সম্প্রতি শাহাদাত হোসেন ও মাসুদ রানা জার্মানিতে বিয়ে করেছেন।

আমাদের সমাজ ব্যবস্থা এমন এখানে প্রাকৃতিক ব্যতিক্রমগুলোকে সহজে মেনে নেয়া হয় না, মেনে নেয়া হয় না পরিবর্তনকেও। আমাদের চিন্তা-চেতনা এমন যে, লিঙ্গভেদে মানুষকে আমরা কেবল দুটো ভাগেই ভাগ করি- পুরুষ ও নারী। আমাদের আশেপাশেই যে আরেক প্রকার মানুষ দেখি, যারা সত্যিকারার্থে পুরুষও নয়, আবার নারীও নয়, তাদেরকে আমরা মানুষ বলেই স্বীকৃতি দিতে চাই না। হ্যাঁ, আমি হিজড়াদের কথা বলছি। বর্তমানে তাদের জন্য এক জোড়া সুশীল শব্দ ‘তৃতীয় লিঙ্গ’ ব্যবহারের প্রচলন হয়েছে বটে, তবে তা খুবই সীমিত আকারে। মানুষ এখনও তাদেরকে হিজড়াই বলে থাকে এবং ‘হিজড়া’ শব্দটি অত্যন্ত ঘৃণাভরে উচ্চারণ করে থাকে। শব্দটা গালি রূপেও ব্যাপক ব্যবহৃত একটি শব্দ। আর মানুষ হিসেবে তো তারা এখনও প্রায় অস্পৃশ্য পরিগণিত। তবে সমাজে প্রভাব প্রতিপত্তি থাকলে লোকান্তরে সমালোচিত হলেও লোকসম্মুখে খুব একটা অপমানিত হতে হয়নি, এমন নজিরও দু’একটি আছে।

সমকামীদের অবস্থা তৃতীয় লিঙ্গ বা হিজড়াদের চেয়েও খারাপ। তৃতীয় লিঙ্গের লোকেরা তবু তাদের লিঙ্গভিত্তিক পরিচয়টা প্রকাশ করতে পারেন, সমকামীরা তাও পারেন না। আমার পরিচিতদের মধ্যে কয়েকজনকে সমকামী বলে জানি। এদের একজন শিক্ষিত এবং একটা সমাজের প্রধান ছিলেন। আমাদের সমাজ যেহেতু তার কামকে অনুমোদন করে না, তাই তিনি ‘স্ট্রেইট’ হিসেবেই জীবন চালিয়ে গিয়েছেন, তবে তিনি যে সমকামী ছিলেন এটা প্রমাণিত। সমাজের লোকেরা অন্তরালে তাকে নিয়ে হাসি তামাসা করেছে বৈকি, কিন্ত তার প্রভাব-প্রতিপত্তির কারণে সামনা সামনি অসম্মানিত করার সাহস পায়নি।

আর একজনকে চিনি যিনি অত্যন্ত গরীব পরিবারের সন্তান। চেহারা পুরুষের আকৃতি হলেও হাঁটা-চলাতে মেয়েলিপনা আছে। ছোটবেলা থেকেই বিয়ে-মুসলমানি অনুষ্ঠানে শাড়ি পরে বিভিন্ন সাজে সাজতেন এবং এটাকে সবাই বিনোদন হিসেবেই নিতো। তিনি ১৪-১৫ বছর বয়সী পুরুষদের সাথে সমকামিতায় যুক্ত হতেন। পরে বিবাহ করে সন্তান হয়েছে, কিন্তু সমকামিতাকে ছাড়তে পারেন নি। তিনি সমাজের মানুষের কাছে খুব নগণ্য একজন ব্যক্তি বলে বিবেচিত এবং সবাই তাকে ‘বেলো’ বলে ডাকে। উল্লেখ্য ‘বোলো’ কুষ্টিয়া অঞ্চলে ব্যবহৃত একটি শব্দ, যার অর্থ ‘মেয়েলী পুরুষ’ এর কাছাকাছি।
ওপরে যাদের কথা উল্লেখ করলাম তাদের সম্পর্কে সমাজের মানুষের ধারনা ছিল এরা কৈশোরে ‘বিকৃত’ যৌনাচারে জড়িয়ে পড়েছে এবং পরে আর তা থেকে বের হয়ে আসতে পারেনি। শেযোক্ত ব্যক্তিকে সমকামিতা থেকে বের করে আনার জন্য মানুষ তাকে অনেক পীড়া দিয়েছে, নির্যার্তন করেছে। একবার একজন তার পায়ুপথে ভূট্টার ফলবিহীন যে দন্ড থাকে তা প্রবেশ করিয়ে দিয়েছিল। কিন্ত এসবেও ফল হয়নি। এটা ঘটেছিল ৯০ এর দশকে, যখন সমাজে শিক্ষিত মানুষের সংখ্যা ছিল নগণ্য। আজ শিক্ষার চিত্র পাল্টেছে, কিন্ত চিন্তার জগতে মানুষ আটকে আছে তার পূর্বাস্থানেই। আজও অধিকাংশ শিক্ষিত মানুষ সমকামিতাকে ব্যক্তির যৌনাচারের সমস্যা বলেই মনে করে।

যৌনপ্রবৃত্তির বিচারে মানুষ প্রজাতির মধ্যে আরো এক প্রকার মানুষের উপস্থিতি দেখা যায়। এরা হলেন উভকামী- যারা সমলিঙ্গ ও বিপরীত লিঙ্গ দুটোতেই আকর্ষণ বোধ করেন। দুঃখজনক হলো, উভকামীরা স্ট্রেইট ও সমকামী দুই দলের কাছেই ঘৃণার পাত্র। অনেক আন্দোলন সংগ্রাম পেরিয়ে উন্নত বিশ্বে সমকামী ও উভকামীরা স্বাভাবিক জীবন-যাপনের অধিকার পেয়েছেন। কিন্তু আমাদের ধর্মভিত্তিক সমাজে এ স্বপ্ন এখনও সুদূর পরাহত। বাংলাদেশের আইনে এখনও সমকাম নিষিদ্ধ। আর তাই বাংলাদেশে বসবাসরত প্রায় একশতভাগ সমকামীকেই এক দ্বৈত জীবন-যাপন করতে হয়। যদি বা দু’একজন সমাজ ও ধর্মের বেড়া ডিঙিয়ে নিজেকে প্রকাশ করেন, তার জন্য নেমে আসে নির্যাতন-নিপীড়ণের দণ্ড।

বাংলাদেশে ২০১৪ সালে ‘রূপবান’ নামে একটি সমকামী ম্যাগাজিন প্রকাশিত হয়েছিল। বাংলাদেশের মতো একটি রক্ষণশীল দেশে এটা ছিল এক বিরাট পদক্ষেপ। কিন্তু প্রকাশের পরপরই বিভিন্ন মহল থেকে এটি নিষিদ্ধের দাবি ওঠে এবং মাত্র দুটি সংখ্যা প্রকাশের পরেই রূপবান বন্ধ হয়ে যায়। তৃতীয় সংখ্যা প্রকাশ করতে গিয়ে দেখা গেল কোন প্রেস পত্রিকাটি ছাপতে রাজি হচ্ছে না। পরবর্তীতে ২০১৬ সালের এপ্রিলে পত্রিকাটির সাথে সংযুক্ত দু’জন সমকামীকে নৃশংসভাবে হত্যা করা হলো। এর সাথে বোধ হয় থেমে গেল রূপবানেরও প্রকাশনা।

rupban
বাংলাদেশের প্রথম সমকামী ম্যাগাজিন রূপবান-এর যে দুটি সংখ্যা প্রকাশিত হয়েছিল তার প্রচ্ছদ

সমাজ, ধর্ম ও রাষ্ট্রের এতো প্রতিবন্ধকতা সত্বেও সমকামীরা কেন এমন যৌনাচারে অভ্যস্ত? নিশ্চয়ই এমন কিছু শারীরিক কারণ আছে যা তাদেরকে বিষমকামে (পুরুষ-নারী যৌনতা) নিরুৎসাহিত করে। এই প্রবন্ধটিতে বাংলা ভাষায় সমকাম বিষয়ে প্রকাশিত একমাত্র বই অভিজিৎ রায়ের ‘সমকামিতা – এক বৈজ্ঞানিক ও সমাজ-মনস্তাত্ত্বিক অনুসন্ধান’-এর আলোকে সেই বিষয়েই আলোকপাত করা হবে। তবে এ বিষয়টি বুঝতে হলে সবার আগে প্রয়োজন মানুষের যৌন প্রবৃত্তি সম্পর্কে জানা।

যৌন প্রবৃত্তি কী?
“পুরুষ কি পরওয়ার দেগার, সঙ্গে ছিল প্রকৃতি তার
প্রকৃতি প্রভৃতি সংসার সৃষ্টি সবজনার।”
জীবের টিকে থাকার একমাত্র মাধ্যম হচ্ছে বংশবিস্তার বা প্রজনন, যা প্রভৃতি সংসার সৃষ্টির একটা নিয়ামক বটে। আর এই প্রভৃতি সংসার সৃষ্টির ফলেই হয়ত আজকে আমরা জগত সংসারের প্রয়োজনীয় অপ্রয়োজনীয় বিবিধ বিষয়ে সহমত দ্বিমত পোষণের সুযোগ পেয়েছি।

প্রকৃতিতে প্রজননের দুটি প্রক্রিয়া রয়েছে। যৌন ও অযৌন প্রজনন। প্রজননের ভিত্তিতে সমস্ত জীবকূলকে দুই ভাগে ভাগ করা হয়েছে। যেসকল জীব যৌন প্রক্রিয়ায় বংশবিস্তার করে সেগুলিকে বলে যৌনপ্রজ এবং বাকিদের অযৌনপ্রজ। অযৌনপ্রজ জীবের বেশিরভাগই উদ্ভিদ। প্রাণীদের মধ্যে কিছু এককোষী প্রাণী ছাড়াও পতঙ্গ ও কয়েকটি সরীসৃপের মধ্যে অযৌন প্রজনন লক্ষ্য করা গেছে। বাকি প্রাণীকুল যৌনক্রিয়ার মাধ্যমেই বংশবিস্তার করে থাকে।

যৌনপ্রজ প্রাণীদের মধ্যে প্রজননের লক্ষ্যে যে ক্রিয়াটি কাজ করে তাকে যৌন প্রবৃত্তি বলে। যৌন প্রবৃত্তি প্রাণীকে পরস্পর বিপরীত লিঙ্গের প্রতি যৌন মিলনে আকৃষ্ট করে। অধিকাংশ প্রাণীর ক্ষেত্রে যৌন মিলন কেবল প্রজননের উদ্দেশ্যেই সংঘটিত হতে দেখা গেলেও মানুষসহ আরো কিছু প্রাণী তাদের যৌন আচরণের ক্ষেত্রে অবাধ স্বাধীনতা ভোগ করে থাকে। যৌন ক্রিয়া মানুষের ক্ষেত্রে কেবল প্রজননের মাধ্যমই নয়, আনন্দেরও অন্যতম উৎস।

প্রাণীর ক্ষেত্রে যৌনক্রিয়া সংঘটনের ইচ্ছা বা যৌনাকাঙ্খা কয়েকভাবে প্রকাশ হতে দেখা যায়। এটা যেমন বিপরীত লিঙ্গের প্রতি হতে পারে, তেমনি হতে পারে সমলিঙ্গের কিংবা উভয় লিঙ্গের প্রতি। বিপরীত লিঙ্গের প্রতি যৌনাকাঙ্ক্ষাকে বিষমকামিতা (Heterosexuality) বলে, যা যৌনপ্রজ প্রজাতির প্রায় সব সদস্যের মধ্যেই লক্ষ্য করা যায়। তবে এছাড়াও প্রকৃতিতে সমকামিতা (Homosexuality), উভকামিতা (Bisexuality), রুপান্তরকামিতা ও সর্বকামিতার উপস্থিতি রয়েছে।

বিষমকামিতাঃ
প্রকৃতির প্রায় সব প্রজাতির মাঝেই এই প্রকারের যৌন প্রবৃত্তি সচরাচর বেশি দেখতে পাওয়া যায়। মানুষের মাঝে এর আধিক্য এত বেশী যে অন্য প্রবৃত্তির মানুষকে তাই মানসিক রোগী ভাবা হতো। এই প্রবৃত্তির মানুষেরা বিপরীত লিঙ্গের প্রতি যৌন আকর্ষণ অনুভব করে থাকে। এরা সাধারণত স্বাভাবিক অবস্থায় সমলিঙ্গের প্রতি যৌনাবেদন অনুভব করে না, কিন্ত যখন দীর্ঘদিন স্বাভাবিক যৌনতার বাইরে থাকে তখন যৌন শক্তি নিবারণ করতে সম-লিঙ্গের সাথে যৌন কর্ম করে থাকে। যেমন সেনাবাহিনী ও জেলবন্দি কয়েদিদের মাঝে সমকামে প্রবৃত্ত হতে দেখা যায়। তবে সবার যে এমন হয়, তা নয়। আবার বিপরীত লিঙ্গের সঙ্গী পেয়ে গেলে, এরা আর সমকামে প্রবৃত্ত হয় না।

সমকামিতাঃ
সমকামিতা হলো সমলিঙ্গের মধ্যে প্রেম বা সমলিঙ্গের প্রতি যৌন আকর্ষণ। যারা এই যৌন প্রবৃত্তির ধারক তারা সমকামী। সমকামীরা বিপরীত লিঙ্গের প্রতি কোন যৌন আকর্ষণ বোধ করেন না। সংখ্যাগরিষ্ঠের বাইরে অথচ স্বাভাবিক এবং সমান্তরাল ধারায় অবস্থানের কারণে এধরণের যৌনতাকে সমান্তরাল যৌনতাও বলা হয়। আমাদের এই প্রবন্ধে আমরা মূলত এ বিষয়টি নিয়েই আলোচনা করব।

উভকামীতাঃ সমলিঙ্গ ও বিপরীত লিঙ্গ উভয়ের প্রতি আকর্ষণবোধ। কিছু মানুষ সমকামিতা আর বিষমকামিতা দুইটির প্রতিই সমান যৌনাকর্ষন বোধ করে। আমরা ‘বিজ্ঞানের চোখে সমকামিতা’ অংশে দেখব অধ্যাপক কিন্সে তাদেরকে তাঁর আবিষ্কৃত যৌন প্রবৃত্তির স্কেলে তিন নাম্বার ঘরে জায়গা দিয়েছেন। উভকামীদের জীবন খণ্ডিত আকারে দেখা হলে কখনো তাদের সমকামী বা কখনো বিষমকামী বলে মনে হতে পারে। যৌন প্রবৃত্তিতে উভকামীরা সংখ্যালঘুর মধ্যেও সংখ্যালঘু। এদের জীবন অত্যন্ত বেদনাদায়ক, কেননা উভকামীদের বিষমকামীরা যেমন মেনে নিতে চায় না, তেমনি সমকামীরাও স্বীকার করে না। উভকামীরা একদিকে বিবাহ করে সংসার করে, আবার পাশাপাশি আর একজন সমকামী সাথীও রাখতে চায়। তাই যখন এদের উভকামীতা প্রকাশ হয়ে যায় তখন প্রথাগত বিবাহ বিচ্ছেদের মত ঘটনা ঘটতে দেখা যায়।

ইংরেজ সাহিত্যিক অস্কার ওয়াইল্ড একজন উভকামী ছিলেন। বিবাহিত জীবনের বাইরে তাঁর একটি পুরুষের সাথে সমকামীতার সম্পর্ক ছিল। ইংরেজ সমাজ এটা মেনে নিতে পারেনি। অস্কার ওয়াইল্ডকে এর জন্য কারাগারে যেতে হয়। উভকামীতার এরকম উদাহরণ রয়েছে অনেক। অনেকেই সমকামী হয়েও বিষমকামী জীবন যাপন করতে বাধ্য হন, যা আসলে এক প্রকার উভকামীতাই। যেহেতু অনেকে বাধ্য হয়ে নয়, বরং সত্যিকারই উভয় লিঙ্গের প্রতি যৌনাকর্ষণ বোধ করেন, বিজ্ঞানীরা তাই উভকামিতাকেও একটা আলাদা যৌন প্রবৃত্তি হিসেবে ধরে থাকেন।

রুপান্তরকামীতা বা ট্রান্সসেক্সুয়ালিটিঃ এরা বাহ্যিক বৈশিষ্ট্যে ছেলে হয়ে জন্ম নিলেও নিজেদের মেয়ে ভাবেন, ঠিক বিপরীতক্রমে মেয়ে হয়ে জন্ম নিলেও নিজেকে ছেলে ভাবেন। এদের কেউ কেউ বিপরীত লিঙ্গের পোশাক পরিধান করতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন আবার কেউ কেউ সার্জারির মাধ্যমে রুপান্তরিত মানবে পরিণত হয়।

amelia adesh
বাংলাদেশের ছেলে আদেশ, যিনি রূপান্তরিত হয়ে এ্যামেলিয়া হয়েছেন (নিচে)
আমেরিকার পুরুষ রুপান্তরকামী জরগেন্সেনের রুপান্তরকামীতার উপর একটি গুরুত্বপূণ বই লেখেন। বইটির নাম ‘আ পার্সোনাল অটোবায়োগ্রাফি’। লেখকের পূর্ব নাম ছিল জর্জ জরগেন্সেন। তিনি সেনাবাহিনীতে চাকরি করতেন, কিন্ত তিনি নিজেকে মেয়ে ভাবতেন। তার এই মানসিকতার জন্য চাকুরী চলে যায়। পরে ১৯৫২ সালে অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে তিনি নারীতে রুপান্তরিত হন। বাংলাদেশের ছেলে আদেশ বর্তমানে টরেন্টোতে বাস করছেন এ্যামেলিয়া হয়ে। তিনি এখন সেখানকার নারী মডেল।
1887342.main_image
আদেশ থেকে এ্যামিলিয়া (ট্রান্সজেন্ডার মডেল)

রুপান্তরের এমন উদাহরণ অনেক আছে যারা আত্ববিশ্বাস আর সাহস দিয়ে সমাজের বেড়াজাল ভেদ করে আপন ইচ্ছার প্রতিফলন ঘটিয়েছেন। কিন্ত যারা সমাজে আবদ্ধ হয়ে নিজের প্রবৃত্তি বিসর্জন দিচ্ছেন বা সমাজ কর্তৃক নিগৃহীত হচ্ছেন তাদের খবর কজন রাখে?

বিবর্তনের দৃষ্টিতে সমকামীতা
অনেক বিজ্ঞানীর মতে সেক্স (যৌনমিলন) জীবজগতে প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে জেনেটিক প্রকারণ (variation) বা ভিন্নতা তৈরি করে, যা বিবর্তনের চালিকাশক্তি, কারণ জেনেটিক প্রকারণ প্রাণীকে প্রতিকুল পরিবেশে টিকে থাকতে সাহায্য করে। যেহেতু সমকামে পরবর্তী প্রজন্মে জিন সঞ্চালনের সম্ভাব্যতা শূন্য, তাই বিবর্তনবাদের আলোকে সমকামের কোন সঠিক ব্যাখ্যা পাওয়া যায় না। এর ফলে অনেক ডারউইনবাদীরা ধর্মান্ধ মৌলবাদীদের মতোই সমকামীতাকে প্রকৃতির এক ধরণের বিচ্যুতি বলে চালিয়ে দেয়ার চেষ্টা করেন। কিন্তু সমস্যা হলো, পৃথিবীতে যদি এরকম ঘটনা দু-চারটি হতো, কিংবা কেবল মানুষের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকতো, তাহলে কথা ছিলো। যৌনাচারের ওপর গবেষণা করে সায়েন্টিফিক আমেরিকান মাইন্ড-এর ২০০৬ এর একটি ইস্যুতে বলা হয়েছে, পৃথিবীতে সমকামীদের সংখ্যা সমস্ত জনসংখ্যার ৩ থেকে ৭ ভাগ। কোন কোন গবেষক পুরুষের ক্ষেত্রে এটি শতকরা দশ ভাগ এবং নারীর ক্ষেত্রে ৪ ভাগ বলেছেন।

মানুষ বাদেও প্রাণীজগতে সমকামীদের সংখ্যা ব্যাপক। বিজ্ঞানীরা এ পর্যন্ত প্রায় ১৫০০ প্রজাতির মধ্যে সমকামী যৌন প্রবৃত্তি লক্ষ্য করেছেন। প্রাইমেটদের বর্গে শিম্পাঞ্জিদের মধ্যে সমকামিতার হার সবচেয়ে বেশি। বনোবো শিম্পাঞ্জির কোন কোন গোত্রে প্রায় শতকরা ৩০ ভাগ। বর্তমানে বিজ্ঞানীরা মনে করেন, পৃথিবীতে এমন কোন প্রজাতি নেই যাদের মধ্যে সমকামিতা দেখা যায় না। যেহেতু বিবর্তনবাদের সাথে সমকামিতা সাংঘর্ষিক, তাহলে এতো এতো প্রজাতি কি যৌনতার অপচয় করছে?

এ ব্যাপারে এখনই কোন কিছু বলার সময় আসেনি। এমনও হতে পারে যে, সমকামী প্রবৃত্তিটি বিবর্তন প্রক্রিয়ার উপজাত। বিবর্তনের সবকিছুই যে প্রজাতির জন্য বাড়তি উপযোগীতা তৈরি করে এমন নয়। ফ্রুট ফ্লাই নামক এক প্রকার মাছির পুরুষগুলো জন্মের প্রথম ৩০ মিনিটে বহুবার যৌন মিলনে রত হয়। তবে জন্মের পরপরই তারা পুরুষ-নারী যে কোন মাছিকেই পেনিট্রেট করতে চায়। এভাবে সে একসময় বুঝতে পারে যে, কোন মাছিগুলো বাচ্চা উৎপাদনক্ষম তরুণী মাছি। তারপরে সে কেবল সেগুলোর সাথেই যৌনমিলনে রত হয়। আলবাট্রস পাখির মধ্যে লাইফ লং লেসবিয়ান পার্টনারশিপ গড়ে তুলতে দেখা যায়। তারা এটা করে বাচ্চা লালনের স্বার্থে। তাদের একজন অন্য পুরুষ আলবাট্রস দ্বারা গর্ভবতী হয়। এরপরে তারা দুটি নারী আলবাট্রস মিলে ডিম তা দেয় ও বাচ্চা লালন করে। এমন না যে, লেসবিয়ান জুটি পুরুষ-নারী জুটির চেয়ে বাচ্চা লালনে পটু হয়, তবে একা নারী আলবাট্রসের চেয়ে তা সুবিধাজনক।

বিজ্ঞানীরা এখন মনে করেন, যৌনতাকে কেবল জেনেটিক প্রকারণ তৈরির চালিকাশক্তি হিসেবে দেখার অবকাশ নেই। মানুষ বাদেও বহু প্রাণী কেবল বিনোদন বা আনন্দের জন্য যৌনমিলনে রত হয়। তাছাড়া বিষমকামী জুটিরাও খুব কমসংখ্যক সন্তান নিয়ে থাকেন, কেউ কেউ নেনই না। যদি বিষমকামীরা সন্তান না নিয়েও সারা জীবন কেবল আনন্দলাভের জন্য যৌনমিলনে রত হতে পারে, তাহলে দুটি সমলিঙ্গের মানুষও তো একই উদ্দেশ্যে একই কাজ করতে পারেন। আনন্দলাভ কোন অজৈবনিক বিষয় নয়, তাই বিবর্তনের সাথে এর সম্পর্ক থাক বা না থাক, একে অস্বীকার করার উপায় নেই।

বিজ্ঞানের চোখে সমকামিতাঃ
সমাজের অধিকাংশ মানুষ (শিক্ষিত, অশিক্ষিত) সমকামিতাকে প্রকৃতিবিরুদ্ধ কর্ম বলে মনে করে। এ বিষয়ে অনেক প্রগতিশীল মুক্তমনা ব্যক্তিরাও একই অভিমত পোষণ করে থাকেন। কিন্ত প্রকৃতির পরতে পরতে যার পদচারণা তাকে কি মুখে অস্বীকার করে প্রকৃতি থেকে বিদায় করা যায়? যায় না। বিজ্ঞানীরা তাই এর কারণ খুঁজতে চেষ্টা করলেন।

১৮৮৬ সালে জার্মান নিউরোলজিস্ট রিচার্ড ফ্রেইহার ভন ইবিং মানব জীবনে যৌনতার বিভিন্ন রুপকে লিপিবদ্ধ করে ‘সাইকোপ্যাথিয়া সেক্সুয়ালিস’ নামে ল্যাটিন ভাষায় একটি যুগান্তকারী বই লিখে রাতারাতি চিকিৎসা বিজ্ঞানসহ সর্বমহলে জনপ্রিয়তার শীর্ষে উঠে আসেন। বইটিতে তিনি সমকামিতাকে একধরনের মানসিক রোগ বলে আখ্যায়িত করেন। এর ফলে দেশে দেশে সমকামীদের ধরে মানসিক চিকিৎসা দেয়ার উদ্যোগ গ্রহণ করলো। এই চিকিৎসায় একজনও সমকামিতা ত্যাগ করেছেন, এমন উদাহরণ পাওয়া যায় না। তবে এটি যেহেতু কোন রোগ না, তাই অনেকে সমকামিতা থেকে মুক্ত হবার ভান করেছেন। তবে পরবর্তীতে তাদেরকে আবার সমকামিতায় জড়াতে দেখা গেছে। ইবিং-এর বইটি সমকামীদের জন্য নির্যাতনের দ্বার খুলে দিলেও, তিনিই প্রথম সমকামিতাকে অন্ধকার থেকে আলোয় এনে জনকথায় রুপান্তরিত করেছিলেন এবং যৌনতা নিয়ে গবেষণার দ্বার উন্মোচন করেছিলেন। ইবিং এর গৎবাঁধা বুলিগুলো আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞানে অনেক আগেই পরিত্যক্ত হয়েছে।

ইবিং এর ‘সাইকোপ্যাথিয়া সেক্সুয়ালিস’ প্রকাশিত হবার আগে ১৮৬২ সালে জার্মান মনোবিজ্ঞানী কার্ল হেনরিখ উলরিচ ‘উরানিজম’ নামক এক মতবাদের জন্ম দেন। এই মতবাদে মনে করা হত সমকামী পুরুষেরা আসলে পুরুষ দেহে বন্দি নারী আত্মার অতৃপ্ত প্রকাশ। উলরিচের চোখে সমকামীরা ছিলেন তৃতীয় লিঙ্গ। সমকামিতার ইতিহাসে উলরিচের নাম খুবই গুরুত্বপূর্ণ। তিনি ছিলেন সমকামী মানবাধিকারের প্রাথমিক প্রবক্তা এবং একজন বিদ্রোহী লেখক। তিনি আইনের জাঁতাকলে পিষ্ঠ সমকামী ব্যক্তিদের অধিকার আদায়ের জন্য জনগণকে সচেতন করে তোলেন এবং সমকামবিদ্বেষমূলক সমস্ত আইন লোপ করার আহবান জানান। সমকামিতা তার কাছে কোন অপরাধ ছিল না, বরং এটি ছিল একেবারেই প্রাকৃতিক এবং খুবই স্বাভাবিক একটি প্রবৃত্তি। তবে ইবিং-এর বইটি প্রকাশের ফলে উলরিচের উদ্যোগ বিফলে যায়।

এরপর বিশ শতকের প্রথমে সিগমুন্ড ফ্রয়েড তার মক্কেলদের যৌন জীবনের বিভিন্ন ঘটনা অধ্যয়নের ভিত্তিতে যৌনতার যে তত্ত্ব প্রকাশ করেন, তার প্রভাব পরবর্তী কয়েকদশক ধরে বজায় ছিল। ফ্রয়েডের যুক্তিগুলো বৈজ্ঞানিক স্বীকৃতি পায়নি। তবে ফ্রয়েড ইবিং এর মত সমকামিতাকে মানসিক রোগ মনে করতেন না। তিনি ভেনিসের Die Zeit প্রত্রিকায় সমকামিতা সম্বন্ধে সরাসরি নিজের অভিমত ব্যক্ত করেছিলেন এবং বলেছিলেন সমকামী ব্যক্তিরা অসুস্থ নয়। অবশ্য এসবের অনেক পূর্বে ফরাসি দার্শনিক রুশো (১৭১২-১৭৭৮) মনে করতেন সমকামিতা মূলত এসেছে আরব দেশগুলো থেকে। তিনি আরও বলেছিলেন, যেহেতু সারা পৃথিবীতে সমকামিতা ছড়িয়ে পড়েছে তাই এর অস্তিত্ব স্বীকার করে নেওয়া সঙ্গত।

সমকামীতা নিয়ে গবেষণায় সমকামীদের জন্য সবচেয়ে উপকারী কাজটি করেছেন আমেরিকার ইন্ডিয়ানা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাণীবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক আলফ্রেড কিন্সে। বিংশ শতাব্দীর পঞ্চাশের দশকের শুরুতে তিনি মানুষের যৌন প্রবৃত্তির উপর বিষদ গবেষণা করে যৌন প্রবৃত্তির স্কেল আবিষ্কার করেন, যা কিন্সে স্কেল নামে পরিচিত। তিনি তাঁর গবেষণার যে ফল প্রকাশ করলেন, তাতে মানুষ তাজ্জব বনে গেল। কিন্স বললেন, মানুষকে সামাজিকভাবে কেবল বিষমকামী বলা একেবারেই ঠিক নয়। তিনি আরো বললেন, যৌন প্রবৃত্তিকে কেবল বিষমকাম আর সমকাম – এই দুই মোটা দাগে বিভক্ত করাটাও বোকামি। যৌনতার ক্যানভাসকে বৈজ্ঞানিক উপায়ে ব্যাখ্যার জন্য তার স্কেলে ০,১,২,৩,৪,৫,৬ পর্যন্ত দাগাঙ্কিত করে উপস্থাপন করেন। কিন্সে দেখান যে,
০ দাগে অবস্থানকারী ব্যক্তিরা সম্পূর্ণ বিষমকামী। এরা কখনো কোন পরিস্থিতেই সমকামের সাথে সম্পৃক্ত হয় না।
‘১’ দাগে অবস্থানকারীরা মুখ্যত বিষমকামী হওয়া সত্বেও কালেভদ্রে সমকামিতার সাথে যুক্ত হন। এরা পরিবেশ পরিস্থিতির কারণে কিংবা কৌতূহলবশত হঠাৎ করে সমকামী সম্পর্কে জড়িয়ে পড়লেও এর সাথে মানসিক সম্পর্ক গড়ে ওঠে না।
‘২’ চিহ্নিত কক্ষের ব্যক্তিরা প্রবৃত্তিগতভাবে বিষমকামী, তবে এদের সমকামী প্রবনতা ১ দাগের লোকের থেকে একটু বেশী।
‘৩’ এই দাগের লোকেরা প্রকৃত উভকামী, এরা সমানভাবে সমকামিতা ও বিষমকামিতা উপভোগ করে থাকে।
‘৪’ এই কক্ষের ব্যক্তিরা সমকামী হওয়া সত্যেও প্রায়ই বিষমকামিতার সাথে জড়িত হন।
‘৫’ নম্বর দাগে এমন কিছু মানুষের সন্ধান মিলবে যারা মুখ্যত সমকামী কিন্ত কদাচিৎ বিষমকামে জড়ান।
‘৬’ এরা পুর মাত্রায় সমকামী, কখনো বিষমকামে আকৃষ্ট হন না।

Kinsey Scale
যৌন প্রবৃত্তি অনুযায়ী মানুষের ভাগ (কিনসে স্কেল)

গবেষণার দ্বার উন্মোচিত হবার পর থেকে তা আর থেমে থাকেনি। বিজ্ঞানীরা মানুষের আচরণের ওপরে গবেষণা করেও যৌন প্রবৃত্তির কারণ জানার চেষ্টা করেছেন। কেন একটা ছেলে শিশু বাস, ট্রাক, গাড়ি, ঘোড়া খেলনাগুলি নিয়ে আর মেয়ে শিশুরা পুতুল কোলে বেশি মজা পায়, যদিও দুজনকে একইভাবে লালন পালন করা হয়ে থাকে। বিজ্ঞানীরা মানুষের মস্তিষ্কের ওপর গবেষণা করে এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজে পেতে চেষ্টা করেন।

ইদুর আর বানর নিয়ে পরীক্ষা করতে গিয়ে বিজ্ঞানীরা দেখতে পান যে, মস্তিষ্কের হাইপোথ্যালামাসের মধ্যে মেডিয়াল প্রি-অপটিক বলে যে এলাকা আছে সেটা কোন কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হলে যৌনতার পরিবর্তন ঘটে। মানুষের ক্ষেত্রেও হাইপোথ্যালামাস নামের গুরুত্বপূর্ণ প্রত্যঙ্গটির সাথে যৌন প্রবৃত্তির সরাসরি সম্পর্ক আছে বলে বিজ্ঞানীরা মনে করেন। ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের রজার গোর্কি এবং তার এক ছাত্রী লরা এলেন আশির দশকে মানুষের মস্তিষ্ক বিশ্লেষণ করে দেখলেন ছেলেদের মস্তিস্কের তৃতীয় ইন্টারষ্টিয়াল নিউক্লিয়াস অব দি এন্টেরিয়র হাইপোথ্যালামাস এর আকার মেয়েদের তুলনায় অন্তত তিনগুণ বড়। ১৯৯০ সালে আমেরিকার প্রখ্যাত স্নায়ুবিজ্ঞানী সিমন লেভী কৌতূহলবশত ১৬ জন সমকামী পুরুষ ও ৬ জন সমকামী মহিলার হাইপোথ্যালামাস এর নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষা চালিয়ে দেখলেন মস্তিষ্কের তৃতীয় ইন্টারষ্টিরাল নিউক্লিয়াস অব এন্টেরিয়র হাইপোথ্যালামাস এর আকার বিষমকামী পুরুষের থেকে সমকামী পুরুষদের ক্ষেত্রে দুই থেকে তিনগুণ ছোট, যা মেয়েদের আকার এর সমান। পরবর্তীতে লেভী তাঁর হাসপাতালের ৪১ জন রোগীর উপর পরীক্ষা চালিয়েও একই ফলাফল পেয়েছিলেন।

পরবর্তীতে বিজ্ঞানীরা এই অনুকল্পটিকে আরেকটু বিস্তৃতভাবে পরীক্ষা করে দেখতে পেয়েছেন যে, শুধু হাইপোথ্যালামাস নয় মস্তিষ্কের আরো অঙ্গ প্রতঙ্গের আকারেও পার্থক্য পাওয়া গেছে। যেমন, মেয়েদের ভাষাগত দক্ষতা ছেলেদের চেয়ে বেশী এবং একটু ভিন্নভাবে কাজ করে। তাদের মস্তিষ্কের কর্পাস কালোসাম এবং কমিসুর নামে দুইটি প্রত্যঙ্গের আকার পুরুষের তুলনায় বড়। তাহলে প্রশ্ন আসে সমকামীদের ক্ষেত্রেও কি একই অবস্থা প্রকাশ করে? হ্যা, ঠিক তাই- সমকামীদের কর্পাস কালোসাম এবং এন্টেরিয়র কমিসুরের আকার বিষমকামী পুরুষের তুলনায় বড় এবং মেয়েদের আকারের প্রায় সমান।

সামাজিকভাবেও সমকামী ছেলেদের মেয়েলী বলে গালি দেওয়া হয়। তাহলে সত্যিই কি ওই ষ্টেরিওটাইপিংগুলির কোন বৈজ্ঞানিক ভিত্তি আছে? বিজ্ঞানীরা মানুষের মস্তিষ্কের সুপ্রাকিয়াস্মিক নিউক্লিয়াস নামের এলাকা পরীক্ষা করে পেয়েছেন যে, এটার আকার ছেলেদের ক্ষেত্রে মেয়েদের থেকে বড় থাকে। কিন্ত এখানে সমকামীদের ক্ষেত্রে যে আকার পাওয়া গেল তা বিষমকামী ছেলে ও মেয়েদের চাইতে বড়। এবারে কিন্ত হিসেবটা সরল রেখায় এগোল না। তাই এই ব্যাপারে শেষ কথা বলার সময় এখনো আসেনি। হয়ত ভবিষ্যৎ বিজ্ঞানীরা আরো বিস্তৃত বিশ্লেষণ করে বলতে পারবেন।

জিন বিজ্ঞানীরাও সমকামিতার ব্যাখ্যা দাড় করাবার চেষ্টা করেছেন। ১৯৯৩ সালে ন্যাশনাল ইনষ্টিটিউট অব হেলথ এর জিন বিজ্ঞানী ডিন হ্যামার এবং এঙ্গেলা প্যাতাউচির একটি যৌথ গবেষণাপত্র বিজ্ঞানের জার্নাল ‘সায়েন্স’ এ প্রকাশ করেছিলেন। সেখানে দেখানো হয় যে, সমকামিতার উৎস হিসেবে ক্রমোজোমের মধ্যকার জেনেটিক্স এ একটি মার্কারের সন্ধান পাওয়া গেছে। হ্যামার তাঁর পরীক্ষায় দেখালেন যে, মানুষের X ক্রমোজোমের প্রান্তসীমায় থাকা Xq28 ক্রোমোজোম ব্যান্ড ও জেনেটিক মার্কার সমকামিতার জন্য দায়ী। তিনি এটিকে নাম দিলেন গে জিন। কিন্তু পরবর্তী পরীক্ষাগুলোতে তাঁর গে-জিন তত্ত্ব টিকলো না, কারণ তার গে নমুনার (৪০টি সমকামী জমজ) সবগুলোতে তিনি এর অস্তিত্ব পাননি। অন্য বিজ্ঞানীদের গবেষণায়ও একই ফল পাওয়া গেলে গে-জিন তত্ত্ব বাতিল কার হয়।

সমস্যা সমাধানের ধারাবাহিকতায় বিজ্ঞানীরা এরপরে প্রাণী কোষের উপর কর্টিসল হরমোনের প্রভাব, মানুষের আচরণের উপর প্রাকৃতিক পরিবেশ ও পারিপার্শ্বিক প্রতিবেশের প্রভাব, গর্ভাবস্থায় মায়ের মানসিক চাপের প্রভাব ইত্যাদির কোন প্রভাব সমকামী হবার জন্য দায়ী কিনা তা গবেষনা করেছেন, কিন্ত সমাধানে আসতে পারেননি।

যেহেতু বিজ্ঞানীরা সমকামিতার সাথে কোন জেনেটিক সম্পর্ক বের করতে পারেননি, তাই রিচার্ড ফ্রেইভার ইবিং তার ‘সাইকোপ্যাথিয়া সেক্সুয়ালিস’ বইতে সমকামীদের গায়ে যে মানসিক রোগের তকমা লাগিয়ে দিয়েছিলেন তা প্রায় একশ বছর বলবৎ ছিল এবং সে অনুযায়ী চিকিৎসা বিজ্ঞানীরা রোগ সারাবা দাওয়ায় দিতেও ব্যস্ত ছিল। কিন্তু মনোবিজ্ঞানীরা যখন দেখলেন যে, মনোবৈজ্ঞানিক চিকিৎসায় সমকামীতা থেকে মুক্ত হওয়ার কোন লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না—যা আসলে হওয়ারও কথা নয়, কারণ এটি কোন রোগ নয়—এবার তারাই এগিয়ে এলেন সমকামীদের সাহায্যার্থে। ১৯৭৩ সালের ১৫ ডিসেম্বর আমেরিকান সাইকিয়াট্রিক এসোসিয়েশন স্বীকার করে নেয় যে সমকামিতা কোন রোগ নয়, এটি যৌনতার স্বাভাবিক প্রবৃত্তি।

আমেরিকান সাইকোলোজিকাল এসোসিয়েশন ১৯৯৪ সালে ‘স্টেটমেন্ট অন হোমোসেক্সুয়ালিটি’ শিরোনামে যে বিবৃতি জনসমক্ষে প্রকাশ করে, তার প্রথম দুটো অনুচ্ছে এখানে প্রণিধানযোগ্যঃ-

‘সমকামিতা নিয়ে গবেষণার ফলাফল খুবই পরিষ্কার। সমকামিতা কোন মানসিক রোগ নয়, নয় কোন নৈতিকতার অধঃপতন। মোটা দাগে এটি হচ্ছে আমাদের জনপুঞ্জের সংখ্যালঘু একটা অংশের মানবিক ভালবাসা এবং যৌনতা প্রকাশের একটি স্বাভাবিক মাধ্যম। একজন গে এবং একজন লেসবিয়নের মানসিক স্বাস্থ্য বহু গবেষণায় নথিবদ্ধ করা হয়েছে। গবেষণার বিচার, দৃঢ়তা, নির্ভরযোগ্যতা, সামাজিক এবং জীবিকাগত দিক থেকে অভিযোজিত হবার ক্ষমতা – সবকিছু প্রমাণ করে যে, সমকামীরা আর দশটা বিষমকামীর মতোই স্বাভাবিক জীবন যাপনে অভ্যস্ত হতে পারে।

এমনকি সমকামীতা বিষয়টি কারো পছন্দ বা চয়েসের ব্যাপারও নহে। গবেষণা থেকে বেরিয়ে এসেছে যে, সমকামী প্রবৃত্তিটি জীবনের প্রাথমিক পর্যায়েই তৈরি হয়ে যায়, এবং সম্ভবত তৈরি হয় জন্মেরও আগে। জনসংখ্যার প্রায় দশভাগ অংশ সমকামী, এবং এটি সংস্কৃতি নির্বিশেষে একই রকম থাকে, এমনকি নৈতিকতার ভিন্নতা এবং মাপকাঠিতে বিস্তর পার্থক্য থাকা সত্ত্বেও। কেউ কেউ অন্যথা ভাবলেও, নতুন নৈতিকতা আরোপ করে জনসমষ্টির সমকামী প্রবৃত্তি পরিবর্তন করা যায় না। গবেষণা থেকে আরো বেরিয়ে এসেছে যে, সমকামিতাকে ‘সংশোধন’ এর চেষ্টা আসলে সামাজিক ও মনঃস্তাত্বিক কুসংস্কার ভিন্ন আর কিছু নয়।‘

সমকামিতার সামাজিক ইতিহাসঃ
বাংলায় সমকামিতা শব্দটা সংস্কৃত সমকামিন শব্দ থেকে এসেছে। সংস্কৃতিতে যারা সমলৈঙ্গিক ব্যক্তির প্রতি যৌন আকর্ষণ বোধ করত, তাদেরকে সমকামিন বলা হত। বাংলায় সমকামিতা শব্দের ব্যবহার খুব একটা প্রাচীন নয়। প্রাচীনকালে সমকামীদের বোঝাতে ঔপরিষ্টক শব্দটি ব্যবহৃত হত। যেমন, বাৎসায়নের কামসূত্রের ষষ্ঠ অধিকরণের নবম অধ্যায়ে সমকামীদের চিহ্নিত করতে ঔপরিষ্টক শব্দটি ব্যবহৃত হয়েছে। পরবর্তীকালে এই শব্দের বহুল ব্যবহার লক্ষ্য করা যায়নি। বরং সমকামী শব্দটিই বাংলায় বেশী প্রচলিত হয়েছে। ইদানীং কেউ কেউ সমকামিতাকে আর একটু শালীনভাবে সমপ্রেম শব্দটি প্রতিস্থাপিত করতে চান। যা হোক, শব্দের বিবর্তন যেভাবেই হোক তাতে লেখকের শব্দভাণ্ডার বিকশিত করলেও সাধারণ মানুষের জন্য প্রায়োগিক দিকই মূখ্য।

সভ্যতার ঊষালগ্ন থেকেই মানব সমাজে সমকামিতা বিদ্যমান ছিল। গ্রীক, রোমান, চৈনিক, পাপুয়ানিউগিনি এবং উত্তর আমেরিকার প্রাচীন সভ্যতায় সমকামিতার অজস্র উদাহরণ পাওয়া যায়। এমনকি এজটেক ও মায়া সভ্যতাতেও সমকামিতার নিদর্শন পাওয়া গিয়েছে। হিন্দু পুরানেও পুরূষিনী অর্থাৎ তৃতীয় প্রকৃতির মানুষের উপস্থিতি পাওয়া যায়। বর্তমানে গুজরাটের সঙ্খলপুরে বহুচোরা মাতার যে মূর্তি আছে তা অনেকটা সমকামিতাকে উপস্থাপন করে।

যেমন প্রাচীন গ্রীসের ধর্মশাস্ত্রে ও পুরানে সমকামিতার স্পৃহার কথা পাওয়া যায়। সেখানে ধর্মীয়ভাবে সমপ্রেম স্বীকৃত ছিল। ভেনাস ছিল তাদের কামনার দেবী। এই দেবীই আবার সমকামীদের উপাস্য ছিল। এছাড়া প্রিয়াপ্রাস নামে আরেক দেবতাকেও সমকামীরা আরাধনা করত বলে জানা যায়। তাহিতির বিভিন্ন জায়গায় সমকামে আসক্ত ব্যক্তিদের আরাধ্য দেবতার মূর্তির সন্ধান পাওয়া যায়। আনতেলিয়া গ্রীস, এবং রোমার বিভিন্ন মন্দিরে সিবিলি এবং ডাইওনিসস এর পূজা ব্যাপকভাবে শুরু হয়েছিল।

1024px-Musée_Picardie_Archéo_03
Gallo-Roman bronze statuette (ca 1st century CE) of Priapus discovered in Picardy, northern France, made in two parts, with the top section concealing a giant phallus. Source: Wikimedia

আরব সমাজে বয়স্ক পুরুষ এবং বালকের মধ্যে যৌন সম্পর্ক গ্রহণযোগ্য ছিল। মধ্যযুগে ইসলামের বিস্তৃতির সময়ও এটার বহুল প্রচলন ছিল। মধ্যযুগে আরবেরা যে সাকীর হাতের সুরা এবং সেবা গ্রহন করত বলে ইতিহাসে পাওয়া যায়, এই সাকী বলতে শুধু মেয়েদেরকে বোঝাতো না, কিশোর বালকদেরও বুঝাতো। কোরানের মধ্যেও এ বিষয়ে কিছু নমুনা খুঁজে পাওয়া যায়। বেহেস্তবাসীকে কিশোরের সেবা গ্রহনের কথা কোরানে বেশ কয়েক জায়গায় উল্লেখ আছে। যেমন সুরা তুর এর ২৫ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, “সুরক্ষিত মতি সদৃশ কিশোরেরা তাদের সেবায় ঘোরাফেরা করবে”। আবার সুরা ওয়াক্কিয়ার ১৭ নং আয়াতে আছে, “তাদের কাছে ঘোরাফেরা করবে চির কিশোরেরা।” সুরা দা’হ এর ১৯ আয়াতে আবার উল্লেখ করা হয়েছে, “আপনি তাদেরকে দেখে মনে করবেন যেন বিক্ষিপ্ত মনি-মুক্তা।” মুসলমানদের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কিতাবে কেন এমন লোভনীয়ভাবে—অনেকটা হুরের বর্ণনার মতো—কিশোরদেরকে উপস্থাপন করা হল। এটা কি আরবের ঐ সময়ে প্রচলিত সমকামকে সমর্থন করে না?

প্রাচীনকাল থেকে আজ পর্যন্ত পৃথিবীর তাবৎ সাহিত্য, কৃষ্টি, সংস্কৃতি, শিল্পকলা, দর্শন, পুরান কিংবা প্রত্নতত্ব বিশ্লেষণ করেই গবেষকেরা জেনেছেন যে, মানুষের ইতিহাসের প্রতিটি ক্ষণে, প্রতিটি মুহুর্তে এবং প্রতিটি স্থানেই সমকামিদের পদচারণা ছিল। পৃথিবীর বিখ্যাত বহু জ্ঞানী গুনীদের জীবন পর্যালোচনা করলে তাদের মধ্যেও সমকামিতা, উভকামিতা, রুপান্তরকামিতা কিংবা সমান্তরাল যৌনতার সন্ধান পাওয়া যায়। সেই তালিকায় স্যাপো, সক্রেটিস, প্লেটো, আলেকজান্ডার দ্যা গ্রেট, আবু নুয়াস, সুলতান মাহমুদ, হাফিজ, বত্তিচেলি, লিউনার্দো দ্যা ভিঞ্চি, মাইকেল এঞ্জেলা, ফ্রান্সিস বেকন, উইলিয়াম সেক্সপিয়র, আইজ্যাক নিউটন, ম্যারি উইনষ্টোন ক্রাফট, নেপোলিয়ন বোনাপর্ট, লড বাইরন, হ্যান্স ক্রিষ্টিয়ান এন্ডারসন, নিকোলাই গোগোল, আব্রাহাম লিঙ্কন, সুসান বি এন্থনি, কার্ল উলরিচ, জন এডিংটন সিমন্ডস, অস্কার ওয়াইল্ড, মুস্তাফা কামাল আতাতুর্ক, ভার্জিনিয়া উলফ, মার্গারেট মিড, সালভাদর টুরিং, লিটল রিচার্ড, ম্যাডোনা, বয় জর্জ, এন্ড্রু সুলিভান, এন্ডারসন কুপার, রেচেল ম্যাডো, মার্টিনা নাভ্রাতিলোভা, এঞ্জেলিনা জোলি সহ আরো অনেক ইতিহাসখ্যাত ব্যক্তির সমকামী প্রবৃত্তির পরিচয় পাওয়া যায়।

সমকামিতার ইতিহাস পর্যালোচনা করে দেখা যায় যে, খ্রীষ্টপূর্বাব্দে সমকামিতা নিয়ে সমাজ এতটা বিচলিত ছিল না। তারা এটাকে এক প্রকার স্বীকার করেই নিয়েছিল। যদিও ইহুদি ধর্মে সমকামিতা নিষিদ্ধ ছিল এবং শাস্তির বিধান ছিল তবে তা এতটা প্রকট ছিল না, যতটা প্রকট আকার ধারণ করেছিল খ্রিষ্টান ধর্মের উত্থানে। খ্রিষ্টান ধর্মে সমকামিতাকে গর্হিত উল্লেখ করে মৃত্যুদন্ড পর্যন্ত চালু করেছিল। তখন থেকেই সমকামিতা অপরাধ হিসেবে পরিগণিত হয়। আব্রাহামিক ধর্মের বিবর্তনে ইসলামের উত্থান হলে সেখানে একই বিধান রাখা হয়। এর ফলে সমকামিতা হয়ে যায় অভিশাপ। এতকিছুর পরেও কিন্ত সমকামিতাকে আটকে রাখা যায়নি। প্রকৃতির নিয়মের বাইরে মানুষ যেতে পারে না। প্রকৃতি যাদের উদার চিত্তে সমকামী প্রবৃত্তি দিয়েছে সেটাকে সামাজিক আইনে কি আটকানো যায়? যায় না। তাই আজকের যুগের মানুষ সমকামীদের ঘর বাধবার স্বীকৃতি পর্যন্ত দিয়েছে। হয়ত একদিন পৃথিবীর তাবৎ মানুষ সমস্ত অকাট্য নিয়ম ভেঙ্গে প্রকৃতির স্বাভাবিক প্রবৃত্তিকে মেনে নিয়ে সমকামীদের মানবিক অধিকার ফিরিয়ে দিয়ে একসাথে মিলে মিশে বাস করবে।

পরিশেষঃ
যেহেতু অধিকাংশ মানুষ বিষমকামী এবং এটা তাদের বংশবৃদ্ধির অনুকূলে, সাধারণ মানুষ বিষমকাম ভিন্ন অন্য যৌন প্রবৃত্তিগুলোকে প্রকৃতিবিরুদ্ধ মনে করে, এবং যারা এসকল প্রবৃত্তির অনুসারী তাদেরকে নিকৃষ্ট ভাবে, এমনকি নিগৃহীতও করে। কিন্ত আজকের আধুনিক বিজ্ঞান এ বিষয়ে বিস্তর গবেষণা করে অন্যান্য প্রবৃ্ত্তিগুলোকেও প্রাকৃতিক বলে স্বীকার করে নিয়েছে এবং পশ্চিমা রাষ্ট্রগুলোতে এসকল প্রবৃত্তির মানুষদের রাষ্ট্রীয়ভাবে স্বাভাবিক বিষমকামী মানুষের মত জীবন-যাপন করার স্বীকৃতি দিয়েছে।

দুঃখের বিষয় হলো, তৃতীয় বিশ্বের পশ্চাৎপদ দেশগুলো ধর্ম ও সমাজের দোহাই দিয়ে এখনও এই স্বীকৃতি দান থেকে বিরত রয়েছে। এটা এমন না যে, সেসব দেশের রাষ্ট্রপ্রধানদের কাছে এই বিষয়ক বৈজ্ঞানিক ধারনা এখনও পৌছায় নি; এর পিছনে কাজ করছে রাজনীতি। আর এই রাজনীতির শিকার হয়ে অমানবিক জীবন-যাপন করতে হচ্ছে যৌন প্রবৃত্তির বিচারে সংখ্যালঘু কিছু মানুষকে। তবে শিক্ষিত-অশিক্ষিত সাধারণ মানুষ, এমনকি অনেক মুক্তমনারও, এ বিষয়ক জ্ঞান খুবই সীমিত। তারা এখনও সমকামকে একটি বিকৃত যৌনাচার মনে করে। আমাদের উচিত এ সম্পর্কিত জ্ঞানকে মানুষের মাঝে পৌঁছে দেয়া এবং আমাদের আশেপাশে এ ধরণের যৌন প্রবৃত্তির কোন ব্যক্তি থাকলে তাকে নির্ভরতা যোগানো। তাকে আমাদের জানিয়ে দেয়া উচিত যে, রাষ্ট্র তোমাদের স্বীকৃতি দেয়নি তাতে কি, আমরা তোমাদের পাশে আছি।

  ……….
আজ ২৫শে এপ্রিল। জুলহাস মান্নান ও মাহবুব রাব্বি তনয়ের দ্বিতীয় মৃত্যুবার্ষিকী। ২০১৬ সালের এই দিনে ইসলামিস্ট জিহাদিরা তাদের দু’জনকে হত্যা করে। জুলহাস মান্নান ছিলেন বাংলাদেশের প্রথম ও একমাত্র সমকামী ম্যাগাজিন ‘রূপবান’-এর সম্পাদক। আমাদের এই প্রবন্ধটি তাঁদের দু’জনের নামে উৎসর্গ করা হলো।
জুলহাস-মান্নান-হত্যাকাণ্ডঃ-হত্যা-মামলা-ডিবিকে-হস্তান্তর
ধর্মীয় উন্মাদনায় হারিয়ে গেল হাসিভরা দুটো মুখ
…….
[এই প্রবন্ধটি লিখেছেন সাইফুল ইসলাম। এডিটিং, সংযোজন, বিয়োজনে সন্ন্যাসী রতন। প্রবন্ধটি সাপ্তাহিক পাঠচক্র ‘খাপছাড়া আড্ডায়’ পাঠ করা হয়েছিল ০৫.০৪.১৮ তারিখে। প্রবন্ধটিতে কোন রেফারেন্স দেয়া হয়নি। পুরো প্রবন্ধটিই লেখা হয়েছে অভিজিৎ রায়ের বই ‘সমকামিতা – এক বৈজ্ঞানিক ও সমাজ-মনস্তাত্ত্বিক অনুসন্ধান’-এর আলোকে। তার বাইরে যে অংশটুকু যোগ করা হয়েছে, তার লিংক লেখার সাথে সংযুক্ত করা হয়েছে।]

 

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s