১.

স্বর্গ থেকে পৃথিবীতে পতিত হতে হতে সে ভাবছিলো – আহ! কী অপূর্ব এই শূন্য ভ্রমণ! নিজেকে পাখির মত লাগছিল তার। আনন্দে হাত দুটোকে পাখির মতো ছড়িয়ে দিল সে।

তার বিবিও খুব উৎফুল্ল। যেখানে তারা অবতরণ করতে যাচ্ছে, সেখানে তাদের জন্য রয়েছে একটা বিশাল পৃথিবী, এটা ভাবতেই আনন্দে শিউরে উঠছিল সে। আনন্দে ভাসতে ভাসতে সে তার সঙ্গীর হাত ধরে গান ধরলো, “এখানে….দু’জনে….নিরজনে, সাজাবো প্রেমের পৃথিবী…লালালা….লালালা….লালালা”।

পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলের অভ্যন্তরে পৌঁছাতেই তারা টের পেলো, তাদের এই আনন্দ আর দীর্ঘস্থায়ী হচ্ছে না। তাদের খেয়াল হলো, স্বর্গের বৈমানিক তাদের যে প্যারাসুট দু’টো দিয়েছিল, তা নিতে ভুলে গিয়েছে তারা। এমতাবস্থায় তারা দু’জন সিদ্ধান্ত নিলো মরতে যেহেতু হবে, দুজন হাতে হাত ধরেই মরবো।

কিন্তু সে-সাধও পূরণ হবার ছিল না। বায়ুর ধাক্কায় তারা কেবলই দূরে সরে যাচ্ছিল। সে অনেক চেষ্টা করেছিল বিবিকে কোনমতে ধরে রাখতে, কিন্তু কিছুতেই পেরে উঠছিল না। একসময় বিচ্ছিন্নই হয়ে গেল দুজন। বিবির শোকে পৃথিবী পৃষ্ঠে পৌঁছার পূর্বেই মূর্ছা গেল সে।

২.

আঃ উঃ আঃ উঃ…
আদম আলীর কানে যখন এই কাতরানো ধ্বনি পৌঁছাল তখন সে শিকার থেকে ফিরছিল। বেশ বড় মাপের একটা বাইসন শিকার করেছে তারা। দলবদ্ধভাবে শিকারে বেরুলেও অন্যরা আদম আলীকে ফেলে খানিকটা এগিয়ে গিয়েছিল। ফিরতি পথে প্রকৃতির ডাকে সাড়া দিতে গিয়েই আলাদা হয়ে গিয়েছিল সে। তাই দলের থেকে বেশ কিছুটা পিছনে থেকে একা একাই হাঁটছিল আদম আলী।

কাতরানোর শব্দটা বেশ অস্বাভাবিক লাগছিল আদম আলীর কাছে। সে প্রথমে কান পেতে বোঝার চেষ্টা করলো শব্দটা কোন দিক থেকে আসছে, তারপর উৎপত্তিস্থল বিচার করে কয়েক পা এগুতেই ধুলি-কাদা মাখা আহত লোকটাকে দেখতে পেলো।

নিজেদের গোত্রের কেউ হবে, এমনটা ভেবে দ্রুত দৌড়ে কাছে গেল আদম আলী। কাছে গিয়েই বুঝতে পারলো আসলে সেরকম কেউ নয়। প্রথমত, গোত্রের সবাইকে সে চেনে। দ্বিতীয়ত, এমন ধবধবে সাদা মানুষ সে জীবনেও কোনদিনও দেখেনি; এমন চামড়ার মানুষের হতে পারে এমন ধারণাই তার ছিল না।

আদম আলী দেখতে পেল অসভ্য লোকটা তার লজ্জাস্থানটুকু ঢাকার মতোও কিছু পরেনি। তবে যেভাবে পাছায় হাত দিয়ে কেবলই উঃ আঃ করছিল, তাতে সে বুঝতে পারলো তার ব্যথাটা ওখানেই হবে। সে লোকটাকে ঠেলা দিয়ে উল্টে ফেললো এবং দেখলো তার ক্ষতস্থান থেকে অবিরাম রক্ত ঝরছে। লোকটার জন্য মায়া হলো আদম আলীর। শত্রুগোত্রের কেউ হবে ভেবেও সে তাকে ফেলে চলে আসতে পারলো না। সে দ্রুত একটা ঔষধি পাতা তুলে তা হাতে পিষে রস বের করে লোকটার ক্ষতস্থানে দিয়ে দিল। কয়েক মিনিটের মধ্যেই মোটামুটি সুস্থ্য হয়ে উঠল লোকটা।
সুস্থ্য হয়েই সে বললো, “আসসালামুওয়ালাইকুম।”
আদম আলী বুঝতে পারল না লোকটা কী বলতে চায়। সে তাকে তার ভাষায় জিজ্ঞেস করলো, “তুমি কে? এখানে কীভাবে এসেছ?” লোকটা কোন উত্তর দিল না। বরং আরো বার দুয়েক আসসালামুআলাইকুম বলে চলল। আদম আলী এবার ইশারায় বলতে চাইল-তুমি কী বলছ আমি বুঝছি না।
সালামের জবাব কী দিয়ে দিতে হয়, আদম আলী তা জানেনা দেখে লোকটা ক্ষেপে অগ্নিমূর্তি হয়ে উঠল। আদম আলী তো অবাক। যাকে সে এইমাত্র সুস্থ্য করে তুলেছে, সে-ই কীনা তার উপর ক্ষেপে উঠছে। তার ইচ্ছে হচ্ছিল বদমাশটাকে একটা ঘুষি মেরে নাক ফাটিয়ে দিতে। তবুও নিজেকে সংবরণ করল সে। লোকটাকে উপেক্ষা করে গোত্রের আবাসস্থলে রওয়ানা দিল সে।
কয়েক পা এগিয়েই কী মনে করে আবার লোকটার কাছে গেল আদম আলী। কিছুক্ষণ তাকিয়ে দেখল তার দিকে। আহা! কী সুন্দর চেহারা! সে ভাবল। তার মনে হলো এই সাদা লোকটাকে নিয়ে যাওয়া উচিত। সবাই এরকম একটা সুন্দর সাদা মানুষকে দেখলে খুব মজা পাবে। সে গাছ থেকে কয়েকটা লতা ছিড়ল। তারপর লোকটাকে কিছু না বলে লতা দিয়ে পেঁচিয়ে ফেলল। তাগড়া জোয়ান আদম আলী তারপর লোকটাকে কাধে নিয়ে গোত্রের গুহায় রওয়ানা দিল।

৩.

আদম আলীর গোত্রের অর্ধেকের বেশি নারী। গোত্রের সবচেয়ে তাগড়া জোয়ান বলে গোত্র প্রধানের পরেই সবচেয়ে বেশি নারী বরাদ্ধ তার। তার সুঠাম দেহ সুঠাম উত্তর প্রজন্ম তৈরি করবে যা গোত্রটিকে প্রকৃতির সাথে যুদ্ধ করে বেঁচে থাকতে সাহায্য করবে, এ জন্যই গোত্রের এই নিয়ম। কদিন পরে আদম আলীই হবে এ গোত্রের প্রধান, এটা এখন সবাই জানে। সবাই মেনেও নিয়েছে। তবে যেসব পুরুষরা একজন নারীও ভাগে পায় না, তারা যে তার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করতে পারে, এটা আদম আলী বোঝে। তাই গোত্রে সে একটা নতুন নিয়ম চালু করেছে। সপ্তাহে একদিন সে তার নিজের বরাদ্ধ নারীদের থেকে অন্যদের ভাগ দেয়, তবে অবশ্যই নারীদের গর্ভধারণের মতো উপযুক্ত সময়ে নয়।

সকলের সেবা শুশ্রুষায় দ্রুত সেরে ওঠে লোকটা। নারীদের কাছে থেকে দেখে দেখে তার শরীর বারবার মোচড় দিয়ে ওঠে। স্বর্গ থেকে পতিত হবার পথে হারিয়ে যাওয়া বিবির কথা মনে পড়ে যায় তার। সে মনে মনে ভাবতে থাকে কিভাবে এই গোত্রের প্রধান হওয়া যায়। কেবল গোত্রপ্রধান হতে পারলেই সে এদের থেকে বেছে বেছে সেরা নারীদের ভোগ করতে পারবে, এই ভাবনা থেকেই লোকটা ক্রমে রপ্ত করে ফেলে গোত্রের ভাষা এবং ইশারা ইঙ্গিতগুলো। বুদ্ধি খাটিয়ে হয়ে যায় গোত্রের অন্যতম একজন সদস্য এবং গোত্রপ্রধানের প্রিয়ভাজন। কিন্তু সে জন্মগতভাবে এই গোত্রের সদস্য নয় বলে একটা নারীও তার ভাগ্যে জোটে না।

৪.

একদিন আদম আলীর লাশ মেলে গভীর বনে। লাশ নয়, শেয়াল শকুনে ঠোকরানো ক’খানা হাড়। আদম আলীর মৃত্যুতে পরবর্তী গোত্র প্রধানের পদটা খালি হয়ে যায়। তার জন্য বরাদ্ধ নারীদের দখল নিয়ে গোত্রের অন্যান্য সদস্যদের মধ্যে শুরু হয়ে যায় কাড়াকাড়ি। গোত্রপ্রধান সবাইকে নিয়ে আলোচনায় বসেন। তারপর ঘোষণা দেন, “আদম আলীর স্থান পূরণ করার মত শক্তি ও মানসিকতা কোনটাই তোমাদের কারো নেই। আদম আলীর স্থান কেবল এই নামহীন লোকটাই পূরণ করতে পারে। আজ থেকে এই লোকটাই হবে আমাদের আদম আলী। সুতরাং যেসব নারীরা আদম আলীর অধীনে ছিল তারা এই নতুন আদম আলীর অধীনে চলে যাবে। যেহেতু এই লোকটা আঘাত পেয়ে সব অতীত ভুলে গিয়েছে, এমনকি তার নামও, সেহেতু তোমরা একে আদম আলী বলেই ডাকবে। এবং এও জেনে রাখো যে এই আদম আলীই হবে আমার পরে এই গোত্রের প্রধান।”

লোকটা মনে মনে তিনবার পড়ে- আলহামদুলিল্লাহ।

Advertisements

2 comments

Leave a Reply

Fill in your details below or click an icon to log in:

WordPress.com Logo

You are commenting using your WordPress.com account. Log Out /  Change )

Google+ photo

You are commenting using your Google+ account. Log Out /  Change )

Twitter picture

You are commenting using your Twitter account. Log Out /  Change )

Facebook photo

You are commenting using your Facebook account. Log Out /  Change )

Connecting to %s