পাওলো কোয়েলহোর জন্ম ও বেড়ে ওঠা ব্রাজিলের রিও ডি জেনেরোতে। কৈশোর থেকেই তাঁর স্বপ্ন ছিল তিনি একজন লেখক হবেন। কিন্তু সে-স্বপ্ন সহজে পূরণ হবার ছিল না, কারণ তাঁর পিতা-মাতা এটা চাননি। ফলে কোয়েলহোকে ল-স্কুলে ভর্তি হতে হলো। কিন্তু এক বছর না যেতেই তিনি বুঝলেন যে, এই জীবন তাঁর নয়। তিনি পড়াশুনা ছেড়ে বোহেমিয়ান জীবনযাপন শুরু করেন। ইউরোপ-আমেরিকার বিভিন্ন অঞ্চল ঘুরে ঘুরে দেশে ফিরেন ১৯৭৪ সালে, যখন তাঁর বয়স সাতাশ। এ সময়ে তিনি গীতিকার হিসেবে কাজ করতে শুরু করেন। একটা বইও লিখেন অবশ্য, তবে তা জনপ্রিয় হয়নি।

দেশে কয়েক বছর কাটিয়ে কোয়েলহো আবার ভ্রমণে বের হলেন। এবার শুধুই ইউরোপ। স্পেনে তীর্থযাত্রীদের সাথে মিলে একটি ধর্মীয় রিচ্যুয়াল পালনের উদ্দেশ্যে হাঁটলেন ৫০০ মাইল। ১৯৮৬ সালে এই ভ্রমণের ওপর লিখলেন তাঁর দ্বিতীয় বই The Pilgrimage। বইটি প্রকাশিত হয় পরের বছর- ১৯৮৭ সালে। পিলগ্রিমেজ বইটির মাধ্যমে লেখক হিসেবে তাঁর কিছুটা পরিচিতি হলেও কোয়েলহো যা চাচ্ছিলেন তা হচ্ছিলো না। ঐ বছরেই তিনি লিখেন The Alchemist এবং তা প্রকাশ পায় ১৯৮৮ সালে।

উপন্যাসের রিভিউ লিখতে গিয়ে লেখকের এতোখানি জীবনী টেনে আনার প্রয়োজন ছিল না। কিন্তু টানতে হলো এজন্য যে, আলকেমিস্ট উপন্যাসে লেখক আসলে নিজের জীবনটাকেই ভিন্নভাবে উপস্থাপণ করেছেন। তাঁর লেখক হবার স্বপ্ন ও সংগ্রামই আলকেমিস্ট উপন্যাসের প্রধান চরিত্র মেষপালক বালকের গুপ্তধন লাভের স্বপ্ন ও সংগ্রামে রূপান্তরিত হয়ে যায়। তাঁর নিজের বোহেমিয়ান জীবনের সাথে মিলে যায় মেষপালক বালকের বন্ধনহীন জীবনের। লেখকের জন্ম ও বেড়ে ওঠা ব্রাজিলে হলেও উপন্যাসের গল্পটি সাজান তিনি স্পেন, মরক্কো ও মিশর অঞ্চলকে ঘিরে। এমনকি কেন্দ্রীয় চরিত্রটির নামটি পর্যন্ত বেছে নেন তাঁর তীর্থ যাত্রার নামের সাথে মিল রেখে।

তবে এবারও যে কোয়েলহোর আশানুরূপ কিছু হয়েছিলো, তা নয় কিন্তু। প্রথম প্রকাশে বইটির ৯০০ কপি ছাপা হলেও খুব অল্পসংখ্যক বিক্রি হওয়ায় প্রকাশক দ্বিতীয়বার আর প্রকাশ করতে চাইলেন না। তবে এ সময়েই আরেক প্রকাশক বইটির প্রতি আগ্রহ দেখান এবং বইটি প্রকাশ করেন। বইটির ইংরেজি অনুবাদ প্রকাশিত হয় ১৯৯৩ সালে। অবিশ্বাস্য হলেও সত্য যে, বিদেশী ভাষায় অনুদিত হওয়ার পূর্বে খোদ ব্রাজিলেরই খুব অল্পসংখ্যক মানুষ বইটি সম্পর্কে জানতো। আলকেমিস্টের প্রথম বেস্ট সেলার খেতাব জোটে ফ্রান্সে- ফরাসি অনুবাদের ক্ষেত্রে। তারপর প্রায় সত্তরটি ভাষায় অনুদিত হয়েছে বইটি এবং ৭৪টি দেশে বেস্ট সেলারের খেতাব জুটেছে।

আলকেমিস্ট একটি রূপকধর্মী উপন্যাস, যার ভিত্তি স্পিরিচুয়ালিটি বা আত্মিকতা। উপন্যাসটিতে লেখক আমাদেরকে একটি বার্তা দিতে চান। তিনি বলতে চান, প্রত্যেকটি জীবনের একটি ‘পার্সোনাল লেজেন্ড’ আছে; আমরা যদি তাকে চিনতে পারি এবং তার পিছু নিই, তাহলে পৃথিবীর সব কিছু আমাদেরকে তা পেতে সাহায্য করতে এগিয়ে আসে। লেখকের ভাষায়, All the universe conspires in helping you to achieve it।

 

 

paulo-coelho-3
পাওলো কোয়েলহো

পুরো আলকেমিস্ট উপন্যাসটি এই ‘পার্সোনাল লেজেন্ড’কে কেন্দ্র করে রচিত। সংগত কারণেই এই প্রবন্ধের ভিত্তিও ‘পার্সোনাল লেজেন্ড’। প্রবন্ধটিতে পার্সোনাল লেজেন্ডের ওপর আলোকপাত করার আরো একটি কারণ রয়েছে। যারা আলকেমিস্ট-এর বাংলা অনুবাদ পড়েছেন, তারা হয় তো এই শব্দবন্ধটি সম্পর্কে আদৌ অবগতই নন, কারণ বাংলা অনুবাদে ‘পার্সোনাল লেজেন্ড’কে কখনো ‘লক্ষ্য’ এবং কখনো ‘স্বপ্ন’ দিয়ে প্রতিস্থাপন করা হয়েছে। উপন্যাসের বিষয়বস্তুর আলোকে লক্ষ্য কিংবা স্বপ্ন যথার্থ ভাবানুবাদ মনে হলেও এ শব্দ দুটির কোনটিই ইংরেজি ‘Personal Legend’ কিংবা পর্তুগিজ ‘Lenda Pessoal’ এর অর্থকে ছুঁতে পারে না। এর প্রধান কারণ লক্ষ্য বা স্বপ্ন শব্দের মধ্যে ‘পার্সোনাল লেজেন্ড’-এর মতো অস্পষ্টতা নেই। মূলত পার্সোনাল লেজেন্ড শব্দবন্ধের অস্পষ্টতা বা vagueness-ই উপন্যাসটিকে এক উচ্চ স্পিরিচুয়াল ভিত্তি দিয়েছে, নইলে এটি অন্য আর দশটা প্যারাবলের মতো গতানুগতিক হয়ে যেতো। (প্যারাবল হলো নৈতিক বা আধ্যাত্মিক গল্প, যাকে বাংলায় ধর্মীয় উপাখ্যান বলা যেতে পারে।)

উপন্যাসটিতে ‘পার্সোনাল লেজেন্ড’ বা ‘লেন্ডা পেসোয়াল’ শব্দবন্ধের ব্যবহারকে ‘লেখকের খেয়াল’ও বলা যেতে পারে। আসলে এ ধরণের ছোট ছোট বিষয়গুলো সাহিত্যে সৌন্দর্য বৃদ্ধি করে এবং পাঠকের দৃষ্টি আকর্ষণে সাহায্য করে; কোন সাধারণ গ্রন্থকেও নিয়ে যায় এক অন্য উচ্চতায়। কোয়েলহোর আলকেমিস্ট উপন্যাসটির সারা পৃথিবীব্যাপি জনপ্রিয়তার যদি কেবল একটা কারণ নির্দিষ্ট করা হয়, আমার মতে সেটি হবে ‘Lenda Pessoal’ বা ‘পার্সোনাল লেজেন্ড’।

পৃথিবীর অনেক বিখ্যাত উপন্যাসেই এ ধরণের শব্দবন্ধের প্রয়োগ দেখা যায়। The Boy in the Stripped Pyjamas উপন্যাসটি যারা পড়েছেন, কিংবা নিতান্ত যারা মুভিটি দেখেছেন, তারা নিশ্চয়ই ‘হোপলেস কেইস’ ভুলেননি। বালক ব্রুনো তার বোনকে উল্লেখ করতে সবসময়ই ‘হোপলেস কেইস’ ব্যবহার করে। উপন্যাসটিতে ব্রুনো ও শ্‌মুয়েলের বন্ধুত্ব এবং তাদের মর্মান্তিক মৃত্যুকেও ছাপিয়ে যায় এই ‘হোপলেস কেইস’। আলকেমিস্ট উপন্যাসে ঠিক একরমটিই ঘটে ‘পার্সোনাল লেজেন্ড’-এর ক্ষেত্রে।

উপন্যাসটিতে মেষপালক বালক সান্তিয়াগোর সাথে সাথে পাঠকেরও ‘পার্সোনাল লেজেন্ড’-এর সাথে প্রথম পরিচয় ঘটে সালেমের রাজা মেলসিজেদেকের মাধ্যমে। রাজার সাথে তার দেখা হয় আন্দালুসিয়ার ছোট বন্দর তারিফায়। সান্তিয়াগো সেখানে গিয়েছিলো এক জিপসি নারীর কাছে তার স্বপ্নের ব্যাখ্যা জানতে। জিপসি নারীটি তাকে স্বপ্নের কোন ব্যাখ্যা তো দেয়ই না, উল্টো স্বপ্নে-দেখা গুপ্তধনের সন্ধান পেলে তার এক দশমাংসের ভাগ চেয়ে বসে। জিপসি নারীর কাছ থেকে ফিরে একটি বেকারির সামনে বেঞ্চে বসে এসব নিয়েই ভাবছিলো সান্তিয়াগো যখন তার পাশে বসা এক বুড়ো তার সঙ্গে যেচে কথা বলতে চায় এবং জানায় যে সে আন্দালুসিয়ার সালিম নামক অঞ্চলের রাজা। বালক সান্তিয়াগো মেলসিজেদেককে বিশ্বাস করতে পারে না। “রাজা কেন সামান্য মেষপালকের সাথে কথা বলবে?” সে সন্দেহ প্রকাশ করে। তখন মেলসিজেদেক বলেন, “অনেক কারণ আছে। সবচেয়ে বড় কারণ, তুমি তোমার পার্সোনাল লেজেন্ডকে চিনতে পেরেছো”। সান্তিয়াগো জানে না ‘পার্সোনাল লেজেন্ড’ কী। রাজা তাকে বলেন, “এটি এমন কিছু, যা তুমি সবসময় পেতে চেয়েছো।”

তিনি আরো বলেন, “কমবয়সী মানুষ পার্সোনাল লেজেন্ডকে চিনতে পারে। এই বয়সে সব কিছু স্বচ্ছ এবং সব কিছু সম্ভব। তারা স্বপ্ন নিয়ে ভীত নয়; তারা তাদের জীবনে সম্ভাব্য সকল কিছু ঘটতে দেখার অপেক্ষা করে। কিন্তু সময়ের সাথে সাথে এক অদ্ভুত শক্তি এসে তাদের বিশ্বাস করাতে শুরু করে যে পার্সোনাল লেজেন্ডকে পাওয়া তাদের পক্ষে সম্ভব নয়।”

রাজা তাকে বুঝান যে, স্বপ্নে-দেখা গুপ্তধনকে খুঁজে বের করাই সান্তিয়াগোর জীবনের পার্সোনাল লেজেন্ড এবং তাকে ওটারই পিছু নেয়া উচিত। রাজার কথাতেই সান্তিয়াগো কিছু ভেড়া রাজাকে দিয়ে দেয় এবং বাকিগুলো বিক্রি করে স্পেন থেকে মরক্কোয় পাড়ি দেয়ার চিন্তা করে। সে ভুলে যায় তার মানস-প্রেমিকা বণিক কন্যাকে, এক বছর আগে যার সাথে দেখা হওয়ার পর থেকে বহুদিন সে তার কথা ভেবে কাটিয়েছে। আর তিন দিন পরেই তার বণিক কন্যার শহরে পৌঁছার কথা। সে এমনটাও ভেবে রেখেছিলো যে, বণিক কন্যা যদি এখনও কারো বাগদত্তা না হয়ে থাকে, তাহলে সে তাকে বিয়ের প্রস্তাব দিবে। রাজার কথায় সান্তিয়াগো তার প্রেমকে বিসর্জন দেয় এবং তার পার্সোনাল লেজেন্ডের পিছু নেয়। সে গুপ্তধন খুঁজতে বেরিয়ে পড়ে, স্বপ্নমতে যা লুকিয়ে রয়েছে মিশরের পিরামিডের কাছাকাছি কোন এলাকায়।

রাজা তাকে দুটো পাথর দেন এবং পথ চলতে গিয়ে সুলক্ষণকে অনুসরণ করতে বলেন। সান্তিয়াগো মরক্কোতে পৌঁছেই এক আরবের কাছে তার সর্বস্ব হারায়। রাজার কথামতো স্পেন ছেড়ে আরবে আসাকে তার বোকামি মনে হতে থাকে। কপর্দকশূন্য বালক সান্তিয়াগো দেশে ফেরার অর্থ যোগাড় করতে এক বছর একটি দোকানে কাজ করে। পর্যাপ্ত অর্থ যোগাড় হলে সে স্পেনে ফেরত এসে আবার ভেড়া কিনে মেষপালক জীবনে ফিরে আসার চিন্তা করে। কিন্তু রাজার দেয়া পাথর দুটো তাকে মনে করিয়ে দেয় যে, তার বাড়ি ফেরার কথা নয়, তার পার্সোনাল লেজেন্ডকে অনুসরণ করার কথা। সে গিয়ে উপস্থিত হয় এক ইংরেজের ঘরে যার ‘পার্সোনাল লেজেন্ড’ একজন আলকেমিস্ট হওয়া।

ইংরেজটি ও সান্তিয়াগো একটি কাফেলার সাথে মরুভূমি পাড়ি দেয়ার যাত্রা শুরু করে; ইংরেজটির লক্ষ্য একজন আলকেমিস্টকে খুঁজে পাওয়া এবং বালক সান্তিয়াগোর লক্ষ্য পিরামিডের কাছে পৌঁছানো। মরুভূমিতে গোত্রযুদ্ধের কারণে পথে একটি মরুদ্যানে তাদেরকে থামতে হয়। সেখানে ইংরেজটির নয়, বরং সান্তিয়াগোর সাথেই দেখা মেলে আলকেমিস্টের। আলকেমিস্ট তাকে যুদ্ধের মধ্যেও মরুযাত্রায় উৎসাহী করে এবং নিজেই তার সঙ্গী হয়। অনেক চড়াই-উৎড়াই পেরিয়ে সান্তিয়াগো শেষ পর্যন্ত পিরামিডের কাছে পৌঁছে যায়। সেখানে রাজার বলে দেয়া সুলক্ষণ অনুসরণ করে গুপ্তধন প্রাপ্তির লক্ষ্যে মরুভূমিতে খোড়াখুড়ি করে সে। এরই মাঝে সেখানে উপস্থিত হয় যুদ্ধে ক্ষতিগ্রস্ত একটি গোত্রের কিছু উদ্বাস্তু। তারা সান্তিয়াগোর কাছে থাকা আলকেমিস্টের দেয়া সোনার বারটি নিয়ে যায়। তারা ভেবে নেয় সান্তিয়াগো নিশ্চয়ই ওখানে সোনা লুকিয়ে রেখেছিল, তাই খোড়াখুড়ি করছে। তারা আরো সোনার জন্য সান্তিয়াগোকে মারতে থাকে। সান্তিয়াগোর মনে হয়, তারা তাকে মেরে ফেলবে। তার মনে পড়ে যায় আলকেমিস্টের কথা- “মারা গেলে টাকা কোন্ কাজে লাগবে? টাকা সবসময় প্রাণ বাঁচায় না।” প্রাণ বাঁচাতে সে তখন বলে ফেলে যে, সে এখানে স্বপ্নে-দেখা গুপ্তধন খুঁজতে এসেছে। দলনেতা তাকে বিশ্বাস করে। সে সান্তিয়াগোকে ছেড়ে দেয়ার নির্দেশ দেয় এবং ব্যঙ্গের সাথে বলে, “স্বপ্নে-দেখা গুপ্তধনের পিছনে বোকারাই ছোটে। দুই বছর আগে আমিও এখানে শুয়ে স্বপ্ন দেখেছিলাম আন্দালুসিয়ার একটি পরিত্যক্ত গির্জায় বেড়ে ওঠা বটগাছের তলায় গুপ্তধন রয়েছে। তাই বলে আমি বোকার মতো স্বপ্নের পিছনে ছুটিনি”। সান্তিয়াগো বুঝে ফেলে যে তার পার্সোনাল লেজেন্ডের অনুসরণ তাকে এখানে নিয়ে এসেছে ঠিকই, তবে সে এখানে নয়, তার স্বপ্নের গুপ্তধন রয়েছে যে-গির্জায় শুয়ে সে স্বপ্নটা দেখেছিল সেখানেই।

উপন্যাসটিতে আমরা দেখি বালক সান্তিয়াগো তার পার্সোনাল লেজেন্ডের পিছু (pursue) নিতে গিয়ে তার শৈশবের স্বপ্ন মেষপালক হওয়া ও প্রথম মানস-প্রেমিকা বণিক কন্যাকে অবলীলায় ত্যাগ করে। সে সাগর পাড়ি দিয়ে অচেনা-অজানা দেশে চলে যায়; সেখান থেকে আরো বিপদসংকুল মরুভূমি পাড়ি দেয়; বেশ কয়েকবার অর্থ হারায় এবং মৃত্যুর মুখে পড়ে। এমনকি মরুদ্যানের প্রেমিকা ফাতেমাকে বিয়ে ও তার সাথে সংসার করার চিন্তাও তাকে গুপ্তধনের কাছে পৌঁছানোর চেষ্টা থেকে বিরত রাখতে পারে না, বা সে নিজেকে বিরত রাখতে চাইলেও ফের এমন কিছু ঘটে যাতে সে আবার গুপ্ত ধনের পিছু নিতে বাধ্য হয়।

সান্তিয়াগো কেন সবকিছু ছেড়ে বারবার পার্সোনাল লেজেন্ড-এর পিছু নেয়, বা কেন একজন মানুষের পার্সোনাল লেজেন্ডের পিছু নেয়া উচিত, এ সম্পর্কে আলকেমিস্টের কাছ থেকে আমরা যা শুনতে পাই তাকে তিনটি বাক্যে সাজানো যায়। যারা পার্সোনাল লেজেন্ডকে চেনে না, তারা কখনোই সুখী হয় না। যারা পার্সোনাল লেজেন্ডকে পেয়েও চিনতে ব্যর্থ হয়, তারা ভীত। আর যারা লেজেন্ডকে চিনেও তার পিছু নেয় না, তারা অসুখী এবং ভীত দুটোই।

সান্তিয়াগো যখন মরুদ্যান থেকে স্পেনে ফেরার চিন্তা করে, তখন আলকেমিস্ট তাকে বিভিন্নভাবে বুঝায় কেন এতোটা কাছাকাছি এসে ফিরে গেলে সারা জীবনেও সে সুখী হবে না, কেন সে বিরাট ধনী হলেও সারা জীবন তাকে কুঁড়ে কুঁড়ে খাবে এই ভেবে সে কেন তার হৃদয়কে অনুসরণ করে পার্সোনাল লেজেন্ডের পিছু নিলো না। তার জীবনে অশান্তি আসবে। অশান্তিতে ভুগবে ফাতিমাও; সে ভাববে তার জন্যই বুঝি সান্তিয়াগো তার পার্সোনাল লেজেন্ডকে ত্যাগ করতে বাধ্য হয়েছিল। মোট কথা তার জীবনে সুখ বলতে কিছু থাকবে না।

আলকেমিস্ট উপন্যাসে লেখক আমাদেরকে বারবার বলতে চান যে, প্রত্যেক জীবনেরই একটি পার্সোনাল লেজেন্ড আছে। মানুষকে সেটা চিনতে হবে এবং তাকে pursue করতে হবে। এটা করতে গিয়ে সে সেইসব শিক্ষা পাবে, যা তাকে পার্সোনাল লেজেন্ডের কাছে পৌঁছাতে সাহায্য করবে, এবং সেটা করতে পারলেই সে প্রকৃত সুখী হবে।

 

প্রবন্ধের প্রথম থেকে এই পর্যন্ত আমরা বহুবার ‘পার্সোনাল লেজেন্ড’ শব্দবন্ধটি শুনেছি, কিন্তু এটি যে কী, সম্ভবত সে সম্পর্কে আমাদের খুব একটা ধারণা হয়নি। উপন্যাসটি পড়েও আমার একই অবস্থা হয়েছিল। এর সমাধান খুঁজতে আমাকে দ্বারস্থ হতে হয়েছিল অন্যান্য সূত্রের। প্রবন্ধের প্রথমদিকে আমি ‘পার্সোনাল লেজেন্ড’-এর ভেইগনেস বা অস্পষ্টতার কথা একবার বলেছি। সেটি আরো স্পষ্ট হয় লেখকের নিজের কথায়। তাঁকে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, আপনার এই উপন্যাসটির এমন বৃহৎ সাফল্যের পিছনে কী কারণ রয়েছে মনে করেন? এর উত্তরে লেখক বলেছিলেন, “যদি সত্যিটা বলি তাহলে বলতে হয়, আমার জানা নেই। শুধু এটাই জানি যে, মেষপালক সান্তিয়াগোর মতো আমাদের প্রত্যেককে পার্সোনাল কলিং সম্পর্কে অবগত হওয়া প্রয়োজন।“ সেই পার্সোনাল কলিংটা কী এ বিষয়ে তিনি বলেন, “এটা ঈশ্বরের আশীর্বাদ; এটা সেই পথ, যা ঈশ্বর পৃথিবীতে আপনার জন্য বেছে রেখেছেন।“

উপরোক্ত উত্তরে আমরা স্পষ্ট দেখতে পাই যে লেখক নিজেই ‘পার্সোনাল লেজেন্ড’ বা ‘পার্সোনাল কলিং’ বিষয়ে এক অস্পষ্ট উত্তর দিয়েছেন। ‘ঈশ্বরের আশীর্বাদ’ বা ‘ঈশ্বরের নির্ধারিত পথ’ হলে মানুষ সে পথে না হেঁটে অন্য পথে হাঁটবে কেন? কেন তাহলে উপন্যাসে লেখক বারবার বলতে চান যে, বেশিরভাগ মানুষ তার ‘পার্সোনাল লেজেন্ড’কে মানে ঈশ্বরের নির্ধারিত পথকে চিনতে পারে না এবং অনুসরণ করে না বলেই তারা অসুখী। লেখকের অস্পষ্টতা আরো স্পষ্ট হয় তার পরের অংশে। তিনি বলেন, “যখন আমরা কোন কার্য সম্পাদন করি, আমরা উদ্যম লাভ করি, আমরা লেজেন্ডকে অনুসরণ করি।”

আলকেমিস্ট উপন্যাসের ২০০২ এর ইংরেজি সংস্করণে তিনি পার্সোনাল লেজেন্ডকে স্বপ্ন হিসেবে উপস্থাপণ করে মানুষের স্বপ্ন বাস্তবায়নের প্রধান অন্তরায় নিয়ে বিষদ ব্যাখ্যা করেন। কিন্তু তাঁর ব্যাখ্যাটির সাথে আমাদের বিরোধ ঘটে উপন্যাসেরই আরেকটি অংশে। আলকেমিস্টের বাসায় ডিনার টেবিলে আলকেমিস্ট সান্তিয়াগোকে আলকেমি সম্পর্কে বেশ জ্ঞানগর্ভ কিছু কথা বলেন। সেখানে এক পর্যায়ে যারা আলকেমি নিয়ে গবেষণা করে তাদের সমালোচনা করে তিনি বলেন, “কিছু মানুষ আছে যারা কেবল সোনায় আগ্রহী। তারা কোনদিনই আলকেমির গুঢ় রহস্যকে ভেদ করতে পারে না। তারা ভুলে যায় যে সিসা, তামা, লোহা, এসবেরও নিজস্ব পার্সোনাল লেজেন্ড রয়েছে। যারা অন্যের পার্সোনাল লেজেন্ডে হস্তক্ষেপ করে, তারা কখনোই নিজের পার্সোনাল লেজেন্ড খুঁজে পায় না।“

মানুষের বা জীবের পার্সোনাল লেজেন্ডকে ‘লক্ষ্য বা স্বপ্ন’ দিয়ে ব্যাখ্যা করা গেলেও কোন ধাতুর পার্সোনাল লেজেন্ডকে আমরা ‘লক্ষ্য বা স্বপ্ন’ দিয়ে ব্যাখ্যা করতে পারি না। মিলাতে পারি না সান্তিয়াগোকে বলা রাজা মেলসিজেদেকের পার্সোনাল লেজেন্ড সম্পর্কে ব্যাখ্যার সাথেও, কারণ কোন ধাতু তার পার্সোনাল লেজেন্ডকে অনুসরণ বা পূর্ণ করার নিজস্ব ক্ষমতা রাখে না। তবে আলকেমিস্টের কাছে সবকিছুরই আত্মা আছে, তাই সবকিছুরই পার্সোনাল লেজেন্ড আছে। তার মতে প্রত্যেক বস্তুর নিজেকে উন্নততর কিছুতে পরিবর্তিত হতে হয় এবং নতুন পার্সোনাল লেজেন্ড অর্জন করতে হয়, যতদিন পর্যন্ত না বিশ্ব আত্মা একই বস্তুতে লীন হয়ে যায়।

আলকেমিস্টের সাথে কথা বলে সান্তিয়াগো বুঝতে পারে পার্সোনাল লেজেন্ডকে মানুষ তখনই চিনতে পারে যখন সে নিজেকে পূর্বের অবস্থা থেকে উন্নততর অবস্থায় পরিবর্তিত করতে পারে, যেমন আলকেমিতে সিসা সোনায় রূপান্তরিত হয়। সে আরো বুঝতে পারে যে, পৃথিবী বা মহাবিশ্ব চায় যে সবাই তার পার্সোনাল লেজেন্ডকে খুঁজে পাক, কারণ বিশ্ব আত্মা এতে তার ভবিতব্যে (destiny) পৌঁছাতে পারবে, মানে একই বস্তুতে লীন হতে পারবে।

এখানে আলকেমি সম্পর্কে একটা সাধারণ ধারণা দেয়ার প্রয়োজন মনে করছি। পুরো মধ্যযুগ জুড়ে ইউরোপ, আফ্রিকা ও এশিয়াতে প্রাচীন দার্শনিক বিশ্বাসের ওপর ভিত্তি করে এক প্রকার বিজ্ঞানের বিস্তার ঘটেছিল, যাতে মনে করা হতো নিচু মানের ধাতু যেমন সিসা, লোহা, ইত্যাদিকে মূল্যবান ধাতু যেমন সোনায় রূপান্তরিত করা সম্ভব; তারা আরো মনে করতো গবেষণার মাধ্যমে যৌবন সঞ্জিবনী ওষুধ (Elixir of life) আবিস্কার করা সম্ভব। এই দার্শনিক বিশ্বাসভিত্তিক বিজ্ঞানকে আলকেমি বলে। ইংরেজিতে এ ধরণের বিজ্ঞানকে প্রোটোসায়েন্স বলে, যা pseudoscience বা অপবিজ্ঞান থেকে এই অর্থে ভিন্ন যে, অপবিজ্ঞান সবসময়ই কুযুক্তির মাধ্যমে তার অবস্থানকে আঁকড়ে ধরে থাকে, অন্যদিকে protoscience ইম্পিরিক্যাল এভিডেন্স পেলে তার পূর্বের অবস্থান ত্যাগ করে। উল্লেখ্য বিজ্ঞানী নিউটনও একজন আলকেমিস্ট ছিলেন, যদিও তিনিই হলেন সেই বিজ্ঞানী যার আবিস্কার মানুষকে বৈজ্ঞানিক ভ্রান্তি থেকে সরিয়ে আনতে সাহায্য করে।

আলকেমিস্ট উপন্যাসটি পড়ে আমার মনে হয়েছে মানুষের কাছে উপন্যাসটির জনপ্রিয়তার দুটি কারণ রয়েছে। প্রথমত, উপন্যাসটি বেশ হেয়ালিপূর্ণ। মানুষের গতানুগতিক স্পিরিচুয়াল ধারণার হেয়ালিপনার সাথে মিলে যায় বলে মানুষ কিছু না বুঝেও অনেক কিছু বুঝেছে বলে মনে করে। বলা যায় না, ধর্মে বিজ্ঞান খোঁজার মতো কেউ হয় তো বিশ্ব আত্মার একই বস্তুতে লীন হওয়ার মধ্য দিয়ে মহাবিশ্বের মহাপ্রলয়ও খুঁজে পেতে পারে।

দ্বিতীয়ত, পৃথিবীর প্রায় একশতভাগ মানুষই তার নিজের অর্জনে তৃপ্ত নয়। তারা মনে করে বইটি তার জীবনের লক্ষ্যে পৌঁছাতে সাহায্য করবে। সান্তিয়াগোর মতো লেগে থাকতে পারলে চড়াই-উৎরাই পেরিয়ে তারা ঠিকই তাদের গুপ্তধনের সন্ধান পেয়ে যাবে। আসলে মানুষ জানেই না যে সে কী চায়। আমেরিকার প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট বিল ক্লিনটন আলকেমিস্ট পড়ছেন, পত্রিকায় এমন একটি ছবি বেরিয়েছিল- এটা পড়ে আমার মনে প্রশ্ন জেগেছিল- ক্লিনটনের পার্সোনাল লেজেন্ড তাহলে কী? আমেরিকার প্রেসিডেন্ট হওয়ার পরে আর কীই বা চাওয়ার থাকতে পারে?

উপরোক্ত দুই দলের মধ্যে প্রথম দল সম্পর্কে আমার কিছু বলার নেই, কারণ তারা আত্মিকতা বা আধ্যাত্মিকতায় বিশ্বাসী মানুষ, তাই যা খুশি তাই ভাবতে পারে। কিন্তু যারা দ্বিতীয় দলের, তাদের সাথে আমার খুব বড় রকমের দ্বিমত আছে। তারা নিজেরা মনে করে এবং অন্যকে এই বার্তা দিতে চায় যে, যদি তুমি তোমার জীবনে কিছু চাও, তোমাকে জীবনের সর্বস্ব দিয়ে সেটা চাইতে হবে; এজন্য তুমি কোন কিছুকেই পাত্তা দিবে না, কোন কিছুতে সন্দেহও করবে না, কেবল তোমার হৃদয়কেই অনুসরণ করবে। এই ধারণাটাকে আমি ভুল ও অযৌক্তিক মনে করি। মানুষের জীবন পরিবর্তনশীল; আজ আমি যেটাকে আমার জীবনের লক্ষ্য স্থির করলাম, পাঁচ বছর পরে আমার পারিপার্শ্বিকতা আমাকে সেই লক্ষ্যে থাকতে দিতে নাও পারে। একটা উদাহরণ দেয়া যাক, ধরে নিলাম একটা লোক প্রকৌশলী হওয়ার স্বপ্ন দেখছিলো। কিন্তু দেখা গেলো দেশে যুদ্ধ লেগে গেলো এবং তাতে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানটি বন্ধ হয়ে গেলো। আবার যুদ্ধে তার পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি বাবাও মারা গেলো। এখন ঐ ব্যক্তিটি কি মা এবং ছোট ছোট বোন-ভাইদের ছেড়ে পড়াশুনার জন্য বিদেশে পাড়ি জমাবে, নাকি সংসারের দেখভাল করার জন্য কৃষিকাজ শুরু করবে বা কোন একটা চাকুরি জুটিয়ে নিবে? সান্তিয়াগো যেমন প্রেমিকাকে উপেক্ষা করতে পারে, আমাদের তরুণ ছাত্রটি তেমন পরিবারকে উপেক্ষা করে তার স্বপ্নের পিছু নিতে পারবে কি? শৈশবে আমার স্বপ্ন ছিলো কীর্তন দলের বাঁশিবাদক হওয়া। আমার কি সেটাকেই pursue করা উচিত ছিলো?

আবার কোন ব্যক্তি যদি এমন কিছুকে তার জীবনের লক্ষ্য হিসেবে বেছে নেয় যা সমাজের জন্য ক্ষতিকর, সেক্ষেত্রেই বা কী হবে? একজন সিরিয়াল কিলারের কথা চিন্তা করুন। সে কিন্তু তার লক্ষ্যে অবিচল থেকে একটা নির্দিষ্ট প্যাটার্নে একের পর এক মানুষ খুন করতে থাকে। তার হৃদয় বলছে মানুষ খুন করতে, তাই সে খুন করে যাচ্ছে। তার মানুষ হত্যা থামাতে হলে তার হৃদয়কে অনুসরণ করা বন্ধ করতে হবে। আইসিস বা ইসলামী জঙ্গিগুলোর হুদয়ের ব্যাপারটা ভেবে দেখুন তো একবার!

এখানে অবশ্য কেউ দাবি করতে পারেন যে, পাওলো কোয়েলহো ‘পার্সোনাল লেজেন্ড’ বলতে তো আসলে এসব বুঝাননি; তিনি বলেছেন বেশিরভাগ মানুষ তার পার্সোনাল লেজেন্ডকে চিনতেই পারে না, এবং চিনতে পারছে না বলেই মানুষ ভুলের পিছনে ছুটে। তাদের মতো আমাদের প্রকৌশল হতে চাওয়া তরুণ কিংবা সিরিয়াল কিলার কিংবা আইসিস জঙ্গিদের কেউই তাদের ‘পার্সোনাল লেজেন্ড’কে চিনতে পারেনি। এই যুক্তিতে আপনি ঠিক আছেন। কিন্তু যারা বইটি পড়ছে এবং অন্যদেরকে পড়ার উপদেশ দিচ্ছে, তারা কিন্তু নিজ লক্ষ্যে অবিচল থাকার শিক্ষা নিচ্ছে।

এই বিষয়ে আমার মত হলো, উপন্যাসকে উপন্যাসের জায়গায় রাখা হোক, যে ‘পার্সোনাল লেজেন্ড’ সম্পর্কে লেখক নিজেই নিশ্চিত কিছু বলতে পারছেন না, তাকে আমরা প্রেরণাদায়ক কিছু মনে করা থেকে বিরত থেকে সাহিত্য রসটুকু আস্বাদন করি কেবল। উপভোগ করি গল্পের উপস্থাপনার নতুনত্বকে। আর এগুলোর হিসেবে কোয়েলহোর আলকেমিস্ট অন্যতম সুন্দর উপন্যাস।

…………

[প্রবন্ধটি সাপ্তাহিক পাঠচক্র ‘খাপছাড়া আড্ডা’র ১৪.০৬.২০১৮ তারিখের পাঠচক্রে পাঠ করা হয়।]

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s