ধর্ষণের সাথে যে যৌনতা নয়, বরং শক্তিমত্তা জড়িত, এ বিষয়ে আগে লিখেছিলাম। ধর্ষণ যে রাজনীতির হাতিয়ার হিসেবেও ব্যবহৃত হয়, আসিফার কেসটি তার স্পষ্ট প্রমাণ।
.
আট বছর বয়সী আসিফা তাদের গৃহপালিত ঘোড়া আনতে গিয়েছিল জানুয়ারির ১০ তারিখ। ঘোড়া ফিরলেও আসিফা আর ফেরেনি। পুলিশের কাছে রিপোর্ট করতে গেলে তারা বলেছিল, আসিফা কোন ছেলের সাথে পালিয়েও তো যেতে পারে। শেষ পর্যন্ত ১২ তারিখ পুলিশ কেসটা নেয়। আসলে আসিফা অপহরণের সাথে পুলিশেরও সংযোগ ছিলো। ১৭ তারিখ জঙ্গলের মধ্যে আসিফার মৃতদেহ পাওয়া যায়। জানা যায় মৃত্যুর পূর্বে সে গণধর্ষণের শিকার হয়েছিলো।
 
আসিফাদের পরিবারটি ছিল একটি যাযাবর পরিবার, যারা মুসলিম প্রধান কাশ্মির ও হিন্দু প্রধান জম্মু দুই দিকেই ঘুরে ঘুরে জীবন যাপন করতো। ঘটনার সময়ে আসিফার পরিবার ছিল জম্মুতে। জম্মুরা হিন্দুরা চাইতো না যে, মুসলিম যাযাবররা তাদের এলাকায় আসুক। তারা ভয় করতো মুসলিমরা জম্মুতে এসে আবাস গড়া শুরু করলে জম্মুর ডেমোগ্রাফি পরিবর্তিত হয়ে যাবে, মানে জম্মুও মুসলিম প্রধান হয়ে যাবে। হিন্দুরা তাই মুসলিম যাযাবর গোষ্ঠীদের মধ্যে ভীতি ছড়িয়ে দিতে চেয়েছিলো, যাতে তারা জম্মু থেকে চলে যায় এবং ফের ওদিকটাতে না আসে।
 
চল্লিশের দশকে পাকিস্তান সৃষ্টির প্রাক্কালে ও তৎপরবর্তী সময়ে বরিশালের গ্রামাঞ্চলের চিত্র নিয়ে লিখিত মিহির সেনগুপ্তের আত্মজীবনীমূলক বই ‘বিষাদ বৃক্ষ’ যারা পড়েছেন, তারা এমন চিত্র সেখানেও দেখেছেন। কাছাকাছি কোন গ্রামে কোন হিন্দু মেয়ে মুসলিমদের দ্বারা ধর্ষিত হয়েছে বা তুলে নেয়া হয়েছে, এমন খবর শুনে অন্যসব গ্রামগুলোতেও হিন্দুদের দেশ ছাড়া হওয়ার হিড়িক পড়ে যেতো।
 
জম্মুর হিন্দুরা আসিফাকে আটকে রেখেছিল মন্দিরে। এটা দ্বারা আপনি আরেকটা বিষয় বুঝে নিতে পারেন, যদিও তারা আসিফাকে অপহরণ করেছিল জম্মুর হিন্দু-প্রধান প্রকৃতিটি বজায় রাখার লক্ষ্যে, তাদের মধ্যে মন্দিরে মুসলিম প্রবেশে মন্দিরের অশুদ্ধ হওয়া কিংবা মন্দিরের দেবতার ক্ষুব্ধ হওয়া জাতীয় কোন চিন্তা কাজ করেনি। তার মানে ধর্মীয় বিশ্বাস এবং ধর্মীয় শুচিগ্রস্থতা তাদের মধ্যে কাজ করেনি। অথচ এই ভারতেই আমরা মন্দিরে ‘অস্পৃশ্য’ হিন্দুদের প্রবেশ নিয়ে হত্যাকাণ্ড পর্যন্ত দেখতে পাই।
 
আসিফাকে যারা ধর্ষণ ও হত্যা করেছে, তাদের কাছে হিন্দুত্ব বা মুসলমানত্ব কোন গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল না; ধর্মকে ব্যবহার করে রাজনৈতিক ফায়দা তোলাই তাদের একমাত্র লক্ষ্য ছিল। এটা আরো স্পষ্ট হয় এই অপরাধের সাথে যারা জড়িত তাদের তালিকা দেখে। এর সাথে জড়িত ছিল পুলিশ, সরকারী কর্মকর্তাসহ কিছু নাবালকও। আর যখন আমরা দেখি বিজেপির কর্মী থেকে উকিল পর্যন্ত ধর্ষকদের পক্ষ নিয়ে দাঁড়িয়ে গিয়েছে, তখন এই রাজনীতি বুঝতে একটুও বাকি থাকে না।
 
নারীরা রাজনীতিতে যুক্ত হয়েছে খুব বেশিদিন নয়। বিশ্বের বড় বড় গণতান্ত্রিক দেশেও তারা ভোটাধিকার পেয়েছে বিংশ শতাব্দীতে এসে। আর যুদ্ধে তাদের অংশগ্রহণ তো কোন কালে ছিল না বললেই চলে। কিন্তু আমাদের ইতিহাস জুড়ে নারীরা বারবার যুদ্ধ ও রাজনীতির বলী হয়েছে। চেঙ্গিস খান যেখানেই যুদ্ধে বিজয়ী হয়েছেন, সেখানেই নারীদের মধ্যে তার বংশ রেখে যাওয়ার লক্ষ্যে ধর্ষণ করেছেন অগণিত নারী। একই ধারা দেখতে পাওয়া যায় ইসলামেও। এখন দেখছি হিন্দুরাও আর পিছিয়ে থাকতে চাচ্ছে না। তারাও আজ ধর্ষণকে রাজনীতির হাতিয়ার বানিয়ে ফেলেছে।
 
আসিফার ধর্ষণ ইস্যুতে তসলিমা নাসরীনের টুইটটা উল্লেখ করতে চাই এখানে। তিনি লিখেছেন, “I don’t say hindu men rape muslim girls or muslim men rape hindu girls. hindu men rape hindu girls more than they rape muslim girls. muslim men rape muslim girls more than they rape hindu girls. I rather say ‘men rape girls’ and men love to gangrape children.”
 
তসলিমা নাসরীন ঠিকই বলেছেন, পুরুষরাই নারীদের ধর্ষণ করে। আমি তাঁর সাথে যোগ করতে চাই, পুরুষগণ, তোমরা রাজনীতি করো, যুদ্ধ করো, বেশ ভাল কথা। তোমরা নিজেরা মরতে চাইলে মরো, কিন্তু নারীকে তোমাদের কাপুরুষতার বলী করো না।
Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s