তিকর অবস্থা। টি, এস. এলিয়ট থেকে ভাষা ধার করে বলা যায়-dissociated sensibility-র একটা জীবনময় বোঝা। এই অবস্থায় ধর্মবিশ্বাসকে রক্ষা করতে গিয়ে এই অস্বস্তিকর তা আমাদের স্নায়ুকে ক্লান্ত করে তোলে অথচ সমস্তটুকুকে গেলে যুক্তি দিয়ে সাজানোর মত মানসিক শক্তি বা ক্ষমতা বা সততা আমাদের মত সাধারণ লোকের থাকে না। এ অবস্থায় বিশ্বাসটুকু ভেঙে পড়লে নিরাশ্রয় স্বাধীনতার মুখে দুর্বল মানুষ অসহায় বোধ করে। মনস্তাত্ত্বিক ও সমাজবিজ্ঞানী এরিক ফ্রম একেই বলেছেন Fear of freedom। এই ‘মুক্তির ভয়’ থেকে পরিত্রাণ পাবার জন্য সে আকুল ভাবে যে কোন বিশ্বাসের মধ্যে সহজ পলায়নের পথ খোজে। বিশ্বাস সহজ, যুক্তি কঠিন; অথচ বিশ্বাসও আর স্বস্তি বা পূর্ণতা পায় না। খণ্ডিত চেতনার গ্লানি স্পর্শকাতর অহমিকার আড়ালে লুকোবার চেষ্টা করে অথবা সাম্প্রদায়িক চণ্ডনীতির মধ্য দিয়ে আত্মপ্রসাদ লাভের চেষ্টা করে। ধর্মনিরপেক্ষতা জ্ঞানের জগতেও সামূহিক প্রবণতাকে উৎসাহিত করে না। ধর্মনিরপেক্ষতা ব্যক্তিকে নিজের পায়ে দাড়াতে বাধ্য করে। ধর্মীয় অন্বেষা বলতে যদি আমরা আত্মপরিচয় বা সমগ্র অর্থ বা তাৎপর্যের অন্বেষণ বুঝি তা হলে ধর্মনিরপেক্ষতাই ধর্মীয় অন্বেষার প্রকৃত পরিবেশ সৃষ্টি করে। এই অর্থের অন্বেষণ পাশ্চাত্য সমাজে সার্ত্র বা শেশটভ, কিয়েরকেগার্ড বা কার্ল বার্থ, উনামুনো বা গাসেতের জন্ম দিয়েছে। কিন্তু তাদের বক্তব্য আমাদের চিন্তাকে ও অনুভবকেও প্রবলভাবে নাড়া না দিয়ে পারে না। রবীন্দ্রনাথের মরমীয়াবাদ, বা ইয়েটসের সংশ্লেষিত mythology, বা  সাঁ জন পার্সের মিস্টিক ইতিহাসবোধ বা ফ্রস্টের প্রকৃতি মগ্ন তার মধ্যেও অনেক ক্লান্ত প্রাণ আবেগের আশ্রয় পেয়েছেন। এ সবই ধর্মবোধের পরিপূরক হতে পারে ।

কিন্তু কেউ কেউ এই অনুসন্ধানকে সর্বতোবিরোধিতা করেন। কারণ সনাতন ধর্ম যা এতকাল সামূহিক বা সমগ্রতার অর্থকে বহন করে এসেছে সেই সনাতন ধর্মের একচ্ছত্র অধিনায়কত্বে এর ভাষ্য করার নামে ধর্মকে আশ্রয় করে নানা সুবিধা ভোগ করে এসেছেন। সব রকমের একাধিপত্যই দোষদুষ্ট হয়, বিশ্বাসের একাধিপত্য (Monopoly of faith) সবচেয়ে মারাত্মক। ধর্মনিরপেক্ষতা বা ধর্মীয় সম্প্রদায় নিরপেক্ষতা এই অর্থ বা ভাষা করার একাধিপত্যের বিরুদ্ধে একমাত্র রক্ষাকবচ তথা একাধিপত্যজনিত কদর্থে বা দুষ্টভাষ্যের বিরুদ্ধে রক্ষাকবচ; যেমন গণতন্ত্র রাজনৈতিক একাধিপত্যের বিরুদ্ধে রক্ষা কবচ। তাই ধর্মনিরপেক্ষতার বিরোধিতা গণতন্ত্র বিরোধিতার মতই কোন গোষ্ঠী বা শ্রেণী বা ব্যক্তির স্বার্থের সঙ্গে জড়িত। এরা, পুরোহিত শ্রেণী বা ধর্ম-নেতা ইত্যাদি, ভাষা করার একচ্ছত্র অধিকারের মধ্যে দিয়ে এই গোষ্ঠী সমাজের লোকের জীবনের সর্বস্তরে নিয়ন্ত্রণের অধিকারকে সম্প্রসারিত করেছেন।

ধর্মীয় ভাষ্য বলতে এখানে পুণ্যগ্রন্থ, দৈববাণী বা স্বপ্নদৃষ্ট অভিজ্ঞতা সব কিছুই বোঝাচ্ছি। এই শ্ৰেী বা ব্যক্তিবিশেষ ধর্মপ্রাণ ব্যক্তিদের সংস্কার বা দুর্বলতার প্রশ্রয়ে ধর্মীয় নিয়ন্ত্রণকে রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণে রূপান্তরিত করে ফেলেন। ফলত পোপ রাজার চাইতে ক্ষমতাশালী হয়ে পড়েন। ব্রাহ্মণ পুরোহিত ক্ষত্রিয় রাজার উপরে স্থান পান। খলিফার প্রতিপত্তি তার রাজনৈতিক সীমানা ছাড়িয়ে অন্যদেশের জনগণের ওপরে প্রসারিত হয়। খুতবাতে তার প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করা হয় এবং বিভাগপূর্ব ভারতে খিলাফত আন্দোলনের মধ্যে দেখেছি তা কিভাবে দূরদেশের রাজনীতিতেও বিপ্লব উপস্থিত করতে পারে। ইউরোপেও এর ভুরি ভুরি উদাহরণ আছে। রাষ্ট্র এবং চার্চের পৃথকীকরণ দ্বারা এই magic circle বা মন্ত্রপূত গণ্ডী ভাঙা সম্ভব হয়েছে। এই পৃথকীকরণ এসেছে ইউরোপে ফিউডাল সমাজ থেকে পুজিবাদী সমাজ তথা যন্ত্রশিল্পে বিবর্তনের সন্ধিক্ষণগুলিতে। পূজিবাদের বিকাশের লগ্নে গণতন্ত্রের জন্ম ও প্রসারের মধ্য দিয়ে রাজনৈতিক ক্ষমতাও রাজার হাত থেকে বিকেন্দ্রিত হয়ে পড়েছে। পুরোহিত শ্রেণীর রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রতিপত্তি আরো সীমিত হয়ে পড়েছে। সমাজের একস্তর থেকে অন্যস্তরে ক্ষমতার প্রতিসরণের এই পর্যায় সহজ হয়নি মোটেও—-দ্বদ্বে, বিক্ষোভে ও রক্তপাতে তা আবিল। টমাস বেকেটের আত্মদান, প্রথম চার্লসের হত্যা, ঘোড়শ লুই বা মেরি আতোয়ার গিলোটিন এর নানা নাটকীয় মুহূর্ত মাত্র। ক্ষমতা সংরক্ষণের এই দীর্ঘ লড়াইতে যাজক, পুরোহিত বা মাণ্ডারীন শ্রেণী তাদের স্বার্থের প্রশ্নটিকে সুচতুর ভাবে গোপন করার চেষ্টা করেছেন ঐতিহ্য বা ইনস্টিটিউশন প্রতিরক্ষার ধুয়া তুলে; জনমনের আবেগগত ক্ষুধার যুক্তি বা রিচুয়ালের প্রয়োজন প্রভৃতি নানা কথা একই অর্থে আসলে শাক দিয়ে মাছ ঢাকা দেয়ার চেষ্টা। আমরা ইতিমধ্যেই ইঙ্গিত করেছি—আজকের পরিবর্তমান জটিল বিশেষজ্ঞ শাসিত সমাজে কি ভাবে এ সমস্ত চাহিদা বা প্রয়োজন মেটানোর ক্ষমতা কোন একটি মাত্র সামুহিক ideology-র নেই। আমাদের সমাজেও কিছু কাল ধরে এই জাতীয় পুরোহিত শ্রেণী বা ব্যক্তি বিশেষের প্রভাব ও প্রতিপত্তি কমে আসছে। আনুপাতিক ভাবে তাদের নানা প্রতিরক্ষামূলক কার্যকলাপ বেড়ে যাচ্ছে এবং নানা পুরোনো যুক্তি আমরা নতুন করে শুনতে পাচ্ছি। যে কোন সামাজিক বা রাজনৈতিক সংস্কারের কথা উঠলেই এরা তার বিরোধিতা করতে থাকেন, ধর্মীয় সংস্কারের ত কথাই নেই। সাধারণ অশিক্ষিত বা অর্ধশিক্ষিত জনসাধারণকে সংস্কারের বিরুদ্ধে উস্কে দিয়ে এরা এদের ক্ষমতা ও প্রভাব প্রসারিত করতে চান। এরা, যেমন, লোককে সুচতুর ভাবে বোঝাচ্ছেন যে ধর্মনিরপেক্ষতা আসলে ধর্ম বিরোধিতা। এই জাতীয় প্রচার দ্বারা এরা লোকের ধর্মভীরুতাকে রাজনৈতিক বা সামাজিক আতঙ্কে রূপান্তরিত করে ধর্ম রাষ্ট্রের লক্ষ্যে লোককে পরিচালিত করার স্বপ্ন দেখেন। কারণ থিয়োক্রেটিক রাষ্ট্রে ক্ষমতা ত থিয়োক্রাটদের হাতেই ফিরে আসবে। তার জন্য সংঘর্ষের উস্কানীও এরা নিরন্তর দিতে থাকবেন। এদের পেছনে অন্য স্বার্থ প্রণোদিত আরো কেউ থাকবে না এমন বলা যায় না।

ধর্মনিরপেক্ষতাই এই সংঘর্ষ এড়াবার উপায়ও বটে। শিক্ষা জ্ঞান ও তথ্যের বহুল প্রসার এবং শিক্ষার মাধ্যমে অনাসক্ত এবং নিরপেক্ষ মুক্ত মননের চর্চাকে সামগ্রিক ভাবে মানসিক অভ্যাসে রূপান্তরকরণ. রাষ্ট্রনীতি ও সমাজনীতিতে এই নিরপেক্ষতার বাস্তবায়ন এর বহুল উচ্চারিত কর্তব্য ও সমাধান। সামগ্রিকভাবে সংস্কৃতির রূপান্তরের মধ্যে এই প্রবণতা পূর্ণতা পাবে। মানুষের যে আত্মপরিচয় একসময় গোষ্ঠী, বা ধর্মকে আশ্রয় করে বিকশিত হয়েছিল তার ক্ষুদ্র বেড়া ভেঙে সংস্কৃতির বৃহত্তর আঙিনায় তার নতুন পরিচয় লাভ হবে। বাংলাদেশ এই প্রবণতাকেই সত্যতর ও ভবিষ্যৎমুখী বলে জোর দিয়েছে।

ধর্মের উদ্ভবের মতই ধর্মনিরপেক্ষতা ও সামাজিক চাহিদা থেকেই উদ্ভূত হয়েছে, বাংলাদেশের বুদ্ধিজীবীদের কল্পনাবিলাস থেকে নয়। এটা একটা আন্তর্জাতিক সামাজিক সত্য। এর ভবিষ্যৎও আন্তজাতিক সমাজের প্রবণতার সঙ্গেই গ্রথিত। সংঘর্ষের মধ্য দিয়ে ধর্মীয় প্রশ্নের নিস্পত্তি অতীতেও হয়নি ভবিষ্যতেও হবে না। ধর্মের নামে অন্ধবিশ্বাস বা সম্প্রদায়গত সংস্কারকে উস্কেও সমস্যার সমাধান হবে না। সব ধর্মই বিশ্বাসের ওপর শেষ পর্যন্ত নির্ভর করে। অথচ শুধু বিশ্বাসের প্রবণতা দিয়ে ত ধর্মের উপযোগিতা বা উৎকর্ষ প্রমাণ করা যাবে না। ব্যাঙ্ককের রাস্তায় একাধিক বৌদ্ধ তরুণ এবং তরুণী সামাজিক ন্যায়ের প্রতিষ্ঠার দাবীতে সাম্প্রতিক কালে গায়ে পেট্রোল ঢেলে আত্মাহুতি দিয়েছেন। আমি তাদের মানসিক শক্তিকে শ্রদ্ধা জানাই। যে ধর্ম তাদেরকে এরকম মৃত্যুঞ্জয়ী প্রবল বিশ্বাসে অনুপ্রাণিত করে সে ধর্ম সম্বন্ধে কৌতুহলী হই। কিন্তু শুধু মাত্র তাদের ‘ঈমান’ প্রবল বলেই তাদের ধর্ম শ্রেষ্ঠ এমন মানতে পারিনে। শ্রেষ্ঠতার অন্যান্য মানদণ্ড আমার মনে এসে পড়ে। অন্ধ বিশ্বাস দিয়ে অন্ধবিশ্বাসকে মোকাবিলা করা শ্রমের অপচয় : চারশ বছরের ক্রুসেড তার প্রমাণ। ধর্মীয় নির্যাতন বা বিভেদমূলক আচরণ যেমন শ্রমের অপচয়। ইউরোপের ইনকুইজিশন তার প্রমাণ।

ধর্মনিরপেক্ষতা প্রসঙ্গে তাই শেষ পর্যন্ত ব্যক্তির মুক্তি রাষ্ট্রীয় নিরপেক্ষ তার মতই গুরুত্বপূর্ণ। কারণ ব্যক্তিকেই এই বোঝা বইতে হবে। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় রাজনৈতিক দায়িত্বের বোঝার মত এটাও তার নতুন অর্জিত দায়। গণতন্ত্র আর ধর্মনিরপেক্ষতা যেন এপিঠ ওপিঠ। একটি ছাড়া অন্যটি সফল হয় না।

ততকাল আমরা অন্য পক্ষের ভুল-ভ্রান্তিকে যেন ক্ষমার দৃষ্টিতে দেখতে চেষ্টা করি, অন্যের দৃষ্টির আচ্ছন্নতাকে যেন সহ্য করতে শিখি। কথাটা ভল্টেয়ারের। আমরা প্রতিপক্ষের প্রতি সহজেই কঠোর হতে পারি; কিন্তু নিজেদের প্রতি অন্ধভাবে উদার ও আত্মসন্তুষ্ট। আমরা যেন অন্যের প্রতি উদার হতে পারি এবং নিজেদের প্রতি কঠোর। আত্ম পরিচয় বা আত্মচেতনা যেন আত্মতুষ্টির নামান্তর না হয়। আত্মসমালোচনায় যেন শুদ্ধ হতে পারি। অন্যকে সাম্প্রদায়িক বলে গালি দিয়ে যেন নিজের সাম্প্রদায়িকতা না ঢাকি। এটা কঠিন সামাজিক আদর্শ হিসেবে। কিন্তু আদর্শকে যেন ছোট না করি। আমরা সমাজকে বদলাতে চাই, সমাজ আজ যেখানে আছে সেখানেই ফেলে রাখতে চাই না। ভীরুতা দিয়ে পরিবর্তন সাধন করা যায় না। ধর্মনিরপেক্ষতার জন্যও সাহসের প্রয়োজন ।

[সাপ্তাহিক পাঠচক্র খাপছাড়া আড্ডায় প্রবন্ধটি পাঠ করেন মহিউদ্দীন শরীফ]

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google photo

You are commenting using your Google account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s