মহাভারত ভারতীয় উপমহাদেশের সবচেয়ে বৃহৎ পৌরাণিক গ্রন্থ যা অধ্যয়ন করে আমরা তৎকালীন সমাজ ও সমাজব্যবস্থা সম্পর্কে ধারণা লাভ করতে পারি। তবে মহাভারতের প্রধান উপজীব্য যেহেতু একটি যুদ্ধ—আরো স্পষ্ট করে বললে বলতে হয়, পারিবারিক কলহ থেকে সৃষ্ট একটি মহাযুদ্ধ যাতে ভারতবর্ষের বহু রাজা অংশগ্রহণ করেন—এবং যুদ্ধের সাথে যেহেতু সরাসরি রাজনীতি জড়িত, মহাভারত থেকে সবচেয়ে বেশি যেটা আমরা ধারণা লাভ করতে পারি, সেটা বোধ হয় তৎকালীন রাজনীতি।

মহাভারতের রাজনীতি নিয়ে আলোচনার শুরুতেই আমাদের মনে একটা প্রশ্ন জাগতে পারে, এই একবিংশ শতাব্দীতে এসে সেই সময়ের রাজনীতির অধ্যয়ন আমাদেরকে কি কোন ফল দিবে, বা ঐ সময়ের রাজনীতির সাথে আমাদের এই সময়ের রাজনীতির কি আদৌ কোন মিল আছে যা আমাদেরকে বর্তমান সময়ের প্রচলিত গণতান্ত্রিক রাজনীতিকে বুঝতে সাহায্য করবে?

ওপরের প্রশ্নটির উত্তর খুঁজতে গিয়ে প্রথমে আমরা রাজনীতি শব্দটাকে একটু কাটা-ছেড়া করি। বাংলা রাজনীতি শব্দটি একটি সমাসবদ্ধ শব্দ, যার অর্থ রাজার নীতি। রাজনীতির ইংরেজি প্রতিশব্দ পলিটিকস গ্রিক শব্দ ‘polis’ থেকে উদ্ভুত এবং এর অর্থ নগর। ইউরোপের প্রায় সব ভাষাতেই রাজনীতি শব্দটির প্রতিশব্দগুলো এই পলিস শব্দটির কাছাকাছি, যা বাংলা প্রতিশব্দ রাজনীতি মানে রাজার নীতির কাছাকাছিও নয়।

আধুনিক গণতান্ত্রিক দেশে বাস করেও আমরা ভারতীয় উপমহাদেশীয়রা কেন এখনও রাজনীতিতেই পড়ে আছি? কেন শব্দটি পরিবর্তিত হয়ে গণনীতি হচ্ছে না, এমনকি ইংরেজি পলিটিকস শব্দটির মতো নাগরিক-নীতি জাতীয়ও কিছুতে যাচ্ছি না? আমাদের এই প্রবন্ধটিতে আমরা দেখতে পাব, আমাদের বর্তমান রাজনীতিতে আমরা যা দেখি তাতে বাংলা শব্দ রাজনীতিই বোধ হয় সব থেকে কাছাকাছি অর্থ প্রদান করে। আমরা মহাভারতের রাজনীতি অনুসন্ধান করতে গিয়ে আরো দেখবো যে, আমাদের বর্তমান সময়ের গণতান্ত্রিক রাজাদের স্বৈরাচারী কার্যক্রম ঐ সময়কার রাজাদের চেয়ে কোন অংশে কম নয়।

মহাভারতীয় যুগের শাসনব্যবস্থাঃ নয় কেবল রাজতন্ত্র

সাধারণকে চমকে দেবার মতো একটি তথ্য হলো মহাভারতের যুগে কেবল রাজতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থাই প্রচলিত ছিলো না। অনেক অঞ্চলে সংঘরাষ্ট্র নামক এমন একটি শাসনব্যবস্থা প্রচলিত ছিল যেটিকে অনেকটা প্রজাতন্ত্র বা রিপাবলিকও বলা যেতে পারে। মহাভারতের অন্যতম প্রধান চরিত্র কৃষ্ণ এমনই একটি সংঘরাষ্ট্রের প্রধান ছিলেন। যেহেতু এই প্রধান পদের জন্য আলাদা কোন শব্দ ছিলো না বা এখনও নেই, তাই সংঘপ্রধানের পদটিকেও রাজা বলা হতো। সংঘরাষ্ট্রগুলোর বৈশিষ্ট্য হলো, এখানে রাজা এককভাবে কোন সিদ্ধান্ত নিতে পারতেন না, তাঁকে সংঘের সিদ্ধান্তই মেনে নিতে হতো এবং কোন বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে সমস্যা হলে সংঘ প্রতিনিধিদের সংখ্যাগরিষ্ঠতার ভিত্তিতে তা সমাধান করা হতো, যা অনেকটাই গণতান্ত্রিক।

কৃষ্ণ যে যুধিষ্ঠির বা ধৃতরাষ্ট্রের মতো কোন রাজা ছিলেন না, তা কৌটিল্যের অর্থশাস্ত্র থেকেও পাওয়া যায়। অর্থশাস্ত্রে কৌটিল্য কৃষ্ণকে উল্লেখ করেছেন সংঘমূখ্য বলে। কৃষ্ণ কোন্ কোন্ সংঘগুলোর প্রধান ছিলেন, সে বিষয়ে মহাভারতে লেখা হয়েছে এভাবে—“যাদবেরা, কুকুরবংশীয়রা, ভোজেরা এবং সমস্ত অন্ধক-বৃষ্ণি তোমাকে নেতা বলে মানে, তোমাকেই ভালবাসে।“ তবে উপরোল্লিখিত বংশগুলোতে যে অন্য নেতাও ছিলেন না, এমন নয়। কৃষ্ণ একবার নারদের কাছে আক্ষেপ করে বলেছিলেন, “তোমাকে বন্ধু বলে বিশ্বাস করে বলছি নারদ। লোকে বলে আমার এই ক্ষমতা, ওই ক্ষমতা, আসলে কিচ্ছু না। আমি আসলে আমার জ্ঞাতিদের চাকর। ঐশ্বর্যের নামে দাসত্ব করে যাচ্ছি। যা আসছে তার অর্ধেক দিয়ে দিতে হচ্ছে, আর অর্ধেক খাচ্ছি আমি। কিন্তু এতেও রেহাই নেই, দিন রাত কথা শুনতে হচ্ছে এর জন্য এবং সে-সব জঘন্য কথা ক্ষমাও করে দিতে হচ্ছে।“

কৃষ্ণের এই আক্ষেপে এমন ধারণা হয় যে, সে সময়ে কৃষ্ণকে হয়তো সংখ্যাগরিষ্ঠদের সমর্থনে রাজ্যের দেখভাল করতে হচ্ছিল। ফলত আয়ের অর্ধেক দিয়ে দিলেও বাকি অর্ধেকের জন্য বিরুদ্ধ পার্টির কথা শুনতে হচ্ছিল এবং গণতান্ত্রিক ভদ্রতায় তা ক্ষমাও করে দিতে হচ্ছিল।

কৃষ্ণ নারদকে এ বলেই থামছেন না। তিনি তাঁর বড়ভাই বলরাম, ছোট ভাই গদ এবং ছেলে প্রদ্যুম্মের প্রতি ভর্ৎসনামূলক বাক্যে জানাচ্ছেন যে তাঁরা কেউ আছে শরীরচর্চা নিয়ে, কেউ আছে রূপচর্চা নিয়ে, ওদিকে কৃষ্ণকে একাই সবদিক বিবেচনা করে চলতে হচ্ছে। তাঁকে উগ্রসেন ও অক্রুরকে মানিয়ে চলতে হচ্ছে, নইলে তারা যে কোন সময়ে অভ্যুত্থান ঘটিয়ে দিতে পারে। উল্লেখ্য যে, কংসকে হত্যা করে কৃষ্ণই উগ্রসেনকে সেখানকার রাজ্যের ভার দিয়েছিলেন। আবার অক্রুরও কৃষ্ণের আত্মীয় যিনি উগ্রসেনের বংশে থেকেই প্রতাপশালী হয়ে উঠেছিলেন।

কৃষ্ণের আক্ষেপ শুনে নারদ কৃষ্ণকে যে উপদেশ দিয়েছিলেন, সেটা ঐ অঞ্চলে সংঘরাষ্ট্রের ধারণাকে আরো দৃঢ় করে। তিনি বলেছেন, উগ্রসেন ও অক্রুর যা-ই করুক, অন্ধকবৃষ্ণিদের মধ্যে কোনপ্রকার ভেদ তৈরি করা যাবে না। কেননা, নিজেদের মধ্যে ভেদই সংঘের সর্বনাশ ডেকে আনে—ভেদাদ্ বিনাশঃ সংঘানাম্।

মহাভারতের শান্তি পর্বে শরশয্যায় থাকা ভীষ্ম ও যুধিষ্ঠিরের কথোপকথন থেকেও আমাদের এ ধরণের রাষ্ট্রব্যবস্থার পরিচয় মেলে। রাজনীতি সম্পর্কে জ্ঞান নিতে যুধিষ্ঠির গণরাজ্য সম্পর্কে প্রশ্ন করলে ভীষ্ম এভাবে বলেন- “সবচেয়ে সফল গণরাজ্যের ভিত্তি হল জনগণ এবং নেতাদের জাতি-কুল-মানের সমতা।“ তিনি আরো বলেন, “গণরাজ্যের সবচেয়ে বিপজ্জনক জিনিস হল নেতাদের লোভ এবং রাগ। গণরাজ্যে একে অপরকে সবসময় প্যাঁচে ফেলবার চেষ্টা করে বা টেনে নামানোর চেষ্টা করে।“ ভীষ্মের প্রথম বাক্যটিতে জাতি-কুল-মান শব্দগুলো নজর কাড়ার দাবি রাখে। মহাভারতের মতো বর্ণাশ্রমভিত্তিক একটি কাব্যে ভীষ্মের কাছ থেকে এমন ভেদহীন বাক্য আমাদের রাজনীতিকদের মুখের মিষ্টি কথার মতোই মনে হয়। আর নেতাদের লোভ ও রাগ বিষয়ে ভীষ্ম যা বললেন, তা একালের গণতন্ত্রেও খুব প্রকটরূপে দেখতে পাই।

উপরোক্ত তথ্যের ভিত্তিতে আমরা এটা নিশ্চিত হই যে, মহাভারতের সময়কালীন শাসনব্যবস্থায় আধুনিক গণতন্ত্রের ধারণা না থাকলেও রাজতান্ত্রিক শোষণ-শাসনের বাইরে একটি শাসনব্যবস্থা ছিলো। গবেষকরা ধারণা করেন হরপ্পা-মহেঞ্জেদারোতেও এ ধরণের শাসনব্যবস্থা প্রচলিত ছিলো। তবে সেটি আরো একটু বেশিই সাম্যের হতে পারে, কারণ এ দুটি প্রাচীন নগরীতে কোন রাজবাড়ির অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি। শুধু তাই-ই নয়, নগরের প্রতিটা বাড়িই দ্বিতল এবং সমান উচ্চতার। নেই কোন রাজ মন্দির বা রাজ কবরের অস্তিত্বও।

রাজতন্ত্রঃ

মহাভারতের রাজনীতিতে যেহেতু রাজতন্ত্রই প্রধান এবং যে-সকল রাজাদের নিয়ে মূল গল্প প্রবাহমান তাঁদের প্রায় সবাই-ই রাজতন্ত্রের অনুসারী, তাই আমাদের অনুসন্ধান ও মূল আলোচনা হবে তাঁদের রাজনীতিকে ঘিরেই। আলোচনার সুবিধার্থে রাজতন্ত্রের বিভিন্ন বৈশিষ্ট্যকে আমি বিভিন্ন শিরোনামে ভাগ করে নিয়েছি। এজন্য দু’এক ক্ষেত্রে পুনরাবৃত্তিও হয়েছে। তবে সেগুলো প্রাসঙ্গিকভাবেই এসেছে।

রাজার গুণাবলীঃ

পাণ্ডবগণ ইন্দ্রপ্রস্থে তাঁদের রাজধানী গড়ে তোলার কিছু পরে সেখানে নারদ আসেন যুধিষ্ঠিরের সাথে সাক্ষাৎ করতে। তাঁদের দু’জনের কথোপকথনে নারদ রাজাদের ছয়টি গুণের কথা বলেছেন। প্রথম গুণ হলো বাগ্মীতা, মানে ভাল বক্তৃতা করার ক্ষমতা। দ্বিতীয় গুণ প্রগলভতা, যাকে aggressiveness বা boldness বলা যায়। তৃতীয় হলো মেধাবিত্ত বা তর্ক কৌশল। চতুর্থ গুণ- স্মৃতি, মানে স্মরণ ক্ষমতা। বাকি দুটো হলো, নীতি ও কবিত্ব। আমরা এই যুগেও দেখি একজন রাষ্ট্রপ্রধানের মধ্যে ছয়টি না হলেও তিন-চারটি গুণ থাকলেই তিনি একজন ডাকসাইটে রাষ্ট্রপ্রধান হতে পারেন; শেষের দুটো মানে নীতি ও কবিত্ব অবশ্য না হলেও চলে। মহাভারত পাঠে আমরা দেখেছি প্রাচীনকালের রাজাদেরও নীতি ও কবিত্ব খুব একটা প্রয়োজন হতো না। (রাজাদের গুণের এই অংশটি পড়তে গিয়ে আমার শেখ মুজিবের কথা মনে হচ্ছিলো বারবার।)

নারদ ও যুধিষ্ঠিরের কথোপকথনে নারদ যুধিষ্ঠিরকে রাজ্য পরিচালনা বিষয়ক একগাদা প্রশ্ন করেন। প্রশ্নগুলোর বেশিরভাগই ছিলো আরজ আলী মাতুব্বরের ‘সত্যের সন্ধানে’ বইয়ের প্রশ্নগুলোর মতো—প্রশ্নের মধ্যেই তার উত্তর নিহিত। তিনি যুধিষ্ঠিরকে প্রথমেই যে প্রশ্নটি করেন- “আপনি আটটি কাজ ঠিক ঠিক দেখেন তো?” নারদ এখানে যে আটটি কাজের উল্লেখ করেছেন, তা হলো- কৃষি, বানিজ্য, দুর্গ, সেতু নির্মান, হাতি পোষা, খনিজ পদার্থ আহরণ, ট্যাক্স ও অনাবাদী জমিকে আবাদের ব্যবস্থা করা। এখানে সেতু নির্মান বলতে কৃষিতে সেচের জল সরবরাহের জন্য খাল কর্তন ও বাধ নির্মানকে বোঝানো হয়েছে। সেতু নির্মান যে এমনটাই ধারণা দেয় তা নারদের দ্বিতীয় প্রশ্নে বোঝা যায়- “আপনার কৃষিকর্ম তো আবার বৃষ্টিদেবতার ওপর ভরসা করে চলে না?”

নারদের এই প্রশ্নটিতে যে বিষয়টি লক্ষণীয় তা হলো- নারদ এখানে বৃষ্টিদেবতাকে পূজা বা তাঁর উদ্দেশ্য যজ্ঞের আয়োজনকে অপ্রয়োজনীয় মনে করছেন, অথচ আমরা এখনও দেখি পৃথবীর বিভিন্ন দেশে বৃষ্টির জন্য ঈশ্বর বা দেবতাদের উদ্দেশ্যে প্রার্থনা করা হয়।

এবার দেখি ঐতিহাসিকরা রাজা সম্পর্কে কী বলেছেন। মনু বলেছেন—রাজারা হলেন ঈশ্বরের অংশ। মনুর এই বাক্য পড়ে স্বভাবতই প্রশ্ন জাগে, প্রাচীনকালের ভারতীয় জ্ঞানী ব্যক্তিরা কি রাজাকে সত্য সত্যই ঈশ্বরের অংশ মনে করতেন, যেমনটা মধ্যযুগ জুড়ে ইউরোপে মনে করা হতো রাজা ঈশ্বরের প্রতিনিধি? এই প্রশ্নের উত্তর মেলে গীতায়। গীতায় ঈশ্বর সম্পর্কে বলা হয়েছে—ঈশ্বর ক্ষত্রিয়ের সহজাত। আসলে এখানে ঈশ্বর মানে শুধু দেবতা নয়; ঈশ্বরত্ব মানে প্রভুত্ব, ক্ষমতা, তেজ বা লিডারশিপ, যা সেকালে ক্ষত্রিয়মাত্রেরই স্বাভাবিক গুণ ছিলো। সত্যিকারার্থে এই লিডারশিপ ক্ষমতা আমাদের গণতান্ত্রিক নেতাদের মাঝেও আছে বলে আমরা তাদের রাজা মনে করি।

মনু রাজা সম্পর্কে আরো বলেছেন, রাজাদের ক্ষমতা আগুনের চেয়েও বেশি, কারণ—যে মানুষ ভুল করে আগুনে পড়ে, আগুন তাকেই শুধু পোড়ায়, কিন্তু রাজা যদি কারও ওপর ক্ষুব্ধ হন, তাহলে তিনি সেই মানুষের পুত্র-পরিবার, ভাই-বন্ধু সবাইকে তার ক্রোধের আগুনে পোড়ান। রাজা যদি কারো ওপর প্রসন্ন হন—তার অর্থ-সম্পদের উন্নতি হয়।

রাজা সম্পর্কে মনুর উক্তিগুলো নারদের কথার মতো শাস্ত্রীয় নয়, বাস্তবতাকে আশ্রয় করে। এর সত্যতা আমরা মহাভারতেও যেমন দেখতে পাই, পাই এ যুগেও। এ যুগে কাগজে-কলমে কোন রাজা নেই ঠিক, তবে মনু রাজার যে বৈশিষ্ট্য উল্লেখ করেছেন, তাতে আমাদের চারপাশে রাজার অভাব দেখি না। সুতরাং এ প্রশ্ন উঠতেই পারে—আমরা মহাভারতের যুগের কয়েক হাজার বছর পরে এসে কতটা সভ্য হয়েছি? অথবা আমাদের গণতান্ত্রিক নেতারা আসলে কতখানি গণতান্ত্রিক আর কতখানিই বা রাজতান্ত্রিক?

রাজার সিদ্ধান্তগ্রহণঃ

রাজতন্ত্র শব্দটা আমাদের কল্পনা-জগতে একজন একনায়কতান্ত্রিক স্বৈরাচারী রাজার চিত্রই আঁকে। কিন্তু মহাভারতীয় রাজতন্ত্রে খুব কম সিদ্ধান্তই রাজাকে এককভাবে নিতে দেখা যায়। যে কোন সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রেই তাঁরা মন্ত্রী বা পরামর্শকদের ওপরে নির্ভর করতেন। ধৃতরাষ্ট্রের মন্ত্রীসভায় প্রবীণ বিদুর ও ভীষ্ম ছাড়াও ছিলেন দ্রোণাচার্য, কৃপাচার্য, কর্ণ, সঞ্জয়, ইত্যাদি। শারীরিকভাবে অন্ধ ধৃতরাষ্ট্র আসলে পুত্রস্নেহেও অন্ধ ছিলেন, তাই বিদুর বা ভীষ্মের সুপরামর্শ তিনি সবসময় মানতে পারতেন না; নিজের মতোই বা দুর্যোধন যা চায় তেমনটাই সিদ্ধান্ত নিতেন। কিন্তু কোন বিষয়ে তাদের মতামত নিতেন না, এমনটা একবারও দেখা যায় না।

আমরা বাংলাদেশে পুত্রস্নেহে অন্ধ এক প্রধানমন্ত্রীকে দেখেছি। আর ‘আমিই বাংলাদেশ’ টাইপ একজন প্রধানমন্ত্রীও দেখছি এখন। ধৃতরাষ্ট্রের মতো এরাও মন্ত্রী পরিষদের বৈঠক ডাকেন, সেখানে সিদ্ধান্তও পাশ হয়। তবে ধৃতরাষ্ট্রের রাজসভার চেয়েও বাংলাদেশের মন্ত্রীসভার খারাপ দিক হলো, আমাদের মন্ত্রীসভার এজেন্ডায় সেইসব বিষয়ই তোলা হয়, যা আগে থাকতে নেত্রীদের সবুজ সংকেত পায়।

মহাভারতে যুধিষ্ঠিরের রাজসভায় কোন মন্ত্রীর উল্লেখ পাওয়া যায় না; তাঁর মন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন কৃষ্ণ। কৃষ্ণের পরামর্শ ব্যতিত যুধিষ্ঠিরকে কোন বৃহৎ সিদ্ধান্তই নিতে দেখা যায় না। কেবল একটিমাত্র সিদ্ধান্তই তিনি এককভাবে নিয়েছিলেন—হস্তিনাপুরে পাশা খেলতে যাওয়া—যা তাঁর জীবনে সবচেয়ে বড় বিপর্যয় ডেকে আনে। কৃষ্ণ যে যুধিষ্ঠিরের মন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করতেন তা আরো সুস্পষ্ট হয়, কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধের প্রাক্কালে দূত হিসেবে তাঁর হস্তিনাপুরে গমন। ধৃতরাষ্ট্রের বেলায় দূতের দায়িত্ব পালন করতে দেখি তাঁর মন্ত্রীসভার সদস্য বিদুর, ভীষ্ম বা সঞ্জয়কে, কিন্তু যুধিষ্ঠিরের বৃহৎ পরিসরে কেবল কৃষ্ণই এই দায়িত্ব পালন করেন। এখানে আরেকটি বিষয় উল্লেখ করা প্রয়োজন- সেকালে এক রাজ্যের রাজা হয়েও আরেক রাজ্যের সেনাপতি বা মন্ত্রী হওয়া খুব স্বাভাবিক ব্যাপার ছিলো। মগধের রাজা জরাসন্ধের সেনাপতি ছিলেন শিশুপাল, যিনি আবার আরেক রাজ্যের রাজাও।

রাজাদের সিদ্ধান্তগ্রহণ বিষয়ে নারদ যুধিষ্ঠিরকে যে প্রশ্ন করেছিলেন- “আপনি কোন সিদ্ধান্ত একাই নেন না তো বা অনেক লোকের সঙ্গে আলোচনায় বসেন না তো?” নারদের এই প্রশ্নটির মাধ্যমে রাজার সিদ্ধান্তগ্রহণে তখনকার রাজাদের শাস্ত্রীয় নিয়ম বোঝা যায়। তবে একালের গণতান্ত্রিক স্বৈরশাসকরা যেমন সংবিধানের ধার ধারেন না, তখনকার রাজতন্ত্রের রাজারাও শাস্ত্রের ধার ধারতেন না। মহাভারতে এ বিষয়ে ব্যতিক্রম ছিলো সংঘরাষ্ট্রগুলো। তবে সেখানেও যে দু’একজন স্বৈরশাসকে পরিণত হয়ে যেতেন তা বলার অপেক্ষা রাখে না। রাজা কংস তার উল্লেখযোগ্য উদাহরণ। আমাদের এ কালে কংসের উদাহরণ আছে ভুড়ি ভুড়ি।

অভ্যন্তরীণ সমস্যা নিরূপন, দণ্ড প্রদান, ইত্যাদিঃ

একালের গণতান্ত্রিক সরকারগুলোর মতো প্রাচীনকালের রাজারাও অভ্যন্তরীণ সমস্যা নিরূপনে চরদের ওপর খুব বেশি নির্ভরশীল ছিলেন। প্রধানমন্ত্রী, পুরোহিত এবং যুবরাজ, এই তিনজন বাদে রাজা সবাইকেই সন্দেহ করতেন। মন্ত্রীরা ঠিকমতো কাজ করছে কিনা কিংবা কোন চক্রান্ত করছে কিনা তার জন্য প্রতিটা মন্ত্রী এবং আমাত্যের ওপরে তিনজন করে চর নিয়োগ করা হতো, যারা একে অপরকে চিনতেন না।

লোভী ও দুর্নীতিপরায়ন মন্ত্রীরা যে রাজ্য পরিচালনায় সমস্যা তৈরি করে সেটা নারদের প্রশ্ন থেকেও উল্লেখ পাই। যুধিষ্ঠিরের কাছে নারদ জানতে চান তাঁর মন্ত্রী-পুরোহিতরা লোভী কিনা; স্বরাষ্ট্রমন্ত্রক ও অর্থমন্ত্রক পদে বিদ্যাবুদ্ধিতে প্রবীণ লোককে নিয়োগ করা হয়েছে কিনা। আমাদের এ সময়কার মন্ত্রীদের লোভ বিষয়ে অবগত থাকলে নারদ হয়তো উল্টোই জানতে চাইতেন তাঁর মন্ত্রীসভায় অলোভী কোন মন্ত্রী আছে কিনা। [স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও অর্থমন্ত্রী বিষয়ে নারদ যা জানতে চাইলেন তাতে আপনাদের নিশ্চয়ই বাংলাদেশের গত কয়েক সরকারের অথর্ব স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীদের ও বর্তমান সময়ের ‘রাবিশ’ অর্থমন্ত্রীকে মনে করিয়ে দিয়েছে।]

নারদ যুধিষ্ঠিরকে হৃষ্ট, বীর, ধৈর্যশালী ও রাজার প্রতি অনুরক্ত একজন মানুষকে সেনাপতি নিয়োগ করতে অনুরোধ করেন। সৈন্যদের বেতন-ভাতা সময়মত দেয় কিনা তাও জানতে চান। সেনাবাহিনী ও রাজকর্মচারীদের সন্তুষ্ট রাখা বিষয়ে নারদ এরপরে যে কথাটা বলেছেন, তা তৃতীয় বিশ্বের প্রায় প্রতিটি রাষ্ট্র প্রধানের জন্য অনুসরণীয়—তাদের বেতন ভাতা প্রাপ্য সময়ে না দিলে নিজের দুর্গতি হেতু প্রভুর ওপরেই ক্ষেপে যায় এবং তাতে যা অনর্থ সৃষ্টি হয়, সে অনর্থ বড় সাংঘাতিক।

সেকালের অনেক রাজাদের দণ্ড প্রথা খুব কঠোর হলেও উগ্র দণ্ডপ্রদানকে রাজার একটি খারাপ দিক বলে বিবেচিত হতো। নারদ বলেছেন–উগ্রদণ্ড রাজাকে প্রজারা অবজ্ঞা করে, ঘৃণা করে। ঠিক যেমন ঘরের বউ গরম মেজাজের কামুক স্বামীকে ঘৃণা করে সেরকম। নারদের এই কথাটির একটি গুঢ় অর্থ আছে। সেকালে বউয়েরা স্বামীর কাছ থেকে বিবাহ-বিচ্ছেদ নিতে পারতো না; স্বামী যত উগ্রই হোক, স্ত্রীকে ঐ স্বামীর কাছেই থাকতে হতো। তেমনি রাজা উগ্র হলেও অসন্তোষ নিয়ে প্রজাদের ঐ রাজ্যেই বাস করতে হতো। এ কালেও যে এটার খুব একটা পরিবর্তন হয়েছে আমরা তা দেখতে পাই না। গণতান্ত্রিক স্বৈরাচারের হাত থেকে বাঁচতে অনেকে হয়তো অন্য দেশে পাড়ি জমান, তবে সেখানে তাদের এক উদ্বাস্তু জীবন-যাপন করতে হয়, যা একজন গণতান্ত্রিক দেশের নাগরিকের প্রাপ্য নয় নিশ্চয়ই।

নারদের আরেকটি প্রশ্ন দিয়ে আভ্যন্তরীণ সমস্যা নিরূপণ বিষয়টি শেষ করবো। নারদ বলেন, “হে নরশ্রেষ্ঠ, যে বদমাশ চুরি করেছে, কিংবা বমালসমেত ধরা পড়েছে, তাকে তোমার লোকেরা ঘুষের লোভে ছেড়ে দেয় না তো?” ঘুষ বিষয়ক এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে এবং মহাভারতের রাজতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থার সাথে বর্তমানের গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থায় তার তুল্য বিচার করলে আমরা যে চিত্র পাব, তাতে কোনটার পাল্লা বেশি ভারি হবে, তা আপনাদেরকে বলতে হবে না নিশ্চয়ই।

রাজনৈতিক কুটকৌশলঃ

বর্তমান যুগের মতো মহাভারতীয় রাজনীতিতেও প্রতিপক্ষ বা শত্রু দমনে কুটকৌশলের প্রয়োগ দেখা যায় বিস্তর। ন্যায়-অন্যায় বিবেচনাবোধের বাইরে গিয়ে শত্রুকে বিনাশ বা তাকে যুদ্ধে হারানোর জন্য কৌশলের আশ্রয় নিতে দেখা যায় প্রায় সব রাজাকেই।

পাণ্ডবরা যখন দ্রোণাচার্যের কাছে অস্ত্রপরীক্ষায় ভাল ফল করলেন, বিশেষ করে অর্জুন যখন তাঁর অস্ত্র কৌশলে সবাইকে তাক লাগিয়ে দিলেন, এমনকি গুরুদক্ষিণা হিসেবে দ্রুপদের রাজাকেই জীবিত বেঁধে আনলেন, তখন পাণ্ডবদের ওপর রাজা ধৃতরাষ্ট্রের মন বিষিয়ে উঠলো। তিনি বুঝতে পারলেন তাঁর নিজের পুত্রদের জন্য সিংহাসন নিষ্কণ্টক থাকছে না আর, পাণ্ডবরা তাঁদের বাবার সিংহাসনের দাবি করার যোগ্যতা অর্জন করে ফেলেছে। তিনি কণিককে ডাকলেন উপদেশ নেয়ার জন্য। কণিক ধৃতরাষ্ট্রকে উপদেশ দিলেন পাণ্ডবদের সবাইকে শেষ করে দিতে। ধৃতরাষ্ট্র এতে মনঃস্থির করতে পারছেন না দেখে দুর্যোধন তাঁকে অনুরোধ করলেন তিনি যেন কায়দা করে পাণ্ডুর ছেলেদের একবার বারণাবতে পাঠিয়ে দেন। ধৃতরাষ্ট্র তাতেও রাজী হলেন না; তিনি উল্টো দুর্যোধনকে বুঝালেন যে, যুধিষ্ঠির বেশ ধর্মপরায়ণ এবং মানুষ তাকে ভালবাসে। উপরন্তু রাজা থাকাকালীন পাণ্ডুর রাজসভায় যারা মন্ত্রী-সেনাপতি ছিলেন এবং যে-সকল সাধারণ মানুষ তাঁর দ্বারা উপকৃত হয়েছেন, পাণ্ডবদের নির্বাসন দিলে তাঁরাও ক্ষেপে যাবেন এবং উল্টো ধৃতরাষ্ট্রকেই তখন সবান্ধবে হত্যা করা হতে পারে।

দুর্যোধনের কাছে এর উত্তরও ছিলো। তিনি বললেন, ঐসব মন্ত্রী, আমাত্য, জনগণ হাতে আনতে তাঁর মাত্র দু’দিন দরকার। তাঁর হাতে রাজকোষ আছে; অর্থ বিলালে সবাই তাঁর অনুগত হয়ে যাবে। সত্যিই তাই হলো। দুর্যোধনের টাকা খেয়ে পাণ্ডবদের পক্ষে যেসব আমাত্য ছিলেন, তারাই পাণ্ডবদের সামনে বারবার বলতে লাগলেন—আঃ বারাণবতের মতো অমন সুন্দর জায়গা আর হয় না, তার ওপরে আবার সেখানে পশুপতির মেলা বসেছে—যা জমবে না! এতে পাণ্ডবরা নিজেরাই উৎসাহিত হয়ে বারাণবতে চলে গেলেন। আর সেখানে দুর্যোধন তাঁদের জতুগৃহে পোড়ানোর ব্যবস্থা আগেই করে রেখেছিলেন।

মহাভারতে এমন কৌশলে ফায়দা তুলতে দেখা যায় অনেককেই। দ্রৌপদীর স্বয়ংবর সভায় তাঁর বাবা রাজা দ্রুপদ যে মৎসচক্ষু ভেদ করার শর্তটা জুড়ে দিয়েছিলেন, তা করেছিলেন একমাত্র অর্জুনকে মাথায় রেখেই। তিনি জানতেন যে অর্জুন ছাড়া এটি আর কেউ ভেদ করতে পারবেন না। (কর্ণ সেটি ভেদ করতে পারতেন বটে, তবে সেখানে দ্রৌপদী নিজেই আপত্তি জানান যে, তিনি সূতজাতীয় কাউকে বিয়ে করবেন না।) অর্জুন সে লক্ষ্য ভেদ করলেন এবং দ্রৌপদীকে লাভ করলেন। এই অর্জুনই কিন্তু দ্রুপদ রাজার রাজ্য পাঞ্চালের অর্ধেক দখল করে নিয়ে গুরু দ্রোণাচার্যকে গুরুদক্ষিণা দিয়েছিলেন। যেহেতু অর্জুনের কাছে সেটা ছিলো কেবল গুরুর আদেশ মান্য করা, তাই পাঞ্চাল রাজের রাগ ছিলো দ্রোনাচার্যের ওপরে। অর্জুন বা পাণ্ডবদের সাথে দ্রৌপদীর বিয়ে একদিকে পাঞ্চাল রাজের ক্ষমতা বৃদ্ধি করে, আরেকদিকে তাঁদের গুরু দ্রোণাচার্যের ক্ষমতা হ্রাস পায়। এই বিয়ের ফলে পাণ্ডবরাও, যারা জতুগৃহ থেকে বেঁচে পালিয়ে বেড়াচ্ছিলেন, পেয়ে যান এক মিত্র। আর এই মিত্র কেবল রাজা দ্রুপদেই সীমাবদ্ধ ছিলো না, এই বিয়েতেই পাণ্ডবদের সাথে দেখা হয় কৃষ্ণ-বলরামদের, যারা পাণ্ডবদের আত্মীয় হলেও এতোদিন দেখা সাক্ষাৎ হয়নি এবং একে অপরকে চিনতেনও না।

মহাভারতে কুটকৌশল প্রয়োগে সবচেয়ে এগিয়ে আছেন কৃষ্ণ। কী রাজনীতিতে, কী যুদ্ধের মাঠে সবখানেই তিনি এদিক দিয়ে এগিয়ে। অপরকে মন্ত্রণা দিয়ে কী করে নিজের কাজ আদায় করে নিতে হয়, তার অন্যতম উদাহরণ ভীম কর্তৃক কৃষ্ণের শত্রু মগধের রাজা জরাসন্ধকে হত্যা।

দ্রৌপদীকে বিয়ে করার পরে পাণ্ডবরা হস্তিনাপুরে ফিরে আসলে ধৃতরাষ্ট্র তাদেরকে অর্ধেক রাজ্য ফিরিয়ে দিতে বাধ্য হন। তবে সেটা দেন তিনি হস্তিনাপুর থেকে অনেক দূরে বনসমৃদ্ধ খাণ্ডবপ্রস্থে। যুধিষ্ঠির বন পুড়ে সেখানে নতুন রাজধানী গড়ে তোলেন এবং নাম দেন ইন্দ্রপ্রস্থ। নারদ ইন্দ্রপ্রস্থে এসে যুধিষ্ঠিরকে রাজনীতি বিষয়ে সম্যক জ্ঞান প্রদান করার পরে তাঁকে রাজসূয় যজ্ঞের আয়োজন করার অনুরোধ করেন, যার উদ্দেশ্য ছিল মূলত যুধিষ্ঠিরের সম্পদ ও মিত্র বৃদ্ধি। যুধিষ্ঠির নারদের কথায় সাথে সাথেই রাজি হন না, তিনি কৃষ্ণের পরামর্শের জন্য তাঁকে ইন্দ্রপ্রস্থে ডেকে পাঠান। কৃষ্ণ এ যজ্ঞের ব্যাপারে বলেন যে, মগধের রাজা জরাসন্ধকে না হারিয়ে যুধিষ্ঠির কোনভাবেই অন্য রাজাদের মিত্রতা পাবেন না, কারণ ভারতবর্ষের বেশিরভাগ রাজাই জরাসন্ধের সাথে সন্ধি করে চলে। এক্ষেত্রে তিনি উদাহরণ হিসেবে দেখান তাঁর নিজেরই দুই পিসতুতো ভাইকে। এদের একজন জরাসন্ধের সেনাপতি শিশুপাল যার রাজ্য মগধ থেকে অনেক দূরে এবং আরেকজন দন্তবক্র। এমনকি কৃষ্ণের শ্বশুর ভীষ্মকও—যিনি কিনা তাঁর স্ত্রী রুক্ষ্মীনীর পিতা—জরাসন্ধের অনুগত।

এখানে উল্লেখ্য যে কৃষ্ণের মামা কংস ছিলেন জরাসন্ধের জামাতা। কংসের স্ত্রীদের মধ্যে দু’জন ছিলেন জরাসন্ধের কন্যা। কৃষ্ণ কংসকে বধ করার পরে জরাসন্ধের দুই মেয়ে তাদের বাবার কাছে গিয়ে তাদের স্বামী হত্যার প্রতিশোধ চান। জরাসন্ধ এরপরে বারবার করে আঠারবার মথুরা আক্রমণ করেন এবং কৃষ্ণকে মথুরা ছাড়া করেন। কৃষ্ণ নিজেই বলেছেন যে, জরাসন্ধের হাত থেকে নিজে এবং আত্মীয়-স্বজনকে রক্ষা করার জন্যই তিনিই দ্বারকায় পালিয়ে গিয়েছিলেন।

যুধিষ্ঠিরকে কৃষ্ণ আরো বোঝাতে চাইলেন যে, জরাসন্ধকে সৈন্য-সামন্ত দিয়ে যুদ্ধ করে পরাস্ত করা যাবে না, আবার তাকে পরাস্ত করা না গেলে রাজসূয় যজ্ঞ দিয়েও কোন ফলপ্রাপ্তি হবে না। যুধিষ্ঠির মুষঢ়ে গেলেন। তিনি এতোদিন ধরে শত্রু বলতে কেবল দুর্যোধনদেরকেই বুঝতেন, এবার দেখলেন যে, তার চেয়েও বড় শত্রু জরাসন্ধ। তিনি যজ্ঞই করবেন না বলে মনস্থির করলেন। কৃষ্ণ তখন যুধিষ্ঠিরকে এটা বোঝালেন যে, জরাসন্ধ এতো অন্যায় ও পাপ করেছেন যে তিনি ন্যায় যুদ্ধ ডিজার্ভ করেন না। তিনি বললেন, আমরা ছদ্মবেশে মগধরাজ্যে প্রবেশ করে জরাসন্ধের কাছাকাছি যাব এবং যখনই তাঁকে একাকী পাব তখন হত্যা করবো। যুধিষ্ঠির এতে রাজী হলেন না। তখন কৃষ্ণ বললেন, আমরা জরাসন্ধকে ভীমের সাথে মল্লযুদ্ধে আহবান জানাবো। জরাসন্ধ নিজে যেহেতু এখন অনেক বৃদ্ধ, ভীমের সাথে পেরে উঠবেন না। যুধিষ্ঠির এতে রাজী হলেন। অতঃপর কৃষ্ণ, অর্জুন ও ভীম ছদ্মবেশে মগধে প্রবেশ করে কোন এক ব্রতে উপবাসরত জরাসন্ধকে মল্লযুদ্ধে আহবান করে তাকে হত্যা করলেন। সেই সাথে অন্য রাজারা যারা জরাসন্ধের কারাগারে বন্দী ছিলেন তাদেরও মুক্তি দিলেন।

এখানে আমরা দেখতে পাই কৃষ্ণ শত্রুদমনের জন্য বেশ অন্যায় কৌশল অবলম্বন করেছেন। যুধিষ্ঠিরের রাজসূয় যজ্ঞ উপলক্ষ্যে ভীমকে দিয়ে নিজের শত্রু দমনের এই সুযোগটা তিনি হাতছাড়া করতে চাননি বলেই যুধিষ্ঠিরকে কলে-কৌশলে রাজী করিয়ে নিয়েছিলেন।

দুর্যোধনের মন্ত্রণায় যুধিষ্ঠিরকে পাশা খেলায় ডেকে ধুরন্দর শকুনীর মাধ্যমে কৌশলে পাণ্ডবদের রাজ্য, অর্থ এমনকি স্ত্রী পর্যন্ত জয় করার বিষয়টি তো সর্বজনবিদিত।

এই যে কৌশলে রাজনৈতিক ফায়দা তোলা, এটা এখনকার রাজনীতিতেও বেশ বহাল তবিয়তে আছে। বিরোধীদলকে বা রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে কাহিল করতে বা অন্যকে ফুসলিয়ে নিজের সুবিধা আদায় করতে বর্তমান রাজনীতিকরাও খুব ধুরন্ধর, হয় তো মহাভারতের রাজাদের চেয়ে আরো বেশি ধুরন্ধর।

মহাভারতীয় কূটনীতি তথা পররাষ্ট্রনীতিঃ

মহাভারতের মূল কাহিনীটি যুদ্ধনির্ভর হলেও কিংবা আরো অনেক যুদ্ধের উল্লেখ থাকলেও মহাভারতীয় রাজনীতিতে তথা প্রাচীন রাজনীতিজ্ঞদের কাছে যুদ্ধ ছিল একান্ত বর্জনীয়। যুদ্ধের চেয়ে কূটনীতিকেই প্রাধান্য দেয়া হতো বেশি। তখনকার শাস্ত্রকাররা দুই রাষ্ট্রের বিরোধ মিটানোর জন্য মূলত চারটি অঙ্গকে নির্ধারণ করেছিলেন- সাম, দান, ভেদ এবং দণ্ড। সাম মানে মধুর বাক্যে আলোচনার মাধ্যমে শত্রুর সঙ্গে বিবাদ মিটানো। সামে কাজ না হলে দান, অর্থাৎ খানিকটা ছাড় দেয়া। দানে কাজ না হলে শত্রুরাষ্ট্রে ভেদ তৈরি করতে হবে—রাজার সঙ্গে মন্ত্রীর, সেনাপতির সঙ্গে রাজার, মন্ত্রীর সঙ্গে মন্ত্রীর, প্রজাদের মধ্যে রাজার সম্বন্ধে মিথ্যে গুজব ছড়ানো, ইত্যাদি; এর মধ্যে স্যাবোটেজও অন্তর্ভুক্ত। এই তিনটের কোনটিই কাজ না হলে দণ্ড অর্থাৎ আক্রমণ—সাম-দান-ভেদের প্রক্রিয়া চলাকালীন সময়ের মধ্যেই শত্রুরাজ্যে আক্রমণ করা।

ভীষ্ম তাঁর উপদেশে যুধিষ্ঠিরকে এ ব্যাপারে বলেন, “যদি সাম ও দানের মাধ্যমে শত্রুকে জয় করতে পারা যায়, সেই জয়ই হলো শ্রেষ্ঠ জয়। ভেদনীতিতে যে জয় আসে, সেটা মধ্যম মানের জয়। আর যুদ্ধের মাধ্যমে যে বিজয় লাভ ঘটে, তার চেয়ে জঘন্য কিছু নেই।“

মহাভারতে আমরা সাম ও দানের প্রয়োগ অহরহই দেখতে পাই। বিয়ের মাধ্যমে আত্মীয়তার সম্পর্ক স্থাপন করে শত্রুতাকে দূরে রাখার প্রচেষ্টা কৃষ্ণ নিজেও করেছিলেন। বিদর্ভের রাজা ভীষ্মকের কন্যা রুক্ষিনীকে বিয়ে করার মধ্যে ছিলো তাঁর মিত্রতা বাড়ানোর রাজনৈতিক অভিসন্ধি, যদিও তাঁর সে অভিসন্ধি বাস্তবায়িত হয়নি। ভীষ্মক বেশ বড় বীর হলেও কৃষ্ণের শত্রু মগধের রাজা জরাসন্ধের অনুগত ছিলেন। কৃষ্ণের মতো বিয়ের মাধ্যমে মিত্রতা বাড়ানোর প্রচেষ্টা আমরা বর্তমানে দেখতে পাই আওয়ামী লীগ-বিএনপির নেতাদের ছেলে-মেয়েদের বিয়ের খবরে।

শত্রুতা এড়াতে দান মানে কিছুটা ছাড় দেয়ার ব্যবহার আমরা দেখতেই পাই হস্তিনাপুরের রাজনীতিতেই। বারণাবতে জতুগৃহে পোড়ার হাত থেকে বেঁচে গিয়ে দীর্ঘদিন পালিয়ে থাকার পরে পাণ্ডবরা যখন পাঞ্চাল কন্যা দ্রোপদীকে বিয়ে করে ও কৃষ্ণ-বলরামের মিত্র হয়ে হস্তিনাপুরে ফেরত আসেন, তখন ধৃতরাষ্ট্র তাদেরকে যে অর্ধেক রাজ্য ফিরিয়ে দেন, তা মূলত যুদ্ধ এড়াতেই।

যুদ্ধের প্রতি যুধিষ্ঠিরের বিমূখতা সর্বজনবিদিত। পাশা খেলায় তাঁর হার ও তৎপরবর্তী দুঃশাসনাদি কর্তৃক দ্রৌপদীর যৌন লাঞ্চনার স্বীকার হওয়া থেকে হস্তিনাপুরে যে পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছিলো, যুধিষ্ঠির ভিন্ন অন্য কেউ রাজা হলে তখনই যুদ্ধ বেধে যাওয়ার সম্ভাবনা ছিলো। বনবাসের বছরগুলিতে দ্রোপদীর ক্রমাগত ভৎর্সনা কিংবা ভাইদের বক্রোক্তিও তাঁকে এতটুকু বিচলিত করে না। এমনকি যুদ্ধ বিষয়ে কৃষ্ণের উৎসাহ প্রদানও তাঁকে সেভাবে নাড়াতে পারে না। কৃষ্ণও অবশ্য যুদ্ধের প্রাক্কালে শান্তির বার্তা নিয়ে হস্তিনাপুরে গিয়েছিলেন। তখন পাণ্ডবদের দাবি ছিলো মাত্র পাঁচটি গ্রাম; তাঁদের রাজধানী ইন্দ্রপ্রস্থকেও তারা ছাড় দিতে চেয়েছিলেন। কৃষ্ণ ব্যর্থ হয়েছিলেন। দুর্যোধন তখন বিনা যুদ্ধে সূচাগ্র পরিমাণ ভূমিও দিতে অস্বীকার করেছিলেন। অর্জুনের মত বীরও কুরুক্ষেত্রের ময়দানে সৈন্য সমাগমের পরে যুদ্ধের ভয়াবহ পরিণতি ভেবে থমকে যান।

মহাভারতীয় যুগের রাষ্ট্রদূতঃ

মহাভারতীয় যুগের দূতেরা সাধারণ কোন দূত ছিলেন না। তারা কেবল রাজার সিদ্ধান্তকেই অপরপক্ষকে জানাতেন না; নিজস্ব বুদ্ধিবলে নিয়োগকর্তা রাজার কাঙ্খিত লক্ষ্যকেও বাস্তবায়ন করার চেষ্টা করতেন। পররাষ্ট্রের সঙ্গে সন্ধি হবে নাকি যুদ্ধ হবে, তা খুব বেশিভাবে নির্ভর করতো দূতের ওপর। এ বিষয়ে মনু লিখেছেন- দূতে সন্ধি বিপর্যয়ৌ।

দু’একটা উদাহরণ দেয়া যাক। পাণ্ডবরা বনবাস ও অজ্ঞাতবাস থেকে ফেরার পরে যুধিষ্ঠিরের পক্ষ হয়ে পাঞ্চাল রাজ হস্তিনাপুরে যে দূত প্রেরণ করেন, তিনি ভীষ্ম-দ্রোণ, ইত্যাদি ব্যক্তিত্বের সামনে যেভাবে বক্তব্য নিবেদন করলেন, তাতে পাণ্ডবদের শান্তিকামিতা ও সন্ধিকামিতার সঙ্গে তাঁদের শক্তি-সামর্থ প্রদর্শনের বিষয়টাও যুক্ত ছিলো। তাঁর উপস্থাপন এতোটাই তীক্ষ্ণ ছিলো যে, মহামতি ভীষ্মও রেগে গিয়ে বলেছিলেন, “পাণ্ডবদের প্রতি বঞ্চনা এবং অন্যান্য সমস্ত বিষয়ে আপনার কথা একটু বেশি রকমের তীক্ষ্ণ এবং সেটা হয়তো আপনি ব্রাহ্মণ বলেই।“ একইভাবে সঞ্জয় যখন ধৃতরাষ্ট্রের দূত হয়ে পাণ্ডবদের কাছে গেলেন, তখন তিনিও ভীষ্ম, দ্রোণ, কর্ণ, দুর্যোধনাদির বীরত্বের কথা তুলে পাণ্ডবদের মধ্যে ভয় ধরিয়ে দিতে চাইলেন এবং তাদের সাথে যুদ্ধ না করার পরামর্শ প্রদান করলেন।

দূতদের ক্ষমতার ব্যাপারে আরেকটি বিষয় উল্লেখযোগ্য- সঞ্জয় পাণ্ডবদের সাথে আলোচনা করে যখন হস্তিনাপুরে ফিরে যান তখন ধৃতরাষ্ট্র জানতে চান যে, পাণ্ডবদের সাথে তাঁর কী কথা হলো। কিন্তু সঞ্জয় বলে দেন যে, তিনি এখন জানাতে পারবেন না, পরেরদিন রাজসভায় বলবেন। ধৃতরাষ্ট্র চাইলেই সঞ্জয়কে খবরটি বলায় বাধ্য করাতে পারতেন, কিন্তু তিনি তা করলেন না। এমনকি খারাপ খবরের আশংকায় তিনি যখন রাতে ঘুমাতে পারলেন না, তখনও তাঁকে ডাকলেন না। তিনি বরং বিদুরকে ডেকে আলোচনা করলেন কী খবর আসতে পারে তা নিয়ে। একালের কোন রাষ্ট্রদূত আমাদের গণতান্ত্রিক রাজা বা রাণীকে এমন মুখের ওপর না করে দিলে বা তাঁকে সারারাত নির্ঘুম রাখলে তাঁর চাকরিটা পরদিনই নাই হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা প্রায় একশতভাগ।

যুদ্ধের নিয়মনীতিঃ

মহাভারতীয় যুদ্ধের বেশ কিছু নিয়ম-কানুন ছিলো যা লঙ্ঘন করা অন্যায় ও পাপ বলে মনে করা হতো। তবে যোদ্ধারা যে তা লঙ্ঘন করতেন না, এমন না। কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধে কৌরব পক্ষের প্রায় সকল বড় বীরকেই বধ করা হয় কৌশলে, কিছুক্ষেত্রে সেটাকে অন্যায়ও বলা চলে। ভীষ্মের স্বেচ্ছামৃত্যু বর ছিলো, কিন্তু তাঁকে অস্ত্র ছাড়তে বাধ্য করা হয় তাঁর অস্ত্রের সামনে শিখণ্ডীকে দাঁড় করিয়ে। ভীষ্মের একটা পণ ছিলো যে, তিনি কোন নারীর সাথে যুদ্ধ করবেন না; যদি কোন নারী তাঁর সাথে যুদ্ধ করতে আসেন, তবে তিনি অস্ত্র সংবরণ করবেন এবং আর কোনদিন অস্ত্র ধরবেন না। কৃষ্ণ এটিই কাজে লাগালেন। শিখণ্ডী প্রথম জীবনে নারী ছিলেন এবং পরে পুরুষে পরিণত হয়ে যান। কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধের দশম দিনে কৃষ্ণ যুধিষ্ঠির-অর্জুনকে বুঝিয়ে শিখণ্ডীকে সামনে নিয়ে অর্জুনকে ভীষ্মের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে বললেন। এটা দেখে ভীষ্ম অস্ত্র সংবরণ করলেন। শরাঘাতে শরাঘাতে তিনি একসময় শয্যাশায়ী হলেন, কিন্তু আর অস্ত্র ধরলেন না।

যুদ্ধের ত্রয়োদশ দিনে কর্ণ, দ্রোন, দুর্যোধনাদি কর্তৃক অর্জুন-পুত্র অভিমুন্যকেও বধ করা হয়েছিলো অন্যায় যুদ্ধে। অভিমুন্যের সাথে মোট ছ’জন বীর একসাথে যুদ্ধ করেছিলেন এবং কর্ণ তাঁর পিছন থেকে তীর ছুড়ে তাঁর ধনুক কেটে ফেলেন, যা যুদ্ধের নীতি অনুযায়ী সিদ্ধ ছিলো না। যুদ্ধের চতুর্দশ দিনে অর্জুন জয়দ্রথকে হত্যার যে শপথ নিয়েছিলেন, তা রক্ষার্থে কৃষ্ণের সূর্যকে আড়াল করা প্রতারণা বৈ কিছুই নয়। কৃষ্ণ সূর্যকে সত্যিই আড়াল করেছিলেন কিনা বা এমনটা করা যায় কিনা, আমরা সে প্রশ্নে যাব না, কিন্তু কাহিনী অনুযায়ী তিনি যে ছলনার আশ্রয় নিয়েছিলেন, তা স্বীকার করতেই হবে।

দ্রোণাচার্য হত্যায়ও আমরা দেখি কৃষ্ণ যুধিষ্ঠিরকে দিয়ে মিথ্যা বলাতে রাজি করান। অশ্বত্থমা নামে এক হাতির মৃত্যুকে যুধিষ্ঠির এমনভাবে দ্রোণাচার্যের কাছে গিয়ে বলেন যেন দ্রোণ ভাবেন যে, তাঁর পুত্র অশ্বত্থমাই মারা গিয়েছেন। যুধিষ্ঠির আস্তে করে ‘ইতি গজঃ’ বলে নিজেকে প্রবোধ দেন বটে, তবে তা যে ধর্মীয় দৃষ্টিতে পাপ ছিলো এবং যুদ্ধনীতিতে অন্যায় ছিলো, তা তিনি বুঝতে পারছিলেন। কিন্তু কৃষ্ণের কাছে যুদ্ধে বিজয়ই মূখ্য ছিলো। ভীম কর্তৃক দুর্যোধনের উরু ভাঙতেও কৃষ্ণের প্ররোচণা দেখা যায়।

কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধে সবচেয়ে নিকৃষ্ট কাজটি করতে দেখি দ্রোণাচার্য পুত্র অশ্বত্থমাকে। যুদ্ধ শেষ হয়ে যাওয়ার পরে তিনি পাণ্ডব শিবিরে ঢুকে ধৃষ্টদুম্নকে হত্যা করেন এবং একে একে দ্রৌপদির সকল পুত্র ও অন্যান্য যারা ঐ সময়ে শিবিরে ছিলেন তাদের বিনাশ করেন, যারা প্রায় সবাই-ই ছিলেন নিরস্ত্র এবং নিদ্রামগ্ন।

এতোকিছুর পরেও কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধে যে সকল মানবিক বিষয়গুলো আমাদের নজর কাড়ে তার তালিকাটাও মন্দ নয়। সাধারণ মানুষ যাতে যুদ্ধে ক্ষতিগ্রস্থ না হয়, তাই যুদ্ধের জন্য নির্দিষ্ট স্থান নির্ধারণ। নারী ও শিশুকে যুদ্ধ থেকে দূরে রাখা। রাত্রীকালীন যুদ্ধবিরতি। যুদ্ধবিরতিকালীন সময়ে এক শিবির থেকে আরেক শিবিরে নির্বিঘ্ন যাতায়ত। আমাদের বর্তমান সময়ের যুদ্ধগুলোতে যে হাজার হাজার নিরীহ মানুষকে হত্যা করা হয়, তার ছিটেফোঁটাও দেখা যায় না কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধে।

বিবিধঃ

রাজনীতির শত্রুমিত্রঃ শান্তি পর্বে ভীষ্ম যুধিষ্ঠিরকে এ বিষয়ে যে কথাগুলো বলেছিলেন, তা বোধ হয় সর্বকালের জন্য প্রযোজ্য। রাজনীতিতে চিরকালের শত্রু বা জাতশত্রু বলে যেমন কিছু থাকে না, তেমনই চিরকালের বন্ধু বলেও কিছু হয় না। একজন রাজার সামর্থ্য, তেজ যে-রকম, তার নিরিখেই অন্য রাজার সিদ্ধান্ত তৈরি হয় যে, তিনি পূর্বোক্ত রাজার শত্রু হবেন, না বন্ধু হবেন। পাঞ্চাল রাজের অর্ধেক রাজ্য দখলকারী অর্জুনই কিন্তু তাঁর জামাতা হয়ে যান। কংসকে বধ করে উগ্রসেনকে ক্ষমতায় বসান কৃষ্ণ, কিন্তু সেই উগ্রসেনই কৃষ্ণকে সবসময় ব্যতিব্যস্ত রাখতেন।

পণ্ডিতদের মূল্যায়নঃ একালের গণতান্ত্রিক রাজারা পণ্ডিতদের মূল্যায়ন খুব একটা না করলেও মহাভারতীয় রাজারা পণ্ডিত ব্যক্তিদের যথেষ্ট মূল্য দিতেন। এ বিষয়ে নারদ যুধিষ্ঠিরকে যে প্রশ্নটি করেন সেটি প্রণিধানযোগ্য– “মহারাজ, আপনি হাজারটা মূর্খের বদলে একজন পণ্ডিতকে কিনে নেবার চেষ্টা করেন তো? কেন না, ঝামেলায় পড়লে পণ্ডিতরাই আপনার ভাল করবে, আপনাকে বাঁচাবে।“

নারদ এখানে ‘কিনে নেয়া’ দিয়ে সম্ভবত যোগাড় করাই বুঝিয়েছেন। আমরা দেখতে পাই কুরুদের রাজসভায় দ্রোণাচার্য এবং কৃপাচার্যের মতো পণ্ডিত অনেকক্ষেত্রে তাদের মতের নিজস্বতা বজায় রেখেও শেষ পর্যন্ত দুর্যোধনের পক্ষে যুদ্ধ করতে বাধ্য হয়েছেন। বিদুর, কৃষ্ণ দ্বৈপায়ন, ব্যাসের মতো পণ্ডিতগণ স্বার্থবুদ্ধির ওপরে উঠে ধৃতরাষ্ট্র, দুর্যোধনকে উপদেশ দিয়েছেন। নারদ পণ্ডিত ‘কিনে নেয়া’ দ্বারা যাই-ই বুঝাক, এ যুগে কিন্তু ঠিকই পণ্ডিত বা বুদ্ধিজীবি কিনতে পাওয়া যায়, যারা মিটিংয়ে, কমিটিতে অংশগ্রহণ করে, এমনকি মন্ত্রীসভায় যোগ দিয়ে আত্মমত বিসর্জন দিয়ে সরকারের মত প্রতিষ্ঠায় রত থাকেন। এর সুফল হিসেবে এই বিক্রীত বুদ্ধিজীবিরা সময়মত শিক্ষা এবং সংস্কৃতির উচ্চাসন লাভ করেন।

ব্রাহ্মণদের সাথে সুসম্পর্কঃ পুরো মহাভারত গ্রন্থটিই হিন্দুদের বর্ণাশ্রম প্রথাকে আশ্রয় করে আবির্তত। বর্ণাশ্রমের নিয়মানুযায়ী রাজা হতেন ক্ষত্রিয়রাই। রাজারা নিজেদের সুবিধার্থেই ব্রাহ্মণদের সাথে সুসম্পর্ক বজায় রেখে চলতেন। তবে ব্রাহ্মণদের ওপরে তারা যে খুব তুষ্ট ছিলেন এমনও বলা যায় না। রাজা দ্রৌপদের দূতকে ভীষ্ম যেভাবে টিটকারীমূলক মন্তব্য করেছিলেন- ‘ব্রাহ্মণ-সন্তান বলে আপনার ভাষা তীক্ষ্ণ’, তাতেই এর প্রমাণ মেলে।

উপসংহারঃ

মহাভারতের রাজনৈতিক লক্ষ্য ছিলো সত্যকে বা ধর্মকে প্রতিষ্ঠা করা। যে-সকল রাজারা তাঁদের রাজনৈতিক প্রয়োজনে বিভিন্ন অনৈতিক পন্থা অবলম্বন করেছেন, তাঁরা হয় ব্যর্থ হয়েছেন অথবা বিনাশ হয়েছেন। কিন্তু যারা ধর্মকে আশ্রয় নিয়েছেন, তারা জয়ী হয়েছেন। দুর্যোধনের সকল প্রচেষ্টা ব্যর্থ করে দিয়ে পাণ্ডবরা বেঁচে রয়েছেন এবং শেষ পর্যন্ত যুধিষ্ঠির রাজা হয়েছেন, আর পুত্রস্নেহে অন্ধ ধৃতরাষ্ট্রকে সহ্য করতে হয়েছে শতপুত্রের মৃত্যুশোক।

আমরা এ কালে অবশ্য এমনটা দেখতে পাই না। অন্যায় করেও আমাদের গণতান্ত্রিক রাজারা বহাল তবিয়তে রাজ্য করতে থাকেন; তাদের খুব খারাপ পরিণতিও আমাদের তেমন একটা নজরে পড়ে না।

মহাভারতের রাজনীতির সামগ্রিক পর্যালোচনা করে এবং তার সাথে বর্তমান সময়ের গণতান্ত্রিক রাজনীতির তুলনামূলক চিত্র দিয়ে আমরা দেখতে পাই যে, আমরা কেবল নামমাত্রই একটি গণতান্ত্রিক দেশের নাগরিক, আমাদের রাজনীতি ‘রাজনীতি’ শব্দটির মতোই রয়ে গিয়েছে মহাভারতীয় যুগে। অনেকক্ষেত্রে আমরা বরং সে-সময়ের থেকে অনেক বেশি অনৈতিক, দুর্নীতিপরায়ন ও নৈরাজ্যমূলক রাজনীতিকেই দেখতে পাই এখন। পূর্বেও রাজার ছেলে রাজা হতেন, এখনও মন্ত্রীর ছেলে/মেয়ে/স্ত্রী মন্ত্রী হন; পূর্বেও রাজাদের আনুগত্য পেলে ধনলাভ হতো, এ যুগেও মন্ত্রীদের আনুগত্য পেলে ধনলাভ বা চাকুরি লাভ হয়; পূর্বে যেমন রাজাদের কোপানলে পড়লে সর্বস্ব খোয়াতে হতো, এমনকি প্রাণও, একালেও মন্ত্রী, এমপি, এমনকি পাতিনেতাদের কোপানলে পড়লে একই পরিণতি হয়; পূর্বেও রাজা-মন্ত্রীরা জণগণের কথা থোড়াই কেয়ার করতেন, এ যুগেও ভোট শেষ হয়ে গেলে মন্ত্রী, এমপিদের টিকিটিরও দেখা মেলে না—উল্টো পাতি রাজাদের দৌরাত্মে সাধারণের জীবন হয়ে ওঠে ওষ্ঠাগত। বরং মহাভারতীয় যুগে যেখানে রাজা থাকতেন একজন, সেখানে এখন প্রতিটা মন্ত্রী/এমপিই, এমনকি তাদের চামচারাও একেকজন রাজা। এ যেন রবীন্দ্রনাথের সেই গান- আমরা সবাই রাজা আমাদের এই রাজার রাজত্বে।

আমার এই অবস্থানকে যারা ফ্যান্টাসি বলে মনে করেন, তাদের জন্য বিশেষভাবে মনে করিয়ে দিতে চাই যে, আমি এখানে কেবল রাজনীতি নিয়েই আলোচনা করেছি, অর্থনীতি-সমাজনীতি নয়। ঐ দুটো দিকে আমরা প্রাচীন সমাজ থেকে বহুগুণ এগিয়ে এটা অনস্বীকার্য। কিন্তু আমাদের বাংলাদেশ তথা ভারতীয় উপমহাদেশের রাজনীতি কি সত্যিই মহাভারতীয় যুগের থেকে একটুও এগিয়েছে? আমি সন্দিহান। তবে আমি এটা নিশ্চিত যে অর্থনীতি, সমাজনীতির সাথে যদি রাজনীতিটাও আগাতো তবে আমরা একটা উন্নত দেশ, রাষ্ট্র তথা সমাজ পেতাম।

[এই প্রবন্ধটি লেখা হয়েছে অনলাইনভিত্তিক সাপ্তাহিক পাঠচক্র ‘খাপছাড়া আড্ডা’য় ২২.০৩.২০১৮ তারিখে পাঠের উদ্দেশ্য। লেখাটিতে মহাভারত ছাড়াও নৃসিংহপ্রসাদ ভাদুড়ী রচিত ‘মহাভারত – নীতি অনীতি দুর্নীতি’ বইয়ের সাহায্য নেয়া হয়েছে। লিখেছেন সন্ন্যাসী রতন।]

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s