মেসেঞ্জার গ্রুপভিত্তিক ‘খাপছাড়া আড্ডা’র অভিজিৎ দিবস পালন উপলক্ষ্যে বিশেষ প্রবন্ধ – ‘আমার দৃষ্টিতে অভিজিৎ রায় এবং তাঁর লেখালেখি’। আমার এই লেখাটিতে বিশেষ আলোকপাত করা হয়েছে আমার জন্য নির্ধারিত অভিজিৎ রায়ের বই ‘ভিক্টোরিয়া ওকাম্পো – একজন রবি-বিদেশীনির খোঁজে’।

অনলাইনে অভিজিৎ রায়ের সর্বশেষ লেখাটি প্রকাশিত হয়েছিলো ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০১৫, যেদিন তাকে হত্যা করা হয়েছিলো সেদিন। বিডি নিউজে প্রকাশিত লেখাটির শিরোনাম ‘কেন কোনো কিছু না থাকার বদলে কিছু আছে? (Why there is something rather than nothing?)’। অতীতে বিজ্ঞানের কাছে এই প্রশ্নটির কোন উত্তর ছিলো না; এটি ছিলো ধর্ম ও দর্শনের এখতিয়ারে। ধর্মবেত্তারা এই সুযোগে তাদের নিজ নিজ ধর্মের উদ্ভট ব্যাখাকেই কেবল মানুষের কাছে অখণ্ডনীয় (irrefutable) সত্যরূপে প্রচার করে ক্ষান্ত হননি, তারা এ বিষয়ে বিভিন্ন প্রশ্ন তুলে বিজ্ঞানকে খাটো করতে চেয়েছেন। অভিজিৎ রায় তাঁর সর্বশেষ নিবন্ধটিতে তুলে ধরেছেন কিভাবে আধুনিক বিজ্ঞান নিত্যু নতুন গবেষণার মাধ্যমে এই প্রশ্নটিকেও আজ নিজের করে নিয়েছে এবং ধর্মবেত্তাদের মুখ থামিয়ে দিয়েছে। প্রবন্ধটি অভিজিৎ রায়ের সর্বশেষ বই ‘শূন্য থেকে মহাবিশ্ব’ বইয়ের নির্যাস হলেও আমার কাছে মনে হয়েছে, এই শিরোনামটি যেন তিনি আমাদের উদ্দেশ্যেই রেখে গিয়েছেন, যেন তিনি আমাদেরকে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিতে চেয়েছেন, ‘দেখো, কেন আজকের প্রজন্মের মধ্যে বিজ্ঞান চর্চা একেবারেই না-থাকার বদলে কিছু হলেও আছে’।

হ্যাঁ, অভিজিৎ রায়ই সেই ব্যক্তি যিনি বাংলাদেশী তরুনদের নিকট বিজ্ঞান সাহিত্যকে জনপ্রিয় করেছেন, তাদের মধ্যে বিজ্ঞানমনস্কতাকে জাগিয়ে তুলেছেন। বিজ্ঞানের নিত্য নতুন তথ্য ও তত্ত্বকে বাংলা ভাষায় সহজ ও সাবলীল রূপে তুলে ধরে তাকে জনপ্রিয় করার দাবীদার একমাত্র তিনিই। তিনিই প্রথম ও একমাত্র ব্যক্তি যিনি সমকামিতার বৈজ্ঞানিক দিকগুলো তুলে ধরে বাংলা ভাষায় একটি পূর্ণাঙ্গ বই লিখেছেন যা হাজারো বাঙালির সমকাম বিষয়ে পূর্বেকার ধারণা আমূল পাল্টে দিয়েছে। তাঁর ‘ভালবাসা কারে কয়’ সম্ভবত বাংলা ভাষায় একমাত্র বই যেটি প্রেম ও যৌনতার বিবর্তনীয় মনোবৈজ্ঞানিক দিকটিকে অনেকটা গল্পের আলোকে তুলে ধরেছে। ২০১৫ সালে প্রকাশিত তাঁর আরেকটি বই ‘ভিক্টোরিয়া ওকাম্পো – এক রবি বিদেশীনির খোঁজে’ বইটিতে তিনি রবীন্দ্রনাথের জীবনে বিভিন্ন সময়ে আসা নারীদের বিষয়টি যেভাবে বিবর্তনীয় মনোবিজ্ঞানের আলোকে ব্যাখ্যা করেছেন, তা একেবারেই অভিনব।

অভিজিৎ রায় ছিলেন একজন আপদমস্তক বিজ্ঞানমনস্ক মানুষ। বাংলাদেশের মানুষের কাছে অভিজিৎ রায়ের বড় পরিচয় নাস্তিক হলেও তাঁর নাস্তিকতা ছিলো আসলে বিজ্ঞানমনস্কতার ফল। হ্যাঁ, নাস্তিকতা নিয়ে তিনি প্রচুর লিখেছেন। ব্লগে লেখা তার বহু প্রবন্ধ ছাড়াও তাঁর দুটি বই – রায়হান আবিরের সাথে যৌথভাবে লেখা ‘অবিশ্বাসের দর্শন’ এবং তাঁর একার লেখা ‘বিশ্বাসের ভাইরাস’ – প্রায় পুরোটাই নাস্তিকতার ওপরে লেখা হলেও প্রতিটা প্রবন্ধের আনাচে কানাচে ছড়িয়ে আছে বিজ্ঞান। বেশিরভাগক্ষেত্রেই তিনি বিজ্ঞান দিয়েই ধর্মকে খণ্ডণ (refute) করেছেন। আমার কাছে সবসময়ই মনে হয়েছে যে, অভিজিৎ রায় প্রচলিত ধর্মগুলোর বিরুদ্ধে যে লিখতেন তা নাস্তিকতা প্রচারের জন্য নয়, বরং ধর্মগুলো যে বিজ্ঞান চর্চার পথে অন্তরায় এবং বিশ্বাস ও কুসংস্কারের মাধ্যমে মানুষকে হত্যা ও শোষণ করে তার জন্যে। অভিজিৎ রায় মনে করতেন বাঙালি সমাজের অশিক্ষা-কুশিক্ষার পিছনে দায়ী প্রধানত ধর্ম। তিনি স্বপ্ন দেখতেন একটি যুক্তি-নির্ভর মুক্ত সমাজ, যা সত্যিকারার্থেই ধর্মকে এড়িয়ে গিয়ে গড়া সম্ভব নয়। আর তাই বিজ্ঞানের পাশাপাশি তাঁর লেখার অন্যতম বিষয় ছিলো ধর্ম ও ধর্মীয় সমাজের ক্ষতিকর দিকগুলো তুলে ধরা।

আমাদের এই আলোচনায় অভিজিৎ রায়ের পরিচয় তুলে ধরার তেমন কোন আবশ্যকতা রয়েছে বলে মনে করি না, বরং তার সৃষ্টি ও দর্শন বিষয়ে আলোকপাত করাই যথার্থ হবে বলে মনে করি। চিন্তায় তিনি ছিলেন যুগের চেয়ে অগ্রগামী। সেই ২০০১ সালে তিনি যখন বাংলাভাষীদের জন্য মু্ক্তবুদ্ধি চর্চার ক্ষেত্র তৈরি করার লক্ষ্যে ইয়াহু গ্রুপে মুক্তমনার যাত্রা শুরু করেন, বেশিরভাগ মানুষই তখন ইয়াহুতে যেতো মূলত বিনোদনমূলক চ্যাট করতে। ওয়েবসাইট হিসেবে মুক্তমনা যাত্রা শুরু করেছিলো ২০০২ সালে। মুক্তমনার এই দীর্ঘ পরিক্রমায় ওয়েবসাইটটি তথা ব্লগটি যে হাজারো বাঙালির চিন্তা-চেতনার জগতকে পরিবর্তন করতে সক্ষম হয়েছে, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। বাঙালি তরুণদের ওপর মুক্তমনার প্রভাব সম্ভবত অন্য যে কোন প্রতিষ্ঠানের চেয়ে বেশি।

অভিজিৎ রায় কেবল লেখকই ছিলেন না, ছিলেন একজন প্রেরণাদায়ী মানুষও। অন্য অনেককেই তিনি লেখক বানিয়েছেন, উদ্বুদ্ধ করেছেন লিখতে। তিনি জানতেন ও মানতেন যে, শিক্ষা নিজের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখলে তা সমাজের তেমন কোন উপকারে আসে না, জ্ঞানকে ছড়িয়ে দেয়ার মাধ্যমেই কেবল মানুষের চিন্তা-চেতনাকে পরিবর্তন সম্ভব। মুক্তমনাতে আইডি নেই কিন্তু যৌক্তিক মন্তব্য করছেন, এমন কাউকে পেলেই তিনি তার নামে আইডি খুলে ইমেইল করতেন। কেবল মুক্তমনাতেই নয়, ফেসবুকের লেখা পড়েও তিনি অনেককে মুক্তমনায় লেখায় উৎসাহিত করতেন। এটা নির্দ্ধিধায় বলা যায় যে, লেখক খোঁজায় তাঁর উদ্দেশ্য কেবল মুক্তমনাতে লেখানোতেই সীমাবদ্ধ ছিলো না। তিনি জানতেন যে, কেউ মুক্তমনায় লিখতে চাইলে তাকে পড়তে হবে, জানতে হবে, লেখক হবার সাথে সাথে তাকে হতে হবে পাঠকও। লেখক ও পাঠক দুটো তৈরিতেই তিনি ছিলেন সিদ্ধহস্ত।

অভিজিৎ রায়ের মতো বাকস্বাধীনতায় বিশ্বাসী লোক বাংলা ব্লগে খুব কমই ছিলেন বা আছেন। বিরুদ্ধমতের প্রতি তিনি ছিলেন অসম্ভব রকমের উদার। আমরা দেখতে পাই, ব্লগারদের অনেকেই সমালোচনা সইতে পারেন না, বিরুদ্ধমতে রেগে যান। কিন্তু অভিজিৎ রায় এদিক দিয়ে ছিলেন খুব বেশিরকম সহনশীল। তিনি ঘণ্টার পর ঘণ্টা যুক্তিসহকারে তর্ক করতেন; ব্লগের কোন পোস্টে তাকে রেগে যেতে দেখেছি, এমনটা মনে পড়ে না। আমি অবাক হতাম তিনি তাঁর দৈনন্দিন রুটিন কাজের বাইরে গিয়ে এতোটা সময় কী করে বের করতেন। বাংলা ব্লগে তাঁর চেয়ে বেশি রেফারেন্সসহ লেখা কারো আছে বলে মনে হয় না; তাঁর মতো এতো বিচিত্র বিষয় নিয়েও কেউ সম্ভবত লেখেননি। তার মানে তাঁকে প্রচুর পড়তে হতো। আবার মুক্তমনাতে প্রকাশিত যে কোন গুরুত্বপূর্ণ পোস্টও তিনি পড়তেন এবং মন্তব্য করতেন। সবার ওপর নিজের পোস্ট ও বই লেখা তো ছিলোই; লিখতেন পত্রিকাতেও। যোগাযোগ রাখতেন দেশ ও দেশের বাইরের বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থার সাথে। একজন মানুষ সংসারে বাস করে কিভাবে এতোটা সময় বের করতেন ভাবতে আশ্চর্যই হতে হয়। আমার তো মনে হয়, বন্যা আহমেদের মতো একজন স্ত্রী পেয়েছিলেন বলেই তিনি আজকের অভিজিৎ রায় হয়ে উঠেছিলেন, নইলে সংসারের যাতাকলে হারিয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা ছিলো।

অভিজিৎ রায় ছিলেন বাংলাদেশের ব্লগারদের দুর্দিনের কাণ্ডারি। ২০১৩ সালে যখন চারজন ব্লগারকে গ্রেফতার করে কারাগারে প্রেরণ করা হলো, অভিজিৎ রায় বুঝতে পারলেন যে কেবল আভ্যন্তরীণ লবিংয়ের মাধ্যমে তাদেরকে মুক্ত করা সম্ভব হবে না, আন্তর্জাতিক চাপ সৃষ্টি করতে হবে বাংলাদেশের ওপর। তিনি আন্তর্জাতিক মিডিয়া এবং মানবাধিকার সংস্থাগুলোতে লিখতে শুরু করলেন। তাঁর প্রচেষ্টা সফল হয়েছিলো। সব ব্লগাররাই মুক্ত হয়েছিলেন এবং আজ মুক্তভাবে জীবনযাপন করছেন। ২০১৫ তথা পরবর্তীতে বাংলাদেশী নাস্তিক ব্লগাররা এক কঠিন সময়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছেন। অভিজিৎ রায় বেঁচে থাকলে তিনি যে ব্লগারদের এমন দুর্দিনে কাণ্ডারি হিসেবে অবতীর্ন হতেন, তা বলার অপেক্ষা রাখে না।

অভিজিৎ রায়ের লেখায় আরেকটি বিষয় যা আমার দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিলো তা হলো তাঁর কাব্যিক রসবোধ। বিজ্ঞানের বিভিন্ন বিষয়কে ব্যাখা করতে গিয়ে তিনি অনেকসময়ই কবিতাকে টেনে আনতেন। রবীন্দ্রনাথ, জীবনানন্দ, ওমর খৈয়াম থেকে শুরু করে বহু বিদেশী কবির উদ্ধৃতি পাওয়া যায় তার বিজ্ঞান প্রবন্ধগুলোতে। ফেসবুকে অভিজিৎ রায় আমার কোন পোস্টে প্রথম মন্তব্যও করেছিলেন সম্ভবত একরকম একটি লেখার সূত্র ধরে। আমি বিজ্ঞান বক্তা আসিফের লেখা বই ‘কার্ল সাগান – এক মহাজাগতিক পথিক’ নিয়ে লিখতে গিয়ে জীবনানন্দ দাশ বা রবীন্দ্রনাথের কবিতার উদ্ধৃতি দিয়েছিলাম। অভিজিৎ রায় সেখানে লিখেছিলেন যে, তিনিও আলো হাতে চলিয়াছে আঁধারের যাত্রী বইয়ে ঐ বিষয়ে একই তুলনা দিয়েছেন। তাঁর দুটি বই – আলো হাতে চলিয়াছে আঁধারের যাত্রী ও ভালবাসা কারে কয় – রবীন্দ্রনাথের গীতিকবিতা থেকে নেয়া। নিরস বিজ্ঞানকে যিনি এমন কাব্যরসময়তায় টেনে আনতে পারেন, তিনি তো মানুষের কাছে জনপ্রিয় হবেনই।

অভিজিৎ রায়ের কাব্য রসবোধ নিয়ে বলতে গিয়ে তাঁর লেখা ‘ভিক্টোরিয়া ওকাম্পো – একজন রবি-বিদেশীনির খোঁজে’ বইটির কথা বলতে হয়। রবীন্দ্রনাথের শেষ বয়সের একজন প্রেমিকা কেন একজন বিজ্ঞান লেখককে টানবে? কেন ভিক্টোরিয়া ওকাম্পোকে নিয়ে তিনি পুরো একটা বই লিখতে গেলেন? আর্জেন্টিনা ভ্রমণে গিয়ে অভিজিৎ রায় দেখলেন যে, ভিক্টোরিয়া ওকাম্পোকে আমরা যেভাবে চিনি, সেটা আসলে ওকাম্পোর খুবই খন্ডিত একটি রূপ। ভিক্টোরিয়া ওকাম্পো আর্জেন্টিনা তথা ল্যাটিন আমেরিকার একজন প্রভাবশালী নারীবাদী লেখক যার সাথে ঐ সময়কার ইউরোপ-আমেরিকার প্রায় সমস্ত বিখ্যাত লেখকদের সাথেই ব্যক্তিগত যোগাযোগ ছিলো। এটাও তাঁকে নিয়ে বই লেখার কোন যৌক্তিক কারণ ছিলো না। আরো খুঁজতে গিয়ে অভিজিৎ রায় পেলেন যে, ওকাম্পো রবীন্দ্রনাথের জীবনে কেবল একজন নারীই ছিলেন না, তিনি রবীন্দ্রনাথের সাহিত্যে ও জীবনে বেশ কিছু নতুন অধ্যায় যুক্ত করেছেন। ভিক্টোরিয়া ওকাম্পোর সাথে পরিচয়ের পূর্বে নারী বিষয়ে রবীন্দ্রনাথের দৃষ্টিভঙ্গি ছিলো সেকেলে। ঠাকুর পরিবারে কন্যাদের শিশুবিবাহ প্রচলিত ছিলো এবং রবীন্দ্রনাথ এতে বিশ্বাসী ছিলেন। তিনি তাঁর তিন কন্যাকেই অল্প বয়সে পাত্রস্ত করেছিলেন। এছাড়া নারীবাদকে তিনি বহুবার আক্রমণ করেছেন বিভিন্ন প্রবন্ধে ও গল্পে (প্রগতিসংহার)। এমনকি নারীবাদ বিষয়ক সাহিত্যকেও আক্রমণ করেছেন- এক্ষেত্রে নরওয়েজিয়ান লেখক হেনরিক ইবসেনের লেখা নাটক ‘একটি পুতুলের ঘর’-এর সমালোচনা উল্লেখ্য। কিন্তু ওকাম্পোর সাথে পরিচয়ের পরে রবীন্দ্রনাথের সেই সেকেলে ধারণা অনেকটাই পাল্টে যায়।

নারী বিষয়ক চিন্তার পরিবর্তন ছাড়াও রবীন্দ্রনাথের জীবনে আরো অনেক পরিবর্তন নিয়ে আসেন ভিক্টোরিয়া ওকাম্পো। তাঁর গৃহে অবস্থানকালে রবীন্দ্রনাথের কবিতার খাতার আঁকাআঁকি দেখে ওকাম্পোই প্রথম রবীন্দ্রনাথকে বুঝান যে, তাঁর মধ্যে এক চিত্রশিল্পী স্বত্তা আছে। এতে উদ্বুদ্ধ হয়ে রবীন্দ্রনাথ ছবি আঁকা শুরু করেন এবং পরবর্তী কয়েক বছরে কয়েক হাজার ছবি আঁকেন। প্যারিসে রবীন্দ্রনাথের আঁকা ছবির প্রদর্শনীর ব্যবস্থাও করে দেন ওকাম্পো, যা বিশ্ববাসীর কাছে রবীন্দ্রনাথের এক নতুন পরিচয় তুলে ধরে। এরপর একে একে তাঁর ছবির প্রদর্শনী হয় লন্ডনসহ ইউরোপের বহু শহরে।

ওকাম্পোর সাথে রোমান্টিক সম্পর্কটি রবীন্দ্রনাথের কবিতায় নিয়ে আসে এক নতুন রোমান্টিকতা যা সংকলিত হয় পূরবী কাব্যগ্রন্থে। পূরবী কাব্যগ্রন্থটি তিনি উৎসর্গ করেন বিজয়াকে। এই বিজয়া আর কেউ না, ভিক্টোরিয়া ওকাম্পোই। রবীন্দ্রনাথ তাঁকে বিজয়া নামেই ডাকতেন।

রবীন্দ্রনাথের শেষের কবিতা উপন্যাসে লাবন্য চরিত্রের দৃঢ়তা আসলে ভিক্টোরিয়া ওকাম্পোর চারিত্রিক দৃঢ়তাই। উপন্যাসটির শেষের দিকে যে কবিতাটি রয়েছে, তার দুটি লাইন ‘তোমায় যা দিয়েছিনু তা তোমারই দান — গ্রহণ করেছো যতো ঋণী তত করেছো আমায়।’ আসলে রবীন্দ্রনাথকে লেখা ওকাম্পোর চিঠির লাইনের প্রায় হুবহু অনুবাদ। অভিজিৎ রায় এই বইটিতে এসব তুলে ধরেছেন প্রমাণসহ। আর রবীন্দ্রনাথের জীবনে নারী নিয়ে তিনি যে বিবর্তনীয় মনোবৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা দিয়েছেন, সে বিষয়ে প্রথমেই বলেছি।

এবারে অভিজিৎ রায়ের সাথে আমার ব্যক্তিগত সম্পর্ক নিয়ে কিছু বলছি। তাঁর সাথে আমার একবারই দেখা হয়েছিলো। ২০১২ সালের বইমেলায়। ঐ সময় পর্যন্ত তিনি যেহেতু ফেসবুক বা ব্লগে কোন ছবি দেননি, তিনি দেখতে কেমন হবেন সেটা ছিলো একেবারেই অনুমাননির্ভর। প্রথম দেখায় একটু অবাকই হয়েছিলাম, কারণ সে অনুমানের সাথে কিছুই মেলেনি। দেখলাম আমার মতো তাঁরও বেশ খানিকটা বাঙালি-ভুরি আছে। আমি মুক্তমনার ব্লগার ছিলাম না; তবুও তিনি আমাকে দেখেই কাছে টেনে নিলেন। চটপটি খেতে খেতে নিজের ভুরি নিয়ে রসিকতাও করলেন। বিশ্বাস ও বিজ্ঞান বইটিতে অটোগ্রাফ দিলেন এবং প্রথম দেখার নিদর্শন হিসেবে আমাকে ‘আলো হাতে চলিয়াছে আঁধারের যাত্রী’ বইটি উপহার দিলেন।

অভিজিৎ রায়ের হত্যা বাঙালিদের জন্য এক অপূরণীয় ক্ষতি। আমরা যতোই বলি যে, একজন অভিজিতের মৃত্যুতে হাজারো অভিজিতের সৃষ্টি হবে, এটা কেবলই কথার কথা; পরবর্তী একশ বছরেও অভিজিৎ রায়ের মতো কেউ আসবেন, এমনটা আমি মনে করি না। হয়তো কেউ অভিজিৎ রায়ের লেখার চেয়ে উন্নত মান নিয়ে আসতে পারেন, কিংবা আরো বেশি কর্মঠ কেউ আসতে পারেন, কিন্তু সামগ্রিকভাবে তাকে কেউ ছুঁতে পারবেন এমনটা ভাবা আমার পক্ষে কঠিন। ২০১৫ সালের এই দিনটির কথা মনে পড়ে। সেদিন তাঁর মৃত্যুর খবর শুনে শুভ্র আর আমি ফোনে খুব কাঁদছিলাম। শুভ্র কী জন্য কেঁদেছিলো জানি না, তবে আমার সেই কান্না কোন ব্যক্তি অভিজিৎ রায়ের জন্য ছিলো না, আমার কান্না ছিলো অভিজিৎ রায়ের অনুপস্থিতিতে আমরা কতো বিশাল ক্ষতির সম্মুখীন হলাম, বা অভিজিৎ রায় যদি আরো ২০টি বছরও বাঁচতেন তাহলে আমাদেরকে তথা পৃথিবীর মানুষকে আরো কত কী দেয়ার ছিলো, তা ভেবে। আপনারা হয় তো ভাবছেন, আমার কান্নাতে স্বার্থপরতা ছিলো। জানি না, হয় তো তাই-ই হবে।

……….

আজকের আড্ডাতে আরো যারা অংশগ্রহণ এবং অভিজিৎ রায়ের বই ও জীবনী নিয়ে আলোচনা করেছেন তাঁরা হলেন Ibrahim Khalil Sobak, Byronic Suvra, Mohiuddin Sharif, Ruman Sharif, জগন্নাথ কর্মকার, Siful Islam এবং Priyanka Gayen.

……….

গ্রুপের সদস্য Priyanka Gayen- এর লেখা ‘আলো হাতে চলিয়াছে আঁধারের যাত্রী’র পর্যালোচনা :-

………..

আলো হাতে চলিয়াছে আঁধারের যাত্রীতে লেখক বইটির সূচনা করেছেন খানিকটা তরলভাবে – দুই বন্ধুর কথোপকথনের মাধ্যমে। তাদের কথোপকথনের বিষয় মহকর্ষ সূত্র। ‘আলো হাতে চলিয়াছে আঁধারের যাত্রী’ আসলে সৃষ্টিতত্ত্ব অর্থাৎ, কোথা থেকে প্রাণ সৃষ্টি হলো, প্রাণ সৃষ্টির পূর্বেকার অবস্থা কী, এই প্রাণের অাধার তথা প্রাণের উৎস সূর্য থেকে শুরু করে মিল্কি ওয়ে, সেখান থেকে তড়িৎচৌম্বকীয় তরঙ্গ -ব্ল্যাকহোল, সর্বোপরি ‘সুপারস্ট্রিং’ তত্ত্ব। লেখক অভিজিৎ রায় এসব জটিল বিষয়কে খুবই স্পষ্ট এবং সহজবোধ্য বর্ণনার মাধ্যমে উপস্থাপন করেছেন।

প্রবন্ধের শুরুতে সেই স্পর্শকাতর সময়ের উল্লেখ (২৪০খ্রী: পূ:) যখন কিনা বিশ্ব জুড়ে রাজত্ব করে বেড়াচ্ছে টলেমি এবং অ্যারিস্টটল দ্বয়ের ‘ভূকেন্দ্রিক তত্ত্ব ‘। এমতাবস্থায় তেরো শতক যাবৎ প্রচলিত ভূকেন্দ্রিক মতবাদের মূলে কুঠারাঘাত করে গ্যালিলিও প্রণীত সৌরকেন্দ্রিক তত্ত্ব (যদিও পূর্বে পোলিশ যাজক কোপার্নিকাস টলেমির তত্ত্বে সন্দেহ প্রকাশ করেন এবং তাঁর রচিত সৌরকেন্দ্রিক তত্ত্বের বইটি নিষিদ্ধও করা হয়। আর গ্রীক জ্যোতির্বিদ অ্যারিস্টোকাস বলেন, পৃথিবী একবছরে সূর্যের চারিদিকে ঘুরে বার্ষিক গতি সম্পন্ন করে। তিনি আহ্নিক গতির কথাও বলেন। তবে গাণিতিক প্রমাণাদির অভাবে তাঁর বক্তব্য ধোপে টেকেনি)। উল্লেখ্য ভূকেন্দ্রিক মতবাদ না মানায় জ্যোতির্বিদ জিওদার্নো ব্রুনোকে ১৬০০সালে জীবন্ত পুড়িয়ে মারা হয় এবং বৃদ্ধ গ্যালিলিওকে হেনস্থাপূর্বক এই তত্ত্ব স্বীকারে বাধ্য করা হয়।

প্রবন্ধে লেখক সৃষ্টিতত্ত্বকে আদি থেকে বর্তমান পর্যন্ত খুব সহজ ভাষায় বর্ণনা করেছেন; তারপর প্রসঙ্গক্রমে দর্শনের আলোচনা ও সমাপ্তিতে ঈশ্বরের ধারনাকে উৎপাটন করেছেন। নিউটনের মহকর্ষ সূত্র, আইনস্টাইনের অাপেক্ষিকতাবাদ, কুম্বল-ফ্যারাডের চুম্বকের আকর্ষণ বিকর্ষণ সংক্রান্ত তত্ত্ব, মার্সেল গ্রসম্যানের সমদেশ জ্যামিতি, সাহা আয়রনিকরণ সূত্র, বোস সংখ্যায়ন, রমনের ফলাফল, চন্দ্রশেখরের সীমা পুরোটাই লেখক সাধারণ পাঠকের জন্য প্রাঞ্জলভাবে বর্ণনা করেছেন।

প্রবন্ধের মূল বিষয় স্ট্রিং তত্ত্বের বিশদ আলোচনা হয় পাঠককে বিগব্যাং (প্রণেতা-জর্জ গ্যামো) সম্পর্কে আর ডপলার এফেক্ট বিষয়ে ধারণা দিয়ে। সুপারস্ট্রিং তত্ত্ব দাবী করে, পদার্থের মূল অংশ কোনো মৌলিক কণা নয়, খুবই কম্পনশীল তন্তু। এই ধারনা অনুসারে মহাবিশ্বের বিস্তার দেশকালের দশটি মাত্রায়। এরমধ্যে দৈর্ঘ্য, প্রস্থ, উচ্চতা আর সময় (নিউটনের মহাকর্ষ সূত্রে সময়ের উল্লেখ ছিল না, অাইন্সটাইন সময় সম্পর্কে ধারনা দেন আপেক্ষিকতার তত্ত্বে)- এই চারটি সম্পর্কে আমরা গোচর, বাকি ছয়টি মাত্রা তিমিরেই।

বিগ ব্যাং তত্ত্ব প্রচারিত হওয়ার পরে অনেক বিজ্ঞানীই ঈশ্বর জাতীয় কিছুর প্রতি বিশ্বাসের দাবী জানিয়েছিলেন। যেমন,খ্রিষ্ট ধর্মে দীক্ষিত পদার্থবিদ হুগ রস তাঁর ‘দ্য ক্রিয়েচার অ্যান্ড দ্য কসমস’ বইতে দাবী করেছেন, “ইফ দ্য ইউনিভার্স অ্যারোস অাউট অফ আ বিগ ব্যাং,ইট মাস্ট হ্যাভ হ্যাড আ বিগিনিং, ইফ ইট হ্যাড আ বিগিনিং,ইট মাস্ট হ্যাভ আ বিগিনার।” দার্শনিক সক্রেটিসের দাবীও কিন্তু খানিক এমনটাই। তবে কিনা, কোয়ান্টাম পদার্থবিদ্যা খুব ভালোভাবে দেখিয়েছে যে, অনিশ্চয়তা অনুসরণ করে শূন্য থেকে পদার্থ ও শক্তি তৈরী হতে পারে। এই প্রক্রিয়াকে বলে ভ্যাকুয়াম ফ্ল্যাকচুয়েশন।

সর্বোপরি, লেখক ডঃ অভিজিৎ রায় সর্বসাধারণের সামনে বাংলাতে বিশ্বতত্ত্বের একটু মেদবর্জিত উপস্থাপনা দিতে চেয়েছেন রূপকাশ্রয়ী নামকরণের আধারে। শিরোনামে ‘আঁধার’ আসলে কুসংস্কার, ঈশ্বরবিশ্বাস কিংবা মানুষের অনাবিষ্কৃত তত্ত্ব, ধারনা, বর্হিজগত- যা এখনো রহস্যের অন্তরালে এবং আলো হাতে মানুষ তার অরোধ্য যাত্রায় ব্রতী হয়েছে রহস্য উন্মোচনের তাগিদেই।

……

বিঃদ্রঃ ওপরের লিংকগুলোতে গিয়ে ঐ অভিজিৎ রায়ের বইগুলো ডাউনলোড করতে পারবেন।

 

Advertisements

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s